Originally posted in সময়ের আলো on 10 March 2026
যুদ্ধে নতুন ধাক্কা অর্থনীতিতে

দেশের অর্থনীতি এমনিতেই গভীর সংকটে আছে। মূল্যস্ফীতি বেড়ে আবার ১০ শতাংশের কাছে। উচ্চ পণ্যমূল্য দেশের সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়াচ্ছে। বিগত কয়েক বছর ধরেই দেশে বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। ব্যবসা-বাণিজ্যেও এক রকম স্থবিরতা চলছে আগের দুই সরকারের আমল থেকেই। রফতানি আয় কমছে। অর্থের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী ব্যাংক ব্যবস্থা এখনও নড়বড়ে অবস্থায় আছে।
অন্যদিকে রাজস্ব সংগ্রহ কম হওয়ায় সরকারের আয়েও চলছে টানাপড়েন। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও মাত্র ৮ শতাংশের মতো। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম। বর্তমানে অর্থনীতিতে এ রকম আরও কিছু ক্ষত রয়েছে, যা নতুন সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। এই অবস্থার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অর্থনীতির এসব ক্ষত আরও গভীর করে তুলবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ এক সপ্তাহ পার হয়ে গেছে, ইতিমধ্যেই যুদ্ধের ধাক্কা বেশ ভালো মতোই লাগতে শুরু করেছে দেশের অর্থনীতিতে। সবার আগে প্রভাব পড়েছে জ্বালানি তেলের বাজারে। রয়টার্সের তথ্য বলছে গতকাল সোমবার বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১১৯ ডলারে ঠেকেছে। অথচ যুদ্ধ শুরু দিন গত ২৮ ফেব্রুয়ারি অপরিশোধিত প্রতি ব্যারেলের দাম ছিল ৬৮ ডলার। অর্থাৎ যুদ্ধের এই দশ দিনে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে ব্যারেলপ্রতি ৫১ ডলার।
বিশ্ববাজারের এই দাম বৃদ্ধির ধাক্কা লেগেছে দেশের বাজারেও। গত কয়েক দিন ধরে সারা দেশেই জ্বালানি তেল নিয়ে একরকম তুলকালাম চলছে। দেশে এখনও পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল থাকার পরও কৃত্রিমভাবে সংকট তৈরি করে জনভোগান্তি শুরু হয়েছে। ইরানের হামলার কারণে কাতার এলএনজি উৎপাদন বন্ধ করায় এর প্রভাবও দৃশ্যমান হচ্ছে ক্রমেই।
ইরান হুরমুজ প্রণালি বন্ধ করায় জ্বালানি পরিবহন যেমন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে তেমনই বাংলাদেশের রফতানিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। সবচেয়ে আতঙ্কে আছে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত লাখ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি। তারা যেমন জীবনের ঝুঁকিতে আছেন, তেমনই বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের অন্যতম প্রধান খাত রেমিট্যান্স আহরণও ঝুঁকিতে পড়ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আগে থেকে চলমান অভ্যন্তরীণ নানা সংকটের পর এই বৈশ্বিক সংকট দেশের অর্থনীতিকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসা বিএনপির নতুন সরকারের জন্যও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের কাজ কঠিন করে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ।
এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন সময়ের আলোকে বলেন, বর্তমান সরকার একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। এর মধ্যে শুরু হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ। এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে দেশের অর্থনীতি আরও চাপের মুখে পড়বে। তেলের দাম বাড়বে, মানুষ কাজ হারাবে ও স্বাভাবিক সরবরাহ বিঘ্নিত হবে। এ ক্ষেত্রে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে চলমান রাখতে ব্যবসায়ীদের জন্য একটা অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব ইতিমধ্যে পড়তে শুরু করেছে। জ্বালানি তেল নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে দেশের মধ্যে বেশ বিশৃঙ্খলা চোখে পড়ছে। এ ক্ষেত্রে নতুন সরকারকে কঠোর হতে হবে। একদিকে যেমন দেশে জ্বালানির মজুদ পরিস্থিতি কেমন আছে, আমদানি পরিস্থিতির কি অবস্থা এসব বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরতে হবে। অন্যদিকে এই সংকটকালীন সময়ে দেশ যাতে আরও নাজুক অবস্থায় না পড়ে তার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে যুদ্ধের কারণে যদি মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ আরও বেড়ে যায় তা হলে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়বে। সুতরাং নতুন সরকারকে সাবধানে এবং বিচক্ষণতার সঙ্গে পথ চলতে হবে।
অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ ক্ষত: দেশে দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে ঘুরছে। নিত্যপণ্যের দাম মানুষের আয়কে ক্ষয় করছে। মধ্যবিত্ত চাপে আছে। নিম্নবিত্তের অবস্থা আরও খারাপ। দেশে বিনিয়োগ স্থবির। ব্যবসায়ীরা অনিশ্চয়তায়। জ্বালানি ও বিদ্যুতের নিরাপত্তা না থাকা বিনিয়োগে বড় বাধা।
ব্যাংকে সুদের হার বাড়ায় বিনিয়োগের খরচ আরও বেড়েছে। ব্যবসার পরিবেশে বিরাজ করছে অনিশ্চয়তা। ফলে রফতানি প্রবৃদ্ধি শ্লথ। পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকি বাড়িয়েছে। বাজারে বৈচিত্র্য বাড়েনি। যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা ‘পাল্টা শুল্ক’ ব্যবস্থার চাপ কমাতে অন্তর্বর্তী সরকার সে দেশের সঙ্গে যে বাণিজ্য চুক্তি করে গেছে, তার প্রভাব মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ তো আছেই।
অন্যদিকে বিনিয়োগ বাড়াতে দেশের মধ্যে অর্থের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী ব্যাংক ব্যবস্থা নড়বড়ে। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, সুশাসনের ঘাটতি এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে ব্যাংক খাত বিপর্যস্ত। অনিয়মিত ঋণ, অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি এবং ঋণখেলাপি সংস্কৃতি সমস্যা বাড়িয়েছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমবর্ধমান।
অনেক ব্যাংক পড়েছে মূলধন সংকটে। ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় আস্থা কমেছে। খেলাপি ঋণ এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকির একটি বিষয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, খেলাপি ঋণ কমানো ছাড়া ব্যাংক খাত স্বাভাবিক হতে পারবে না। ব্যাংক কমিশন গঠনের দাবিও উঠেছে নতুন করে। এই ইস্যুতে কী করে নতুন সরকার সে প্রশ্ন এখন গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারের সামনে আরেক বড় চ্যালেঞ্জ রাজস্ব সংগ্রহের সংকট। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও মাত্র ৮ শতাংশের মতো। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম। বহু বছর ধরে কর সংগ্রহ কাক্সিক্ষত মাত্রায় বাড়ছে না। কর-ব্যবস্থাপনায় সুশাসনও দুর্বল। বিগত হাসিনা সরকার দেশের ঘাড়ে বিশাল বৈদেশিক ঋণের বোঝা চাপিয়ে গেছে, যা পরিশোধের চাপ পড়েছে নতুন সরকারের ওপর। বর্তমানে সরকারের ঋণ স্থিতি প্রায় ২২ লাখ কোটি টাকা।
অর্থনীতির কিছু জায়গায় অবশ্য স্বস্তি বিরাজমান। বৈদেশিক লেনদেন হিসাবে (ব্যালান্স অব পেমেন্ট) গত ডিসেম্বরে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত। এর বড় কারণ উচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহ। তবে বৈদেশিক বাণিজ্য বাড়লে চাপ বাড়বে রিজার্ভে। কৃষি উৎপাদনে এখনও কিছুটা স্বস্তি আছে। ব্যাংক খাতে কিছু সংস্কার দৃশ্যমান।
যুদ্ধের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে: দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার বড় অংশ নির্ভর করে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর। দেশে ব্যবহৃত অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেলের বড় অংশ আসে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত থেকে। এ ছাড়া কাতার থেকে আমদানি করা হয় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)।
হুরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে পড়েছে তরলীকৃত এলএনজি আমদানি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংঘাত দীর্ঘ হলে গ্যাস, বিদ্যুৎ, রফতানি, রেমিট্যান্স সব খাতেই চাপ বাড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের জ্বালানি আমদানির প্রায় ৮০ শতাংশই হুরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে। এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ করা হয়। ফলে সেখানে সামরিক উত্তেজনা বা জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম দেশ কাতার ২ মার্চ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সংকটের আশঙ্কায় দ্বিগুণেরও বেশি দামে দুই কার্গো এলএনজি কিনেছে সরকার।
মূল্যস্ফীতি বাড়ার শঙ্কা: জ্বালানির দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে পরিবহন খাতে। ট্রাক, বাস ও নৌপরিবহনের ভাড়া বাড়লে বাজারে চাল, ডাল, সবজি ও ভোজ্য তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়ে। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের প্রতিবেদন অনুযায়ী খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ফলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ডিসেম্বরের ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ থেকে বেড়ে জানুয়ারিতে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে পৌঁছেছে।
নিত্যপণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সরকারি কর্মকর্তা ও কয়েকজন ভোক্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, এলপিজি ও এলএনজির সরবরাহ হয় মধ্যপ্রাচ্য থেকে। যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি বাড়বে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে যেতে পারে। তেলের দামে অস্বাভাবিক ঊল্লম্ফন হলে সরকারকে ভর্তুকি বাড়াতে হবে। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে খাদ্য, ভোজ্য তেল, সার ও অন্যান্য আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম বাড়বে।
রফতানি বাণিজ্যে পরিবহন ব্যয় বাড়ার শঙ্কা: দেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পও মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক রুটের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় পণ্য পাঠানোর জন্য বাংলাদেশের জাহাজগুলো সাধারণত লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল ব্যবহার করে। যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় এই পথ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তখন শিপিং কোম্পানিগুলো ‘ওয়ার রিস্ক সারচার্জ’ আরোপ করে, যা পরিবহন ব্যয় কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। বিকল্প দীর্ঘ পথ ব্যবহার করলে পণ্য পৌঁছাতে ১০ থেকে ১৫ দিন বেশি সময় লাগে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে যেতে পারে।
শিল্প খাতে উৎপাদন সংকট: দেশে দীর্ঘদিন ধরেই শিল্প খাতে গ্যাস সংকট তীব্র। টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক, সিরামিক ও স্টিলসহ বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলএনজি আমদানি ব্যাহত হলে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ আরও কমে যেতে পারে। এতে উৎপাদন কমে যাবে এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
কৃষি ও সার আমদানিতে প্রভাব: দেশের কৃষি উৎপাদনের একটি বড় অংশ নির্ভর করে আমদানি করা সারের ওপর। কাতার, সৌদি আরব ও ওমান থেকে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ইউরিয়া সার আমদানি করে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘ হলে সারের সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে অথবা দাম বাড়তে পারে। এতে কৃষি উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে।
রেমিট্যান্স কমার আশঙ্কা: দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম উৎস রেমিট্যান্স। এর প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছ থেকে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত বা কাতারের মতো দেশে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে সেখানে কর্মরত শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে। অনেক শ্রমিক বাধ্য হয়ে দেশে ফিরে আসতে পারেন। এর ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে গেলে ডলারের বিপরীতে টাকার মান আরও কমে যেতে পারে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ তৈরি হতে পারে।


