Tuesday, February 10, 2026
spot_img

লকডাউন কোনো স্থায়ী সমাধান নয় – ফাহমিদা খাতুন

Originally posted in প্রথম আলো on 19 April 2021

বাংলাদেশের জন্য কোনটা ভালো? সর্বাত্মক লকডাউন নাকি ঢিলেঢালা? অর্থনীতির জন্য কোনটা ভালো? ঢিলেঢালা লকডাউন নাকি কঠোর স্বাস্থ্যবিধি? লকডাউন এক সপ্তাহের নাকি দুই সপ্তাহের? অনেক প্রশ্ন? আসলে অর্থনীতির মানুষেরা কী চান? কী তাঁদের বিশ্লেষণ? নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ, উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী—এ নিয়ে প্রথম আলোর মতামত দিয়েছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।

 

করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে লকডাউনের মতো বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় স্বল্প আয়ের এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের মানুষেরা। তারা একদম বসে যায়। তবে লকডাউন তেমন কড়াকড়ি হয় না। মাঝখান থেকে ছোটরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারখানা চলছে। সীমিত পরিসরে রেস্তোরাঁ চালু আছে, যদিও বসে খাওয়া যাচ্ছে না। আমার বাসার কাছে দেখলাম, অভিজাত রেস্তোরাঁর সামনে ইফতার পণ্য নিতে কমপক্ষে ৪০টি গাড়ি ভিড় করেছে। কিন্তু রাস্তার পাশে ছোটখাটো রেস্তোরাঁ ও চায়ের দোকানে বন্ধ। রিকশা চলছে না, কিন্তু গাড়ি চলছে। দিন আনে দিন খায় মানুষেরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আমাদের দেশে বিধিনিষেধ পরিকল্পিতভাবে করা হয় না, যথেষ্ট প্রস্তুতি থাকে না। সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না। যেমন প্রথমে বলা হলো ব্যাংক বন্ধ থাকবে, এমনকি অনলাইন ব্যাংকিংও। তাহলে মানুষ কী করে আর্থিক কাজ সারবে? ব্যবসার, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের দৈনন্দিন লেনদেন কীভাবে নিষ্পত্তি হবে? সমালোচনার মুখে সীমিত আকারে ব্যাংক খোলা রাখা হলো।

গতবারই বোঝা গেছে, লকডাউন আমাদের জন্য কার্যকর নয়। মানুষকে জোর করে ঘরের ভেতরে বসিয়ে রাখা যাবে না। জীবিকার জন্য তাঁরা বেরিয়ে আসবেনই।

সার্বিকভাবে লকডাউন স্থায়ী সমাধান নয়, সম্ভবও নয়। করোনার যাত্রা অনিশ্চিত। কবে আমরা মুক্তি পাব, তা–ও জানি না। বিজ্ঞানীদের কথাবার্তায় বোঝা যাচ্ছে, করোনার সঙ্গে আরও কিছুদিন থাকতে হবে। এটা মেনে নিয়েই জীবনযাত্রার প্রস্তুতি নিতে হবে। সেই প্রস্তুতির অংশ হিসেবে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। পর্যাপ্ত হাসপাতাল শয্যা, আইসিইউ, চিকিৎসক, নার্স ইত্যাদি বাড়াতে হবে। কিন্তু গত এক বছরে কতটা এগোতে পেরেছি? স্বাস্থ্য খাতের অবকাঠামো সমস্যার সমাধান না হলে কখনোই দক্ষতা বাড়বে না।

শুধু লকডাউন দিলেই তো হবে না, স্বাস্থ্যবিধি মানানোতে বেশি জোর দিতে হবে। গরিব মানুষের পাশাপাশি সামর্থ্যবানদের অনেকে রাস্তাঘাটে মাস্ক পরেন না। গরিব মানুষের জন্য বিনা মূল্যে মাস্ক বিতরণ করতে হবে। লকডাউন যদি দিতেই হয়, তাহলে একসঙ্গে পুরো দেশে না দিয়ে শুধু বেশি সংক্রমিত এলাকায় অর্থাৎ হটস্পটগুলোতে দেওয়া যেতে পারে। এতে অর্থনৈতিক ক্ষতি কম হবে।

স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিল্পকারখানা পালা করে খোলা উচিত। কারণ, কারখানা বন্ধ থাকলে শ্রমিকেরা বেতন পান না। অনেক কারখানার মালিকদের বেতন দেওয়ার সামর্থ্যও থাকে না।

করোনার প্রথম ধাক্কা সামাল দিতে এ বছরের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত ২৩টি প্রণোদনা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এই প্রণোদনার ৮০ শতাংশের মতো ব্যাংকঋণের মাধ্যমে তারল্য সহায়তা, বাকিটা আর্থিক প্রণোদনা। বাস্তবতা হলো, প্রণোদনার অর্থ সবাই ব্যবহার করতে পারেনি। বড় ব্যবসায়ীরা দ্রুত অর্থ ছাড় করে নিতে পেরেছে। কিন্তু নানা জটিলতার কারণে ছোট ব্যবসায়ীরা টাকা পাচ্ছে না। তাদের ট্রেড লাইসেন্স নেই, কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) নেই, জামানত দেওয়ার মতো সম্পদ নেই। প্রণোদনার টাকা পেতে যত দেরি হবে, ব্যবসায়ীদের তত ক্ষতি হবে।

সরকার এখন নতুন করে হয়তো প্রণোদনা দেওয়ার চিন্তা করছে। এবার ক্ষুদ্র আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এমএফআই) মাধ্যমে ছোটদের ঋণ বিতরণ করার উদ্যোগ নেওয়া উচিত। ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ঋণ দেওয়ার অভিজ্ঞতা এসব প্রতিষ্ঠানের আছে। ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান একবার বসে গেলে নতুন করে শুরু করতে তাদের অনেক সময় লাগবে। অনেকে হয়তো আর কখনো ঘুরে দাঁড়াতেও পারবে না।

অতিদরিদ্রদের জন্য নগদ সরাসরি আর্থিক ও খাদ্যসহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। এই অতিমারির সময়ে বাজেট ঘাটতি বাড়িয়ে হলেও এই অর্থ ব্যয় করতেই হবে। গতবার কাজ হারিয়ে শহর থেকে যারা গ্রামে চলে গিয়েছিল, তারা সরকারি সহায়তা পায়নি। কারণ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অতিদরিদ্রদের তালিকায় তাদের নাম নেই।