দরিদ্ররা এখনো ভাতের ওপর প্রবলভাবে নির্ভরশীল: ড. ফাহমিদা খাতুন

Originally posted in দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড on 11 September 2026

ভাত খাওয়া কমেছে ২৫%, পাতে বাড়ছে ফল ও আমিষ

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সাধারণ বাংলাদেশির খাবারের পাতের মূল দর্শন ছিল এমনটাই—উঁচু থালা ভরা ধবধবে সাদা ভাত, সাথে পর্যাপ্ত ডাল কিংবা ছোট এক টুকরো মাছ। পেট ভরা মানেই ছিল ভাতে ক্ষুধা নিবৃত্তি।

ইলাসট্রেশন: আশরাফুন নাহার অনন্যা/টিবিএস ক্রিয়েটিভ

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সাধারণ বাংলাদেশির খাবারের পাতের মূল দর্শন ছিল এমনটাই—উঁচু থালা ভরা ধবধবে সাদা ভাত, সাথে পর্যাপ্ত ডাল কিংবা ছোট এক টুকরো মাছ। পেট ভরা মানেই ছিল ভাতে ক্ষুধা নিবৃত্তি।

কিন্তু সেই চিরচেনা চিত্রে এখন বড় পরিবর্তন এসেছে।

বাংলাদেশের খাবারের টেবিলে নীরবে ঘটে গেছে এক বড় বিপ্লব। গত দুই দশকে বাংলাদেশিরা তাদের দৈনিক ভাত খাওয়ার পরিমাণ ২৫.২ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে। ভাতের থালার সেই পাহাড় এখন ছোট হয়ে এসেছে, আর সেখানে জায়গা করে নিয়েছে আরও বৈচিত্র্যময়, পুষ্টিকর ও রঙিন সব খাবার।

২০০৫ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত ‘খানা আয় ও ব্যয় জরিপ’ (এইচআইইএস)-এর চারটি পর্বের জাতীয় গড় খাদ্য গ্রহণের উপাত্ত বিশ্লেষণে এই পরিবর্তনের স্পষ্ট চিত্র ফুটে উঠেছে।

খাদ্য তালিকার এই রূপান্তর কেবল খাবার পাতেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি ছড়িয়ে পড়েছে পুরো পারিবারিক অর্থনীতিতে। বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী, পরিবারের মোট খরচে খাদ্যের পেছনে ব্যয়ের অনুপাত আগের চেয়ে কমেছে। অন্যদিকে আবাসন, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও যোগাযোগের মতো খাদ্যবহির্ভূত মৌলিক খাতগুলোতে ব্যয়ের হার বেড়েছে।

দেশে দারিদ্র্য হ্রাস পাওয়া এবং মানুষের সার্বিক আয় ও সমৃদ্ধি বাড়ার সাথে সাথে—জীবনযাত্রা ও খরচের ধরনের এই মৌলিক পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “আয়ের প্রবৃদ্ধি, নগরায়ণ, পুষ্টি সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের ফলেই মূলত খাদ্যাভ্যাসে এই ধারা তৈরি হয়েছে।”

ভাত-নির্ভর খাদ্যাভ্যাস কমছে

খানা আয় ও ব্যয় জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালে বাংলাদেশিদের মাথাপিছু দৈনিক ভাত খাওয়ার পরিমাণ ছিল ৪৩৯.৬ গ্রাম, যা ২০২২ সালে নেমে এসেছে ৩২৮.৯২ গ্রামে। ভাত এখনো দেশের প্রধান খাদ্য থাকলেও—বিস্তৃত হতে থাকা খাদ্য তালিকায় এর একচ্ছত্র আধিপত্য কমেছে।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে ফল খাওয়ার ক্ষেত্রে। ২০০৫ সালে মাথাপিছু ফল খাওয়ার পরিমাণ ছিল দিনে মাত্র ৩২.৫ গ্রাম, যা ২০২২ সালে প্রায় তিনগুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৫.৪ গ্রামে—যা ১৯৩.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির নির্দেশ করে। এর মাধ্যমে জাতীয় খাদ্য গ্রহণের তালিকায় আলু ও মাছকে পেছনে ফেলে ফল পঞ্চম থেকে তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে।

এ ছাড়া শাকসবজি খাওয়ার পরিমাণ ২৮.৬ শতাংশ বেড়ে দিনে ১৫৭ গ্রাম থেকে ২০১.৯২ গ্রামে পৌঁছেছে, যা দ্বিতীয় সর্বাধিক গ্রহীত খাবারের অবস্থান ধরে রেখেছে। ফলে ভাত ও সবজি খাওয়ার মধ্যকার ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে: ২০০৫ সালে মানুষ সবজির তুলনায় ২.৮ গুণ বেশি ভাত খেত; ২০২২ সালে সেই অনুপাত কমে ১.৬ গুণে নেমেছে। এই সময়ে আলু খাওয়ার পরিমাণ ৬৩.৩ গ্রাম থেকে ১০ শতাংশ বেড়ে ৬৯.৭ গ্রামে দাঁড়িয়েছে।

প্রধান খাদ্য হিসেবেই রয়ে গেছে মাছ

মাথাপিছু মাছ খাওয়ার পরিমাণ ৪২.১ গ্রাম থেকে ৬০ শতাংশের বেশি বেড়ে দৈনিক ৬৭.৮৩ গ্রামে পৌঁছেছে। তা সত্ত্বেও জাতীয় খাদ্য তালিকার র‌্যাঙ্কিংয়ে মাছ চতুর্থ স্থান থেকে পঞ্চম স্থানে নেমে গেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে মানুষ মাছ খাওয়া কমিয়ে দিয়েছে; বরং ফল ও মুরগির মাংসের মতো কিছু খাবার গ্রহণ— মাছের তুলনায় অনেক দ্রুত গতিতে বাড়ায় তালিকায় এই স্থান পরিবর্তন ঘটেছে।

অর্থাৎ, মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি মাছ খেলেও অন্যান্য কিছু খাদ্য গ্রহণ বেড়েছে আরও দ্রুতগতিতে।

মাংস ও ডিমের অবস্থান জোরালো

প্রাণিজ আমিষ বা প্রোটিন গ্রহণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় লাফ লক্ষ্য করা গেছে। গরুর মাংস খাওয়ার পরিমাণ দিনে মাথাপিছু ৭.৮ গ্রাম থেকে ৪৯.৫ শতাংশ বেড়ে ১১.৬৬ গ্রামে দাঁড়িয়েছে।

মুরগি ও হাঁসের মাংসের বেলায় তা ৬.৮ গ্রাম থেকে ২৮৫ শতাংশ বেড়ে ২৬.১৭ গ্রামে পৌঁছেছে। এ ছাড়া খাসির মাংস খাওয়া ০.৬ গ্রাম থেকে ১১৩ শতাংশের বেশি বেড়ে ১.২৮ গ্রাম হয়েছে। এর ফলে ২০০৫ সালে খাদ্য গ্রহণের তালিকায় ১৩ নম্বরে থাকা হাঁস-মুরগির মাংস ২০২২ সালে ৯ নম্বরে উঠে এসেছে।

একইভাবে ডিম খাওয়ার পরিমাণও অর্ধেকের বেশি বেড়ে দিনে মাথাপিছু ৫.২ গ্রাম থেকে ১২.৭৩ গ্রামে উন্নীত হয়েছে।

ভাত, সবজি, ফল, আলু বা মাছের তুলনায় এই পরিমাণগুলো এখনও কিছুটা কম হলেও সার্বিক প্রবণতা স্পষ্ট—বাংলাদেশিদের খাদ্য তালিকায় প্রাণিজ আমিষের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে।

ডাল খাওয়ার পরিমাণ ১৪.২ গ্রাম থেকে ২০.৮ শতাংশ বেড়ে ১৭.১৫ গ্রাম হলেও — অন্যান্য খাদ্যগ্রহণ বেশি বাড়ায়, তালিকায় এটি নবম থেকে একাদশ স্থানে নেমে গেছে। অন্যদিকে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের অংশ প্রায় স্থিতিশীল রয়েছে, যা ৩২.৪ গ্রাম থেকে মাত্র ৫.২ শতাংশ বেড়ে ৩৪.১ গ্রাম হয়েছে।

বৈচিত্র্য মানেই কি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস?

খাদ্যাভ্যাসের এই রূপান্তরের সাথে স্বাস্থ্যগত কিছু ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। ভোজ্য তেল খাওয়ার পরিমাণ দিনে মাথাপিছু ১৬.৫ গ্রাম থেকে ৮৭ শতাংশ বেড়ে ৩০.৮৫ গ্রামে দাঁড়িয়েছে। এর সঙ্গে চিনি ও প্রাণিজ চর্বির অতিরিক্ত ভোজন যোগ হওয়ায়, দেখা যাচ্ছে খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য আসার অর্থই স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুষ্টিকর বা স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে ওঠা নয়।

পারিবারিক বাজেটে কমছে রান্নাঘরের ভাগ

খাবারের টেবিলের পরিবর্তন পরিবারের আয়-ব্যয়ের হিসাবের পরিবর্তনের সাথেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। ২০০৫ সালে, যখন দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করত, তখন একটি পরিবারের মোট খরচের ৫৩.৮ শতাংশই চলে যেত খাবারের পেছনে; খাদ্যবহির্ভূত খাতে বরাদ্দ থাকত মাত্র ৪৬.২ শতাংশ।

২০২২ সালে দারিদ্র্যের হার কমে ১৮.৭ শতাংশে নেমে এলে এই সমীকরণ উল্টে যায়। খাদ্যে খরচ কমে দাঁড়ায় ৪৫.৮ শতাংশে, আর খাদ্যবহির্ভূত খাতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৪.২ শতাংশে। ২০১০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যবর্তী সময়ে এই খাতভিত্তিক খরচে উল্টোরথ শুরু হয় এবং এরপর থেকেই খাদ্যবহির্ভূত খাতের আধিপত্য বজায় রয়েছে।

এই পরিবর্তন দেখাচ্ছে যে পরিবারের আর্থিক অবস্থা যেমন উন্নত হয়েছে, তেমনি খাবারের গণ্ডি পেরিয়ে অন্যান্য মৌলিক ও চাহিদামূলক খাতে খরচের পরিমাণও বেড়েছে।

ড. ফাহমিদা খাতুন উল্লেখ করেন, খাদ্যবহির্ভূত খাতে বিশেষ করে আবাসন, চিকিৎসা, শিক্ষা, পরিবহন, ইউটিলিটি ও ডিজিটাল সেবায় ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়া অর্থনীতির কাঠামোগত অগ্রগতির বহিঃপ্রকাশ হতে পারে। টিবিএসকে তিনি বলেন, “এটি জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ারও ইঙ্গিত দেয়। ফলে অনেক পরিবারকে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যবহির্ভূত খরচের সঙ্গে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবারের ভারসাম্য রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।”

তবে এই চিত্রে এক তীব্র বৈষম্যও দৃশ্যমান। দেশের সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশ পরিবারের খরচের ৫৯.৮ শতাংশই এখনও চলে যায় খাবারে। অন্যদিকে সবচেয়ে স্বচ্ছল বা ধনী ৫ শতাংশ পরিবারের খরচের মাত্র ২৮.৯ শতাংশ যায় খাবারের পেছনে, আর বাকি ৭১.১ শতাংশ অর্থ তারা অন্যান্য পণ্য ও সেবায় খরচ করতে পারে।

ড. ফাহমিদা বলেন, “দরিদ্র পরিবারগুলোতে পারিবারিক বাজেটের বড় অংশ এখনও রান্নাঘরের পেছনেই যায়। খাদ্য বৈচিত্র্য এখনো অসম। স্বল্প-আয়ের পরিবারগুলো এখনো ভাতের ওপর প্রবলভাবে নির্ভরশীল। পণ্যের দাম বাড়লে তারা প্রথমেই পুষ্টিকর খাবারের বাজেট কাটছাঁট করতে বাধ্য হয়।”

বদলাচ্ছে খাদ্যাভ্যাস, উদয় হচ্ছে নতুন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

অর্থনীতিবিদদের মতে, আয় বৃদ্ধি, নগরায়ণ, পরিবর্তনশীল জীবনযাত্রা, বাজারে নিত্যনতুন খাবারের সহজলভ্যতা এবং তুলনামূলক মূল্যের পরিবর্তনের মতো বেশ কিছু কারণের সমন্বয়ে এই রূপান্তর ঘটছে।

বিবিএসের জাতীয় হিসাব পরিসংখ্যানের তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় (জিএনআই) বেড়ে ৩,০২০ ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছর ছিল ২,৭৬৯ ডলার। এটি প্রথমবারের মতো ৩,০০০ ডলারের ঘর অতিক্রম করেছে। ২০০৪-০৫ অর্থবছরে এটি ছিল মাত্র ৫৭৭ ডলার।

তবে খাদ্যাভ্যাসের এই পরিবর্তন সামষ্টিক অর্থনীতিতে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জও তৈরি করছে। বাজারে এখন চালের চেয়ে মাংস, মাছ, ফলমূল, গম ও ভোজ্যতেলের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু দেশের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা এই পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারলে আমদানিনির্ভরতা মারাত্মকভাবে বেড়ে যেতে পারে। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং বাণিজ্য ভারসাম্যের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.