জবাবদিহির অভাবেই আগামীতে বাংলাদেশকে সবচেয়ে বড় মূল্য চোকাতে হবে – অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান

অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমানের সাক্ষাৎকার (২য় পর্ব)

Originally posted in বাংলা স্ট্রিম on 7 October 2026

অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান; অর্থনীতিবিদ, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো। তিনি বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং উন্নয়ন নীতি নির্ধারণে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত। অধ্যাপনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগে। দেশের চলমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংকট, রাষ্ট্র পরিচালনায় সুশাসন ও জবাবদিহি এবং আগামী দিনের অর্থনৈতিক সংস্কারের রূপরেখা নিয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। আজ প্রকাশিত হলো দ্বিতীয় পর্ব।

স্ট্রিম: গ্যাস বা অন্যান্য সংকটের কারণে বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো তাদের অনেক কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছে বলে দেখা গেছে। মেঘনা গ্রুপ ইপিজেডে ১৪টি কারখানা স্থাপন করেও গ্যাস পাচ্ছে না। এই অবস্থা চলতে থাকলে সামনের দিনে কি এই সংকট আরও ঘনীভূত হবে বলে মনে করেন?

মোস্তাফিজুর রহমান: সরকার এই সংকট উত্তরণে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে, এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে এই পদক্ষেপগুলো আরও দ্রুত ও সময়মতো কার্যকর করা সম্ভব কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। সামনের দিনগুলোতে জ্বালানি নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে আমাদের একটি আগ্রাসী কৌশল গ্রহণ করতে হবে—তা সৌরবিদ্যুতের প্রসারণ হোক বা গ্যাস অনুসন্ধান ও কূপ খনন জোরদার করাই হোক।

সমস্যা হলো, এই সমাধানগুলো আরও আগে হওয়া প্রয়োজন ছিল। আগের সরকারের ভুলের দায়ভার বর্তমান সরকার নেবে না, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এখন যে পদক্ষেপগুলো নেওয়া হচ্ছে, সেখানে যেন কোনো ধরনের বিচ্যুতি না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

এখানে একটি দুষ্টচক্র তৈরি হচ্ছে। কোনো উদ্যোক্তা হয়তো ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কারখানা করেছেন, কিন্তু গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে উৎপাদনে যেতে পারছেন না। অথচ তাকে ঠিকই ব্যাংকের সুদ গুনতে হচ্ছে। এই সংকট শুধু বিদ্যুৎ-জ্বালানি বা উৎপাদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি ব্যাংকিং খাতের সংকটকে আরও ঘনীভূত করবে এবং সরকারের রাজস্ব আহরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। নীতিনির্ধারকদের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো এই দুষ্টচক্র যেন দীর্ঘায়িত না হয়, তা নিশ্চিত করা।

স্ট্রিম: সরকার যে পদক্ষেপগুলো নিচ্ছে, সেখানেও তো প্রশ্ন উঠছে। যেমন—পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই একটি প্রতিষ্ঠানকে এফএসআরইউ বা ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কাজ দেওয়া হয়েছে বলে পত্রিকায় খবর এসেছে…

মোস্তাফিজুর রহমান: কিছু সিদ্ধান্ত অবশ্যই আমাদের স্বস্তি দিচ্ছে না। দরপত্র বা টেন্ডার প্রক্রিয়া ঠিকমতো হচ্ছে কি না, ক্রয়প্রক্রিয়া বা নেগোসিয়েশন স্বচ্ছতার সঙ্গে হচ্ছে কি না এবং সবচেয়ে উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান কাজ পাচ্ছে কি না—এগুলো নিশ্চিত করতে হবে। আগের শাসনামলে এসব জায়গায় যে ধরনের ব্যত্যয় আমরা দেখেছি, তার পুনরাবৃত্তি যেন না হয়।

আমাদের বুঝতে হবে যে, ভালো অর্থনীতি শেষ পর্যন্ত রাজনীতির জন্যই মঙ্গলজনক। এই উপলব্ধি যদি নীতিনির্ধারকদের না আসে, তবে আমরা এই দুষ্টচক্র থেকে বের হতে পারব না। নির্মোহভাবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ছোটখাটো ভুল হয়তো শুধরে নেওয়া যায়, কিন্তু বড় ভুলের মাশুল গোনা অত্যন্ত কঠিন।

স্ট্রিম: আমাদের অর্থনীতির প্রধান দুটি স্তম্ভ হলো প্রবাসী আয় ও তৈরি পোশাক খাত। এই দুটি খাতের ওপর ভর করে টিকে থাকা অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে সরকারের কী করা উচিত বলে মনে করেন?

মোস্তাফিজুর রহমান: বৈদেশিক খাতকে অবশ্যই আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ, এর ওপরই আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, টাকার বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা, আমদানি সক্ষমতা এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নির্ভর করছে।

প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে, বিদেশে কর্মী পাঠানোর সময় তাদের যথাযথ দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন শ্রমবাজারে কারা কাজ পাচ্ছে, তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। নেপালের তুলনায় আমাদের কর্মীদের বিদেশ যাওয়ার খরচ দুই থেকে তিন গুণ বেশি। বিবিএসের পরিসংখ্যানেই দেখা যায়, একজন দরিদ্র কর্মীর বিদেশ যাওয়ার খরচ তুলতেই প্রায় দুই বছর লেগে যায়। এই ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন না আনলে দেশের অর্থনীতি ও নীতিনির্ধারকদের জন্য তা বুমেরাং হবে। আমরা নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ায় এখন আর আগের মতো এক শতাংশেরও কম সুদে ঋণ পাচ্ছি না, আমাদের ৩-৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে। ফলে ঋণ পরিশোধের চাপ প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

বিশ্বজুড়ে এখন বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, যাকে বলা হয় সিলভার ইকোনমি। এটি আমাদের জন্য বিশাল একটি বাজার হতে পারে। এই অর্থনীতিতে শুধু নার্সিং বা চিকিৎসা সেবাই নয়, বয়স্কদের উপযোগী পোশাক, পর্যটন এবং ব্যক্তিগত সেবার ব্যাপক চাহিদা তৈরি হচ্ছে। আমাদের কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে এই বাজারের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। এমনকি আমাদের তৈরি পোশাক খাতের সঙ্গেও এর নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে, কারণ বয়স্কদের জন্য বিশেষায়িত পোশাকের চাহিদা আগামীতে বাড়বে।

স্ট্রিম: পরিবর্তিত বিশ্ববাজারে এই খাতকে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও সুসংহত করতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন?

মোস্তাফিজুর রহমান: তৈরি পোশাক খাতের ভেতরেও বৈচিত্র্য আনতে হবে, বিশেষ করে নন-কটন বা পলিস্টার ও সিনথেটিক পোশাকের দিকে নজর দিতে হবে, কারণ এর বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রনিক্স ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্য রপ্তানিতে জোর দিতে হবে। উদ্যোক্তারা যেন নির্বিঘ্নে উৎপাদন করতে পারেন, সেজন্য ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো, বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো এবং জ্বালানি নিরবচ্ছিন্ন করার ক্ষেত্রে তাদের সহায়তা করতে হবে।

সবশেষে বিদেশি বিনিয়োগের কথা বলব। গত বছর আমরা ২ বিলিয়ন ডলারও বিনিয়োগ আনতে পারিনি। যে বিনিয়োগ বেড়েছে তার অর্ধেকই ছিল আগের মুনাফার পুনর্বিনিয়োগ। অন্যদিকে, পত্রিকায় দেখলাম ভিয়েতনাম গত নয় মাসে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের এফডিআই এনেছে। তারা সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিক্সের মতো নতুন খাতে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং, এই জায়গাগুলোতে অনেক বড় ধরনের একটা পরিবর্তন আমাদের প্রয়োজন হবে।

স্ট্রিম: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এমন কোনো অদৃশ্য খরচ কি আছে, যা সরকারি পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না, কিন্তু সাধারণ জনগণকে তার ভার বহন করতে হয়?

মোস্তাফিজুর রহমান: তা তো আছেই। আমাদের দেশে একটি বড় সাবমার্জড বা ব্ল্যাক ইকোনমি (ছায়া অর্থনীতি) রয়েছে, যেখানে এমন অনেক লেনদেন হয় যা সরকারি হিসাবে আসে না। আগে এই ছায়া অর্থনীতি সরকারের খাতায় না থাকলেও দেশের ভেতরেই আবর্তিত হতো; ফলে কর্মসংস্থান, ভোগ বা আয় বাড়ত। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে এই কালো টাকার একটি বড় অংশ দেশ থেকে পাচার হয়ে গেছে। অর্থাৎ, রেমিট্যান্স বা বৈধ আয় দেশে আসেনি, বরং দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বিদেশে চলে গেছে। ফলে দেশে যে নতুন ভ্যালু তৈরি হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি।

এর একমাত্র সমাধান হলো সর্বস্তরে সুশাসন নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি স্তরে এটি কার্যকর করতে হবে। দুর্নীতি একেবারে নির্মূল করা হয়তো সম্ভব নয়, কিন্তু দুর্নীতি করলে তার যে কঠোর শাস্তি হয়—সেই সংস্কৃতি চালু করতে হবে। এটি করা গেলে সৎ মানুষেরা উৎসাহিত হবেন এবং সমাজে দুর্নীতির প্রবণতা কমে আসবে।

আমরা এখন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় পার করছি। বিশেষত জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে মানুষের যে আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়েছে—পরিবর্তন, সুশাসন, গণতান্ত্রিক উত্তরণ, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার আকাঙ্ক্ষা, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শাসনব্যবস্থা কায়েম করা জরুরি। বর্তমান সরকার সেই ম্যান্ডেট নিয়েই এসেছে, তাই সামনের দিনগুলোতে এই আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

স্ট্রিম: বর্তমান নীতিনির্ধারকদের কোন অর্থনৈতিক ভুলটির কারণে আজ থেকে পাঁচ বছর পর বাংলাদেশকে সবচেয়ে বড় মূল্য চোকাতে হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

মোস্তাফিজুর রহমান: এক শব্দে যদি বলি, সেটি হলো—জবাবদিহির অভাব। আমরা যদি কাউকে জবাবদিহির আওতায় না আনি, তবে তিনি দুর্নীতি করলেও বা ভুল সিদ্ধান্ত নিলেও তার কোনো প্রতিকার করা যাবে না। কেউ যদি কোনো প্রকল্পের দায়িত্বে থেকে ১০ টাকার কাজ ৫০ টাকায় করেন, বা ৩ বছরের প্রকল্প ৮ বছরে শেষ করেন এবং তার জন্য যদি কোনো জবাবদিহি করতে না হয়, তবে এই ভুলের মাশুল শুধু পাঁচ বছর পর নয়, পরবর্তী প্রজন্মকেও দিতে হবে।

সুতরাং, আমাদের একটি জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শুরু করে নাগরিক হিসেবে আমাদের নিজ নিজ দায়িত্বে এর প্রতিফলন ঘটাতে হবে। তবে এর প্রধান পূর্বশর্ত হলো—যাঁরা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আছেন, এই চর্চাটি প্রথমে তাঁদের কাছ থেকে আসতে হবে। ওপরের স্তরে জবাবদিহি না থাকলে, নিচের স্তরের কেউই পরোয়া করবে না; সবাই ভাববে, ওপরের মানুষটিই তো করছেন, আমি করলে আর সমস্যা কী!

স্ট্রিম: আগামী পাঁচ বছরের জন্য যদি বাংলাদেশের অর্থনীতির সংস্কারের রূপরেখা তৈরি করতে বলা হয়, তবে আপনার মতে প্রথম পাঁচটি সিদ্ধান্ত কী হওয়া উচিত?

মোস্তাফিজুর রহমান: সংস্কারের ক্ষেত্রে আমার প্রস্তাবিত পাঁচটি প্রধান সিদ্ধান্ত বা ক্ষেত্র হলো:

প্রথমত, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার: আমরা এই খাতে একটি বড় ব্ল্যাক হোল-এ পড়েছি, যেখান থেকে বের হওয়া অত্যন্ত জরুরি। ইতিমধ্যেই কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ব্যাংকগুলোর ব্যালেন্স শিট পরিষ্কার করা হচ্ছে, যাতে খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন রাখতে গিয়ে ব্যাংকের স্বাভাবিক ঋণ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত না হয়। তবে এর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতা দিতে হবে। রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক বা কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহলের প্রভাবমুক্ত হয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অভিভাবক হিসেবে তার নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব কঠোরভাবে পালন করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, রাজস্ব খাতের সংস্কার: রাজস্ব নীতি প্রণয়ন এবং তার বাস্তবায়ন—এই দুটিকে আলাদা করা যায় কি না, তা নিয়ে বিতর্ক চলছে। তবে মূল লক্ষ্য হতে হবে করের আওতা বা ট্যাক্স বেস বাড়ানো।

আমাদের দেখতে হবে করের ভিত্তি কতটা বাড়ানো যায়। দেশে এক কোটির বেশি টিআইএন ধারী আছেন, কিন্তু তাদের মধ্যে কতজন রিটার্ন জমা দেন বা কর দেন? আরেকটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, সাধারণ মানুষ কিন্তু চাল, ডাল, তেল, চিনি কিনতে গিয়ে ঠিকই কর (ভ্যাট) দিচ্ছেন। আমাদের মোট রাজস্বের দুই-তৃতীয়াংশই আসে অপ্রত্যক্ষ কর থেকে। তাই দেশে করের ভিত্তি কম—এ কথা বলা যাবে না। আমাদের মূলত প্রত্যক্ষ করের ভিত্তি কম। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং সমন্বয়ের মাধ্যমে এই প্রত্যক্ষ করের ভিত্তি বাড়ানো সম্ভব।

তৃতীয়ত, জ্বালানি নিরাপত্তা: এই খাতে এখন আমাদের এগ্রেসিভলি পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে কূপ খনন জোরদার করতে হবে। আমাদের বিশাল কয়লার মজুত রয়েছে, কিন্তু এটি উত্তোলনের বিষয়টি একটি বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ব্যাপার। স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে পরিবেশের ক্ষতি না করে কতটুকু কয়লা তোলা যায়, তা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে সংলাপ হওয়া প্রয়োজন, যা এখনো হচ্ছে না।

চতুর্থত, খাদ্য নিরাপত্তা ও সুশাসন: বর্তমানে বড় কোনো সংকট নেই বলে এটি নিয়ে আমরা কম আলোচনা করছি, কিন্তু খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। খরা বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের পর্যাপ্ত মজুত থাকতে হবে। সরবরাহ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ঠিক রাখা এবং সঠিক সময়ে আমদানির হিসাব নিখুঁতভাবে করার পদক্ষেপ নিতে হবে। এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি। রাষ্ট্র এবং আমাদের মতো নন-স্টেট অ্যাক্টরদের সমন্বয়ে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থীসহ সাধারণ নাগরিক নিরাপদে কাজ করতে পারবেন।

পঞ্চমত, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার: আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূচকে শিক্ষায় আমাদের অবস্থান অত্যন্ত হতাশাজনক। এত দিন আমরা শুধু পরিমাণগত দিক (যেমন: পাসের হার বা এনরোলমেন্ট) নিয়ে মেতে ছিলাম। এখন সময় এসেছে গুণগত উৎকর্ষতা বাড়ানোর।

তরুণ প্রজন্মকে একটি উৎপাদনশীল শক্তি হিসেবে গড়ে তুলে তাদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। একবিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশের গন্তব্য হওয়া উচিত—একটি আর্থিকভাবে উন্নত, সামাজিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং পরিবেশবান্ধব রাষ্ট্র। এই গন্তব্যে পৌঁছাতে হলে মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা অপরিহার্য। একইসঙ্গে, তরুণদের সামনে আশার আলো দেখাতে হবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় এমন মানুষদের থাকতে হবে, যাদের নতুন প্রজন্ম আদর্শ হিসেবে অনুসরণ করতে পারে। এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারলেই বাংলাদেশ তার যে অঙ্গীকার আছে তা বাস্তবে রূপ দিতে পারবে।

স্ট্রিম: ঢাকা স্ট্রিমকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

মোস্তাফিজুর রহমান: আপনাকেও ধন্যবাদ।


অর্থনীতিতে কাঠামোগত রূপান্তর ছাড়া বর্তমান সংকট কাটানো সম্ভব নয় – অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান

অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমানের সাক্ষাৎকার (১ম পর্ব)

 

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.