Originally posted in কালের কন্ঠ on 12 June 2026
দেশের অর্থনীতি যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিম্নমুখী প্রবৃদ্ধি, দুর্বল বিনিয়োগ পরিবেশ এবং কর্মসংস্থান সংকটসহ বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, এই বাস্তবতায় বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে সরকারের অগ্রাধিকার নির্ধারণ মোটের ওপর সঠিক হয়েছে, তবে এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপর।
এবারের বাজেট তিনটি বড় চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে তৈরি হয়েছে।
প্রথমত, বৈদেশিক খাতের কয়েকটি সূচক ছাড়া প্রায় সব সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকই ছিল চাপে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি, বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল ছিল, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি ছিল উচ্চ পর্যায়ে। দ্বিতীয়ত, নতুন সরকার জনগণের প্রত্যাশা ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির আলোকে বাজেট প্রণয়নের চাপের মুখে ছিল। তৃতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের মতো কঠিন সিদ্ধান্তও সরকারকে নিতে হয়েছে।
বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে রাজস্ব আহরণ। সরকার সংশোধিত বাজেটের তুলনায় রাজস্ব আদায়ে প্রায় ১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু প্রকৃত আদায়ের ভিত্তিতে হিসাব করলে এই প্রবৃদ্ধির হার আরো অনেক বেশি, এমনকি ৩০ শতাংশের কাছাকাছিও হতে পারে। ফলে এই লক্ষ্য অর্জনে সরকারের বড় ধরনের উদ্যোগ ও প্রশাসনিক দক্ষতা প্রয়োজন হবে।
বাজেটে আমদানি-প্রতিস্থাপক ও রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য বিভিন্ন করসুবিধা, বন্ড সুবিধা, অগ্রিম কর (এআইটি) প্রত্যাহার, সম্পূরক শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক হ্রাসের মতো যৌক্তিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে এসব কারণে কিছু খাতে রাজস্ব আয় কমতে পারে। ফলে করভিত্তি সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ, প্রযুক্তিনির্ভর কর প্রশাসন ও এনবিআরের সংস্কার বাস্তবায়ন জরুরি হয়ে পড়বে।
শুধু নীতিগত ঘোষণাই যথেষ্ট নয়, কর প্রশাসনের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। করজালের বাইরে থাকা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে করের আওতায় আনতে হবে, যা অনেক ক্ষেত্রে জনপ্রিয় নাও হতে পারে।
তবু রাজস্ব আহরণের স্বার্থে সরকারকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
স্বাস্থ্যসহ কয়েকটি খাতে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হলেও অতীতে এসব খাত বরাদ্দের পুরো অর্থ ব্যয় করতে পারেনি। ফলে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা ও জবাবদিহি বাড়াতে হবে। বাজেট বাস্তবায়নের জন্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা শক্তিশালী করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সরকার ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করার পরিকল্পনা করেছে। কিন্তু রাজস্ব আদায় প্রত্যাশা অনুযায়ী না হলে ব্যাংক খাতের ওপর চাপ বাড়বে। এতে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতির মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যানবাহন, স্টার্টআপ, কনটেন্ট ডেভেলপমেন্ট ও নতুন প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির পরিধি বাড়ানো, একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে বিভিন্ন সেবা প্রদানের উদ্যোগ এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া ইতিবাচক দিক।
অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্পাঞ্চলে করসুবিধা দেওয়ার ফলে স্বল্প মেয়াদে রাজস্ব কিছুটা কমলেও দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে তা সহায়ক হবে। একই সঙ্গে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় থোক বরাদ্দ থেকে যেসব প্রকল্প নেওয়া হবে, সেগুলো কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে নির্বাচন করতে হবে।
বাজেটের অগ্রাধিকার ও নীতিগত দিকনির্দেশনা যথাযথ রয়েছে। তবে রাজস্ব আহরণ, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, ব্যয়ের দক্ষতা ও ঘাটতি অর্থায়নের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার ওপরই নির্ভর করবে বাজেটের প্রকৃত সফলতা। বাস্তবায়নে দুর্বলতা থাকলে ভালো উদ্যোগগুলোর সুফলও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পাওয়া যাবে না।
লেখক : সম্মাননীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)


