Originally posted in বাংলা স্ট্রিম on 1 July 2026

আজ পহেলা জুলাই, নতুন অর্থবছরের সূচনা। শুরু হচ্ছে নতুন বাজেটের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া। তবে নতুন অর্থবছর কেবল বাজেটের হিসাব-নিকাশে সীমাবদ্ধ থাকে না। বাজেটের বাইরেও বাজার ব্যবস্থাপনা, সামষ্টিক অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কর্মসূচি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে আসা চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা—এসব কিছু নিয়েই আবর্তিত হয় দেশের অর্থনীতি। তাছাড়া পুঞ্জীভূত নানা সংকটের কারণে এবারের অর্থবছরটি নিঃসন্দেহে চ্যালেঞ্জিং হতে যাচ্ছে।
সরকার একটি জনবান্ধব, ব্যবসাবান্ধব, বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তাবান্ধব বাজেট প্রণয়নের চেষ্টা করেছে। কিন্তু দিনশেষে সবকিছু নির্ভর করবে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর। আমরা কতটা দক্ষতার সঙ্গে এই বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারছি, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
বাজেটে স্থির আয়ের মানুষ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে স্বস্তি দেওয়ার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কথা বলা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দেবে। তবে মূল লক্ষ্য হতে হবে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা। যার এসব সুবিধা পাওয়ার কথা, তিনি যেন পান, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য ডিজিটাল সোশ্যাল রেজিস্ট্রি বা সামাজিক সুরক্ষা তালিকার আধুনিকায়ন জরুরি। মিড-ডে মিলসহ যেসব পাইলট প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আগামী দিনের কর্মসূচি আরও নিখুঁতভাবে সাজাতে হবে। এককথায়, আগামী অর্থবছরে সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি হবে বাজেটের যথাযথ বাস্তবায়ন।
নতুন অর্থবছরে আমাদের সামনে বড় তিনটি চ্যালেঞ্জ—মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ চাঙ্গা করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন মুদ্রানীতিও ঘোষণা করেছে। বর্তমানে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি প্রায় সাড়ে নয় শতাংশের কাছাকাছি। এমন উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমানোর লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পলিসি রেট বা নীতি সুদহার বেশ ওপরের দিকেই ধরে রেখেছে। এর ফলে ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাড়ছে, যা বিনিয়োগে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। মূল্যস্ফীতির কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক হয়তো এখনই পলিসি রেট কমাতে চাইবে না; তবে সুযোগ পেলেই এটি পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনা উচিত।
মনে রাখতে হবে, কেবল মুদ্রানীতি দিয়ে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে বিনিয়োগ চাঙ্গা করা সম্ভব নয়। বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ বেশি জরুরি। ‘সিঙ্গল উইন্ডো’ বা এক ছাতার নিচে সেবা প্রদান, লজিস্টিক পলিসির যথাযথ বাস্তবায়ন, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো এবং বন্দরে পণ্য খালাসের সময় কমিয়ে আনার দিকে আমাদের বিশেষ নজর দিতে হবে। ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানোটাই হবে বিনিয়োগ চাঙ্গা করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। বিনিয়োগ না বাড়লে বড় আকারের কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে না। বাজেটে স্বকর্মসংস্থানের কিছু উদ্যোগ থাকলেও ব্যাপক কর্মসংস্থানের জন্য বৃহৎ বিনিয়োগের বিকল্প নেই।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের অতীত চিত্র খুব আশাব্যঞ্জক নয়। গত অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে এডিপির মাত্র ৪৮ শতাংশ (প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকা) বাস্তবায়িত হয়েছে। অথচ নতুন অর্থবছরে আমাদের প্রায় ৩ লক্ষ কোটি টাকার এডিপি বাস্তবায়ন করতে হবে। এটি একটি বিশাল উল্লম্ফন এবং এর জন্য প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
জনগণ যে কর দিচ্ছে, তার সম্পূর্ণটা যেন রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয়, তা নিশ্চিত করা প্রথম শর্ত। বিভিন্ন প্রযুক্তিগত কাঠামোর মধ্যে ‘ইন্টারঅপারেবিলিটি’ বা আন্তঃযোগাযোগ স্থাপন করতে হবে, যাতে একটি প্রযুক্তি অন্যটির সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে। ভ্যাট অনলাইন, ই-সাবমিশন ইত্যাদির পাশাপাশি কিউআর কোডের মতো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।
যেসব মন্ত্রণালয় বা বিভাগ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে, তাদের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও জবাবদিহিতা আগের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি। এত বড় আকারের এডিপি সাশ্রয়ীভাবে, সুশাসনের সঙ্গে এবং নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন কেবল পরিকল্পনা কমিশন বা আইএমইডি-র একার পক্ষে সম্ভব নয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় সরকার ও স্থানীয় কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করার বিষয়ে এখন আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।
আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আহরণ হবে সরকারের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। বাজেটের আকার ও ব্যয়ের বিশালত্বের বিপরীতে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় করতে হবে। চলতি বছরের আদায়ের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে, যা অত্যন্ত কঠিন একটি লক্ষ্য। দেশীয় শিল্প, আমদানি প্রতিস্থাপক খাত এবং সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমাতে বাজেটে অনেক ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় বড় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে রাজস্ব প্রশাসনে প্রযুক্তিগত বিপ্লব আনতে হবে।
জনগণ যে কর দিচ্ছে, তার সম্পূর্ণটা যেন রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয়, তা নিশ্চিত করা প্রথম শর্ত। বিভিন্ন প্রযুক্তিগত কাঠামোর মধ্যে ‘ইন্টারঅপারেবিলিটি’ বা আন্তঃযোগাযোগ স্থাপন করতে হবে, যাতে একটি প্রযুক্তি অন্যটির সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে। ভ্যাট অনলাইন, ই-সাবমিশন ইত্যাদির পাশাপাশি কিউআর কোডের মতো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রত্যক্ষ করের দিকে যাওয়ার যে নীতি সরকার নিয়েছে, তা সাধুবাদযোগ্য। তবে এজন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংস্কার কর্মসূচিগুলোকে যৌক্তিক পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে হবে।
পরিশেষে, অর্থনীতির চাকা সচল হলেই রাজস্ব আদায় বাড়বে। যদি আমদানিতে গতি না আসে, বিনিয়োগ চাঙা না হয় এবং এডিপি বাস্তবায়নে স্থবিরতা থাকে, তবে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে রাজস্ব আহরণে। তাই সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত করে অর্থনীতিতে চাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনতে হবে। সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতাই নির্ধারণ করবে আগামী দিনে সামষ্টিক অর্থনীতির এই চ্যালেঞ্জগুলো আমরা কতটা সফলভাবে মোকাবিলা করতে পারব।
অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান: সম্মাননীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)


