Friday, March 13, 2026
spot_img
Home Op-eds and Interviews Debapriya Bhattacharya

সাদা-কালো টাকার এই অন্যায় খেলা শেষ হতে হবে – দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

Originally posted in সমকাল on 21 February 2021

অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকার সৃষ্টি এবং রাষ্ট্রীয় আইনের মাধ্যমে সাদা করার সুযোগ বা বৈধতা দান অনেক বছর ধরে বহুলভাবে আলোচিত-সমালোচিত। অনেক ক্ষেত্রে কালো টাকা উপার্জনের সঙ্গে দুর্নীতি ও অপরাধের সংশ্নিষ্টতা থাকে বিধায় নীতিগত অবস্থান থেকে রাজনৈতিক দল এবং বাণিজ্য সংগঠনগুলো সাধারণত এর প্রতিবিধানে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে থাকে। দু-একটি ব্যতিক্রম বাদে কালো টাকা সাদা করার পক্ষে কোনো পক্ষকে সোচ্চার হতে দেখা যায় না। অথচ বাংলাদেশে ‘৭০-এর দশকের শেষ দিক থেকে বিভিন্ন সময়ে কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরে সুযোগ আরও সম্প্রসারিত হয়েছে।

এবার আয়কর অধ্যাদেশে সংযোজিত দুটি ধারায় বলা হয়েছে, দেশের প্রচলিত আইনে যা-ই থাকুক না কেন, ব্যক্তি-শ্রেণির করদাতারা আয়কর রিটার্নে পূর্বে অঘোষিত বা অপ্রদর্শিত জমি, বিল্ডিং, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্টের প্রতি বর্গমিটারের ওপর নির্দিষ্ট হারে এবং নগদ অর্থ, ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ, সঞ্চয়পত্র, শেয়ার, বন্ড বা অন্য কোনো সিকিউরিটিজের ওপর ১০ শতাংশ কর দিয়ে আয়কর রিটার্নে প্রদর্শন করলে আয়কর কর্তৃপক্ষসহ অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করবে না। এছাড়া কতিপয় শর্তসাপেক্ষে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে ১০ শতাংশ কর দিয়ে প্রশ্ন ছাড়া অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করা যাবে।

অনেকদিন ধরে কালো টাকা সাদা করার বিভিন্ন সুযোগ থাকলেও এর বিপরীতে খুব সামান্যই কর আদায় হয়েছে। তবে চলতি অর্থবছরে সেই তুলনায় বেশ উল্লম্ম্ফন দেখা যাচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রকাশিত তথ্য বলছে, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সাত হাজার ৪৪৫ জন করদাতা ১০ হাজার ২২০ কোটি টাকা তথাকথিত সাদা করেছেন। এর বিনিময়ে কর এসেছে প্রায় ৯৫০ কোটি টাকা। যদিও এই ঘোষিত পরিমাণ কালো টাকার অনুমিত পরিমাণের তুলনায় সামান্য। তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো অর্থবছরে এত পরিমাণ কালো টাকা সাদা হয়নি। এর আগে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭-০৮ এবং ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ৯ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা সাদা হয়। চলতি অর্থবছরের বাজেটে অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ সম্প্রসারণ হওয়ায় এবং করোনার কারণে পুঁজি পাচার কমে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে তুলনামূলক বেশি সাড়া এসেছে বলে অনেকেই প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন।

ওপরের এ প্রবণতা দেখে স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে, অর্থনীতিতে আগের চেয়ে বেশি পরিমাণ টাকা কেন সাদা হচ্ছে? কালো টাকা কি তাহলে অনেক বেড়ে গেছে, নাকি ঘোষিত প্রণোদনা বেশি কার্যকর হচ্ছে? এনবিআর এ বিষয়ে আগের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর? কারা সাদা করছে? কোন খাতে কালো টাকা বেশি সৃষ্টি হচ্ছে? এর আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য কী? সামগ্রিকভাবে রাজস্ব আহরণে এর ভূমিকা কতটুকু? এর ফলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনীতির লাভ হচ্ছে কী?

দেশের সংবিধানে, এমনকি বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সর্বশেষ রাজনৈতিক ইশতেহারে কালো টাকার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার রয়েছে। সংবিধানের ২০(২) ধারায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্র এমন অবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করবে, যেখানে সাধারণ নীতি হিসাবে কোনো ব্যক্তি অনুপার্জিত আয় ভোগ করিতে সমর্থ হবেন না। গত জাতীয় নির্বাচনের আগে ঘোষিত আওয়ামী লীগের ইশতেহারে বলা হয়েছে, ঘুষ, অনুপার্জিত আয়, কালো টাকা, চাঁদাবাজি, ঋণখেলাপি, টেন্ডারবাজি ও পেশিশক্তি প্রতিরোধ এবং দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, কঠোর না হয়ে বার বার কম কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার অনৈতিক সুযোগ বর্তমান সরকার কেন দিচ্ছে?

বস্তুত কালো টাকা সাদা করার সুযোগ নীতির দিক থেকে সংবিধান ও সাম্যের পরিপন্থি। এটি নৈতিকতাবিরোধী ও সৎ করদাতা পরিপন্থি। এ সুযোগ টেকসই কর আদায়ের পরিপন্থি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের বিরোধী, যা সমাজের মধ্যে এক ধরনের অন্যায্যবোধকে প্রশ্রয় দেয়। কোনো অবস্থাতেই এ ধরনের সুযোগ ধারাবাহিকভাবে থাকতে পারে না।

কালো টাকার সৃষ্টি হয় মূলত রাজনীতি, অর্থনীতি ও প্রশাসনের কলুষ সম্পর্ক থেকে। এই গোষ্ঠীর অবৈধ আয়ের দুষ্টচক্র কালো টাকার জন্ম দেয়। এ চক্র ভাঙতে না পারলে কালো টাকার উৎস বন্ধ হবে না। এর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি বাঞ্ছনীয়।

সম্প্রতি ‘এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ’ কালো টাকা সাদা করার লাভ-ক্ষতি নিয়ে একটি সংলাপের আয়োজন করে। সেখানে অনেকেই সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, কালো টাকা সৃষ্টির সঙ্গে সিন্ডিকেট ও দুষ্টচক্র জড়িত। এটি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, নির্বাচনী ব্যয়ের সঙ্গেও যুক্ত। গণতান্ত্রিক চর্চার অভাবও এর জন্য দায়ী। কালো টাকার উৎস যদি বন্ধ না করা যায় তাহলে শুধু সাদা করার সুযোগ দিয়ে তা কমানো যাবে না। সমাধানের জায়গায় কেউ কেউ বলেছেন, এ ধরনের সুযোগ দিলে তা স্বল্প সময়ের জন্য দিতে হবে। শুধু সুযোগ দিলেই হবে না, এর সঙ্গে বাধ্যবাধকতার নিয়ম-কানুনের কার্যকর বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে। সার্বিকভাবে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াতে কর ফাঁকি রোধ এবং করজালের সম্প্রসারণ জরুরি। এর জন্য রাজস্ব বিভাগের দক্ষতা বাড়ানো এবং সার্বিক কর্মকাণ্ডে প্রযুক্তির ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যে তিন-চার জায়গায় বড় ধরনের দুর্বলতা ছিল, তার মধ্যে একটি হলো কর আহরণ। রাজস্ব আহরণ প্রতি বছর কিছুটা বেড়েছে, তবে তা অর্থনীতির আকারের অনুপাতে বাড়েনি। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ১০ থেকে ১৮ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পাঁচ বছর পর আগের সেই অনুপাতেই রয়ে গেছে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ১০ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ পাঁচ বছর আগের চেয়ে লক্ষ্যমাত্রা অনেক কমানো হয়েছে।

তবে বাংলাদেশ যদি বর্তমান পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা শেষে অনুপাত অন্তত ১৫ শতাংশে না নিয়ে যেতে পারে তাহলে তা উন্নয়ন ব্যর্থতার বড় জায়গা হিসেবে চিহ্নিত হবে। কারণ বৈদেশিক সম্পদ কমে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে দেশীয় সম্পদ না বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। এছাড়া কভিডের কারণে গত অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৬ শতাংশে পৌঁছে গেছে। রাজস্ব আয় বাড়াতে না পারলে আগামীতে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হবে। এর ফলে মূল্যস্ম্ফীতি বাড়তে পারে, টাকার বিনিময় হারে চাপ সৃষ্টি হতে পারে এবং বৈষম্য ও দারিদ্র্য পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। সুতরাং কর আদায়কে বাংলাদেশের চলমান অর্থনৈতিক উন্নয়নের সবচেয়ে বড় স্তম্ভ হিসেবে দেখতে হবে।

আমি মনে করি, অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার এ মেয়াদে বাংলাদেশের পক্ষে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ১৫ থেকে ১৮ শতাংশে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। এর জন্য প্রশাসনিক সংস্কারের পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও গণতান্ত্রিক চর্চা লাগবে, তথ্যের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হতে হবে এবং সামাজিক আন্দোলনের কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করতে হবে।

আবার বলতে চাই, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ অর্থনৈতিক উন্নয়নবিরোধী, সাম্যবিরোধী এবং স্বাধীনতার ৫০ বছরের চেতনার পরিপন্থি। রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ধারাবাহিক ও ক্রিয়াশীল প্রকাশ ছাড়া শুধু প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক প্রণোদনা দিয়ে কালো টাকা নির্মূল হবে না। নির্মূল করতে হলে অবৈধ আয়ের উৎস আগে বন্ধ করতে হবে। আশা করব, আগামী অর্থবছরে কালো টাকা সাদা করার বিধান থাকবে না। এ বছরই সাদা-কালো টাকার এই অন্যায় খেলা শেষ হবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।

 

সম্মাননীয় ফেলো, সিপিডি

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.