Friday, March 27, 2026
spot_img
Home Op-eds and Interviews Debapriya Bhattacharya

সমতা, মর্যাদা, ন্যায়বিচারের পথে এগোতে হবে – দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

Originally posted in সমকাল on 26 March 2026

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

যে কোনো ঐতিহাসিক পরিবর্তনের পেছনে এক ধরনের দ্বন্দ্ব কাজ করে। এই দ্বন্দ্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শক্তিগুলোই ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণ করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পেছনেও ছিল পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের বৈষম্য থেকে সৃষ্ট গভীর দ্বন্দ্ব। সেই বৈষম্য দূর করার আকাঙ্ক্ষা থেকেই বাংলাদেশের জন্ম। বঞ্চনা থেকে মুক্তি পেতে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ এ দেশের মানুষ স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে তিনটি মৌলিক বিষয় তুলে ধরা হয়েছিল– সমতা, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার। পরবর্তী সময়ে এই চেতনা বাহাত্তরের সংবিধানে প্রতিফলিত। কিন্তু যে দ্বন্দ্ব থেকে বাংলাদেশের সৃষ্টি, তার যথাযথ সমাধান আমরা এখনও করতে পারিনি। অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও সমতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে আছি। মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারও সর্বস্তরে নিশ্চিত করা যায়নি। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে এই ঘাটতি স্পষ্ট।

ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় দেখা যায়, এই দ্বন্দ্ব কালের পরিক্রমায় বিভিন্নভাবে নতুনরূপে সামনে আসে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানও তার একটি উদাহরণ, যেখানে বৈষম্যের প্রশ্নটি জোরালোভাবে উঠে এসেছে। এ থেকে প্রতীয়মান– মানুষের মধ্যে সমতা, ন্যায্যতা ও ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা চিরন্তন, যা কখনও বিলীন হয় না। তবে একক কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এই আকাঙ্ক্ষার পূর্ণ সমাধান দিতে পারে না। এ জন্য প্রয়োজন সমাজ ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সামষ্টিক উদ্যোগ। সরকার, রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজ– সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে দেশকে সমতা, মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের পথে এগিয়ে নিতে।

দেশে গণতান্ত্রিক উত্তরণের মাধ্যমে নতুন সরকার ইতোমধ্যে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সূচনা হয়েছে, যা ছিল সবার প্রত্যাশিত। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানুষ যেন আবার হতাশ না হয়। অতীতে যে দ্বন্দ্বগুলোর যথাযথ সমাধান হয়নি, তা যেন নতুন করে আরও তীব্র হয়ে না ফিরে আসে। সরকারের দায়িত্বশীলদের যেমন এ বিষয়টি স্মরণ রাখতে হবে, তেমনি নাগরিকদেরও সচেতন ‘পাহারাদার’ হিসেবে তাদের ভূমিকা পালন করতে হবে। এই নতুন সুযোগ আমরা যেন হারিয়ে না ফেলি।

আমরা যদি স্বাধীনতার চেতনার প্রেক্ষাপটে অর্থনীতির চিত্র বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখব, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈষম্য হ্রাসের প্রত্যাশা পূরণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জিত হয়নি। আমাদের মনে রাখতে হবে, কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকদের মজুরি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। পাশাপাশি নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের আর্থসামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে সরকারের আরও মনোযোগী হতে হবে।

আমি আগেই উল্লেখ করেছি, বৈষম্যবিরোধী চেতনা থেকে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল। কিন্তু সরকার যদি এই চেতনা ধারণ না করে এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কথা উপেক্ষা করে, তাহলে মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হবে না। আশা করি, নতুন নির্বাচিত সরকার চিন্তার অগ্রভাগে এ বিষয়টি রাখবে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল যদি সবার কাছে না পৌঁছে, তবে সেই প্রবৃদ্ধি টেকসই হয় না। দারিদ্র্য ও বৈষম্য এখনও উল্লেখযোগ্যভাবে বিদ্যমান। এই বাস্তবতা থেকে জনগণ এখন পরিবর্তন চায়। তারা দক্ষতা দেখতে চায়; দুর্নীতির অবসান চায়। এ জন্য দরকার নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং জোরালো দাবি উত্থাপন। কারণ এগুলো ছাড়া রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রশাসন সঠিক পথে পরিচালিত হয় না, যা অভিজ্ঞতায় স্পষ্টভাবে প্রমাণিত। সুতরাং, আগামীতে নাগরিকদের বড় কণ্ঠস্বর নিয়ে সামনে আসতে হবে।

অতীতে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে অংশীজনের কণ্ঠস্বর উপেক্ষিত। সংস্কার প্রক্রিয়া প্রায়শ ওপর থেকে নির্ধারিত হয়ে থাকে, যা তৃণমূলের চাহিদা, জবাবদিহি ও সমন্বয়ের সুযোগকে সীমিত করে। দেশের মধ্যে যদি গণতান্ত্রিক পরিবেশ না থাকে তাহলে জবাবদিহিও থাকে না। তখন দৃশ্যমান উন্নয়নের আড়ালে প্রকৃত ঘাটতিগুলো ঢেকে রাখার প্রবণতা তৈরি হয়। এতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো খাত উপেক্ষিত থেকে যায়; আর উচ্চ সুদের ঋণ নিয়ে অবকাঠামো প্রকল্পে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়।

আশা রাখছি, নতুন সরকার পুরোনো পথে আর হাঁটবে না। তাই নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এমন একটি শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে জনগণের কণ্ঠস্বর নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত হবে এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত থাকবে। স্বাধীনতার ঘোষিত চেতনা বাস্তবায়নের একমাত্র কার্যকর পথ হলো শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। আমরা যদি গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারি, কেবল তখনই আমরা সেই ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের স্থায়ী সমাধানের দিকে এগোতে পারব।

লেখক: সম্মাননীয় ফেলো, সিপিডি এবং আহ্বায়ক, এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.