Originally posted in কালবেলা on 11 April 2026
ব্যবসায় উদ্যোগে বাধা হয়রানি-চাঁদাবাজি
ব্যবসা শুরুর জটিলতা ও হয়রানির কারণে বাংলাদেশে বাড়ছে না ব্যবসায় উদ্যোগ। ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু থেকে শুরু করে ভ্যাট-ট্যাক্স, নানা ধরনের হয়রানি—চাঁদাবাজির অভিযোগ তো রয়েছেই। এত কিছুর পরও বেকারত্ব নিরসনে স্বল্প পুঁজি নিয়ে অনেকেই ক্ষুদ্র ব্যবসায় নামছেন। স্বকর্মসংস্থানের এই উদ্যোগ দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন প্রয়োজন এই অসংগঠিত খাতকে নীতি সহায়তা দিয়ে এগিয়ে নেওয়া।
এদিকে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক জরিপে স্পষ্ট হয়েছে যে, দেশে গত এক দশকে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। যার পরিমাণ ১ কোটি ১৭ লাখের বেশি। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে অর্থনৈতিক ইউনিট বৃদ্ধির এই হার আগামীতে আরও বাড়বে। যদিও পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বরাবরই সংশয় প্রকাশ করে আসছেন। জরিপে অন্তর্ভুক্ত ইউনিটগুলোর বেশিরভাগ ব্যবসা এখনো টিন, ভ্যাট বা বিন নিবন্ধনের আওতায় আসেনি। এমনকি অনেক ইউনিটের কোনো ধরনের নিবন্ধনও নেই। বীমাও নেই অধিকাংশ ইউনিটের। গ্রামগঞ্জে কোনো ধরনের নিবন্ধন ছাড়াই অনেক দোকান, হাটবাজারের খুচরা ব্যবসা, ছোট সার্ভিস ইউনিট পরিচালিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক শুমারি অনুযায়ী, দেশে মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা ১ কোটি ১৭ লাখ ২ হাজার ৭৯২টি। এর মধ্যে মাত্র ৭ লাখ ৩৩ হাজার ৭১২টি ইউনিটের মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট নিবন্ধন রয়েছে, যা মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের মাত্র ৬ দশমিক ২৭ শতাংশ। বিপরীতে ৯০ লাখ ২১ হাজার ৩৮১টি ইউনিটের কোনো ভ্যাট নিবন্ধন নেই। অর্থাৎ প্রায় ৯৪ শতাংশ অর্থনৈতিক ইউনিট সরাসরি ভ্যাটের বাইরে। এর মধ্যে জরিপে অংশ নেওয়া ১৯ লাখ ৪৭ হাজার ৬৯৯টি ইউনিট জানিয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ভ্যাট প্রযোজ্য নয়।
শুমারি অনুযায়ী, দেশের মোট ইউনিটের মধ্যে মাত্র ১০ লাখ ২২ হাজার ১২৬টির করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর বা টিন রয়েছে, যা মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের মধ্যে মাত্র ৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ। বিপরীতে ৯২ লাখ ৭৭ হাজার ৩৭০ ইউনিটের কোনো টিন নেই। অন্যদিকে, আরও ১৪ লাখ ৩ হাজার ২৯৬টি ইউনিট জানিয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে টিন প্রযোজ্য নয়। ১ কোটি ১৭ লাখ ২ হাজার ৭৯২টি ইউনিটের মধ্যে মাত্র ৩ লাখ ৮২ হাজার ৮৮৩টির বিন রয়েছে, যা মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের মাত্র ৩ দশমিক ২৭ শতাংশ। বিপরীতে ৫২ লাখ ৭৬ হাজার ১৩১টি ইউনিটের বিন নেই এবং ৬০ লাখ ৪৩ হাজার ৭৭৮টি ইউনিট বলেছে, এটি তাদের জন্য প্রযোজ্য নয়।
এদিকে, বীমা এবং গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রমের বাইরে রয়েছে দেশের অধিকাংশ অর্থনৈতিক ইউনিট। শুমারির তথ্য অনুযায়ী, ৩৮ হাজার ২৭০টিতে গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা রয়েছে, যা মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের মাত্র ০.৩৩ শতাংশ। মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের মধ্যে বীমা রয়েছে মাত্র ১ লাখ ৭৮ হাজার ৮৪৮টির। সেই হিসাবে মাত্র ১.৫৩ শতাংশ অর্থনৈতিক ইউনিট বীমা সুবিধার আওতায় রয়েছে। অর্থাৎ কর কাঠামোর বাইরে থাকার পাশাপাশি ব্যবসা ব্যবস্থাপনায়ও পিছিয়ে রয়েছে অধিকাংশ ইউনিট।
ইউনিটগুলোর নিবন্ধন পরিস্থিতিও দুর্বল। মোট ইউনিটের মাত্র ২৮.০৬ শতাংশ কোনো না কোনো প্রতিষ্ঠানে নিবন্ধিত। অর্থাৎ নিবন্ধন রয়েছে ৩২ লাখ ৮৩ হাজার ৩৭৮টি ইউনিটের। বিপরীতে ৭৫ লাখ ৫৯ হাজার ২৪০টি ইউনিট বা ৬৪.৫৯ শতাংশ ইউনিট সম্পূর্ণ অনিবন্ধিত অবস্থায় রয়েছে। আর ৮ লাখ ৬০ হাজার ১৭৪টি ইউনিট জানিয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে নিবন্ধন প্রযোজ্য নয়।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের মধ্যে ৯৫ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৫টির মূলধনের উৎস নিজস্ব তহবিল, যা মোট ইউনিটের ৮১.৫১ শতাংশ। এ ছাড়া এনজিও থেকে ৮ লাখ ৩৪ হাজার ৮৫৪টি (৭.১৩%) ও ব্যাংক থেকে ৩ লাখ ২১ হাজার ৬০১টি (২.৭৫%) ইউনিট মূলধন সংগ্রহ করেছে। পল্লি ও শহর এলাকাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পল্লি এলাকায় ৮০.৭২ শতাংশ এবং শহর এলাকায় ৮২.৮৫ শতাংশ অর্থনৈতিক ইউনিটের মূলধনের উৎস নিজস্ব তহবিল। অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলি বলেন, এ তথ্যই প্রমাণ করে রাষ্ট্র নাগরিকের প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালন করেনি। ব্যক্তি নিজ উদ্যোগে এনজিওগুলোর কাছ থেকে উচ্চহারে সুদ নিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনা করছে। এখানে ব্যক্তি যে ঝুঁকি নিয়েছে, তা রিকভার করার পদক্ষেপও নেই। ফলে এ ধরনের উদ্যোক্তা ভ্যাট-ট্যাক্সের বাইরে রয়েছেন—এমন মন্তব্য অবিবেচনাপ্রসূত।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ব্যবসার প্রাধান্য, মূলধনের সীমাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে সরকার ভবিষ্যতে বড় অঙ্কের রাজস্ব আয়ের সুযোগ পাবে। কারণ, আজকের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাই আগামীতে বড় উদ্যোক্তায় পরিণত হবেন।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ক্ষুদ্র ইউনিটগুলোতেও এখন ভ্যাট-ট্যাক্সের চাপ বাড়ছে। ফলে অনেকেই মাঝপথে ঝরে পড়ছে। বড়দের ক্ষেত্রেও রাজস্ব আদায় কম হওয়ার কারণ এনবিআরের অসামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি। অহেতুক জটিলতা সৃষ্টি, ভয়ভীতি দেখিয়ে ব্যবসায়ীদের আতঙ্কগ্রস্ত করে তোলা হয়। ভ্যাট-ট্যাক্স কর্মকর্তাদের মাসোহারা দিতে গিয়েই সর্বস্বান্ত হন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। ফলে প্রযোজ্যদের অনেকেই ভ্যাট-ট্যাক্স দিতে আগ্রহী হচ্ছেন না। বড় বড় প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট ফাঁকি চিহ্নিত করলেই বর্তমানের দ্বিগুণ আদায় সম্ভব। কিন্তু সেদিকে মনোযোগ কম।
অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বলেছেন, পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য কখনোই সঠিক ছিল না। ফলে নীতিনির্ধারণে বড় ধরনের গোঁজামিল আমরা দেখতে পাই। যে জরিপটি পরিসংখ্যান ব্যুরো করেছে, তার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এসএমই ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আলি জামান বলেন, ভ্যাটের ক্ষেত্রে নানা স্তর রয়েছে। একেবারেই প্রান্তিক পর্যায়ের দোকানি কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যার নিজের অস্তিত্ব নিয়ে টানাটানি রয়েছে, সে কীভাবে ভ্যাট দেবে? সরকারিভাবে কর্মসংস্থান না হওয়ায় স্বউদ্যোগে অনেকেই ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনা করছে। তাই ব্যবসায়িক মহলের স্থায়িত্ব অনিশ্চিত। জরিপকালে তার উপস্থিতি নিয়ে ঢালাও একটা রিপোর্ট করে দিলেই তা গ্রহণযোগ্য হবে না। তিনি বলেন, যাদের ওপর ভ্যাট প্রযোজ্য তাদের এনবিআর নিয়মিতই মনিটর করছে এবং ভ্যাটের আওতায় আনছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, একজন উদ্যোক্তা ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন মাত্র। ট্রেড লাইসেন্স নিলেই যে তিনি বড় ব্যবসা করছেন, তা নয়। বরং শুরুতেই ‘ঘুষ’ না দিলে ট্রেড লাইসেন্সও মেলে না—এমন অভিযোগ পুরোনো। ট্রেড লাইসেন্স ইস্যুর সময় অগ্রিম আয়কর কেটে রাখা হয়। অনেক ব্যবসা রয়েছে, ভ্যাট নিবন্ধন না নিয়ে সেগুলো করা সম্ভব নয়। ভ্যাট নিবন্ধন নিয়েও ঝামেলায় পড়েন উদ্যোক্তারা। নিয়মিত রিটার্ন দাখিল করার জন্য একজন কর্মচারী খাটাতে হয়। নইলে জরিমানা গুনতে হয়।
এফবিসিসিআইর সাবেক পরিচালক ইসহাকুল হোসেন সুইট বলেন, বিশ্বব্যাংক এর আগে বহুবার বলেছে, বাংলাদেশে ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া খুবই জটিল। এত বেশি দপ্তরের কাছে উদ্যোক্তাকে দৌড়াতে হয়, তা উদ্যোক্তামাত্রই জানেন। আমরা ব্যবসা সহজীকরণের দাবি করে আসছি বছরের পর বছর ধরে; কিন্তু আশাব্যঞ্জক কিছু দেখছি না।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান কালবেলাকে বলেন, নির্ভুল তথ্যের ভিত্তিতে নীতিমালা পর্যালোচনা করা গেলে রাজস্ব ক্ষতি কমানো সম্ভব। তিনি বলেন, শুমারি বা জরিপগুলো আরও সমন্বিত হওয়া উচিত, যাতে কোন ইউনিট করযোগ্য, তা পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ করা যায়। এ ছাড়া গণনাকারীদের সঠিক প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং জরিপে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন রাখা জরুরি।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সঠিক তথ্য-উপাত্তের অভাবেই সরকার বড় ধরনের রাজস্ব হারাচ্ছে। তাই শুমারি থেকে প্রাপ্ত প্রকৃত চিত্রের ভিত্তিতে নীতিমালা পর্যালোচনা করলে সরকার এই ক্ষতি কমিয়ে আনতে সক্ষম হবে।


