স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ব্যয়ে ব্যর্থতা জবাবদিহির অভাবের প্রতিফলন: ফাহমিদা খাতুন

২০২৫-২৬ অর্থবছর

Originally posted in বণিকবার্তা on 31 July 2026

এডিপি বাস্তবায়ন হার ৬৭.৫২ শতাংশ, ৫০ বছরে সর্বনিম্ন

দেশে অবকাঠামোসহ বিভিন্ন উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ বাড়লেও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার কমছে।

বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ২ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকার এডিপি বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশ। ৫০ বছরের মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন বাস্তবায়ন হার। রাজস্ব সংকট, প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি ও অর্থছাড়ে সীমাবদ্ধতার কারণে অধিকাংশ মন্ত্রণালয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা খাতগুলোর একটি স্বাস্থ্য। এ মন্ত্রণালয়ের অধীন দুই বিভাগ বরাদ্দের মাত্র ৩১-৩৭ শতাংশ ব্যয় করতে পেরেছে। বরাদ্দ থাকার পরও অর্থ ব্যয় করতে না পারার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও জবাবদিহির ঘাটতিকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

গতকাল ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এডিপি বাস্তবায়নের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে। সেখানে এ চিত্র পাওয়া গেছে।

আইএমইডির তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের ৫৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ উন্নয়ন বাজেটের মাত্র ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশ ব্যয় করতে পেরেছে। আইএমইডি ও বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, স্বাধীনতার পর প্রথম চার বছর এডিপি বাস্তবায়ন হার কম থাকলেও ১৯৭৬-৭৭ অর্থবছরের প্রায় ৯৯ শতাংশ সংশোধিত এডিপি বাস্তবায়ন হয়। পরবর্তী ৪৮ বছর ৮০-৯০ শতাংশ বা তারও বেশি এডিপি বাস্তবায়ন হয়। এমনকি নব্বইয়ের দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময়ও বাংলাদেশের এডিপি বাস্তবায়ন হার ছিল অনেক বেশি। তবে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর ধস নামে উন্নয়ন বরাদ্দ ব্যয়ে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার প্রথম বছর অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবছর দ্বিতীয় সর্বনিম্ন ৬৮ দশমিক ১৮ শতাংশ ব্যয় করে সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৮০ দশমিক ৬৩, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৮৫ দশমিক ১৭ ও ২০২১-২২ অর্থবছরে ৯২ দশমিক ৭৪ শতাংশ বরাদ্দ বাস্তবায়ন হয়।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও তা কাজে আসেনি। বছরের প্রথম ১১ মাসে মাত্র ৪৮ শতাংশ বরাদ্দ ব্যয় হলেও জুনে ১৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ বরাদ্দ ব্যয়ের তথ্য দিয়েছে আইএমইডি। মূলত শেষ সময়ে বিভিন্ন উন্নয়নকাজের অডিট শেষ হওয়ায় এ বরাদ্দ বাড়ার কারণ বলছে সংস্থাটি। গত এক বছরের টাকার অংক ও বাস্তবায়ন হার উভয় ক্ষেত্রে কমেছে। বাস্তবায়নে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ মন্ত্রণালয় বরাদ্দের প্রায় ৯৯ দশমিক ৫৩ শতাংশ ব্যয় করেছে। এছাড়া সর্বোচ্চ ব্যয়ের হার রয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (৯৬.৫২), জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ (৯৩.৭৩), ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ (৯১.৮৪) ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ (৯০.৭৬)।

গত অর্থবছরে বাস্তবায়ন হার কম হওয়ার পেছনে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও দেড় বছরের প্রশাসনিক স্থবিরতা কাজ করেছে বলে মনে করেন আইএমইডির কর্মকর্তারা। সিনিয়র এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এর আগে এক অর্থবছরে এত কম এডিপি বাস্তবায়ন দেখিনি। সবসময় বাস্তবায়ন হার ৮০ শতাংশের ওপরে থাকে। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মাঝামাঝিতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রশাসনে বড় ধরনের অস্থিরতার কারণে এডিপি বাস্তবায়ন হার কমে যায়। আওয়ামীপন্থী অনেক প্রকল্প পরিচালক ও ঠিকাদার পালিয়ে যান। বিদেশী অনেক অর্থায়ন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সে কারণে পরপর দুই বছর এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।’ তিনি আশাবাদ প্রকাশ করে বলেন, ‘বর্তমান সরকার প্রকল্প বাস্তবায়নে অগ্রগতি আনতে চায়। সেজন্য নির্বাচনী ইশতাহারের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ কিছু প্রকল্প বাদ দেয়ার পরিকল্পনাও করছে। যদি সঠিক পরিকল্পনা করতে পারে এবং অপ্রয়োজনীয় ও জটিলতা আছে এমন প্রকল্প বাদ দেয় তাহলে পরিবর্তন আসবে।’

এদিকে জনগুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও পিছিয়ে রয়েছে স্বাস্থ্য খাত। মন্ত্রণালয়টির দুটি বিভাগ বরাদ্দের ৬৫-৬৯ শতাংশই ব্যয় করতে পারেনি। এর মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ৩১ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ ৩৬ দশমিক ৭২ শতাংশ ব্যয় করেছে। স্বাস্থ্য খাতে এডিপি বাস্তবায়নে ১০টি চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছে আইএমইডি। এর মধ্যে পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না দেয়া, বাস্তবায়নকারী সংস্থার সমন্বয়হীনতা, পরিকল্পনার অভাব, ঘন ঘন মেয়াদ বৃদ্ধি, রাজস্ব বাজেটের অপ্রতুলতা, স্টিয়ারিং কমিটির সভা না হওয়া অন্যতম।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও জবাবদিহি না থাকার কারণে এডিপি বাস্তবায়নে এমন ধস নেমেছে বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ খাত হওয়া সত্ত্বেও এখানে কারো নজর নেই। এ খাতে ৬০-৬৫ শতাংশ বরাদ্দ খরচ না হওয়া মানে কোনো জবাবদিহি নেই। আমাদের এডিপির সুষ্ঠু বাস্তবায়ন করতে হলে পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় বা বিভাগগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তদারকি বাড়াতে হবে। কেন বাস্তবায়ন করতে পারছে না সেটা দেখতে হবে।’

এদিকে সরকার এডিপি বাস্তবায়নে প্রকল্প পরিকল্পনার দুর্বলতা, ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা, অর্থায়নের অনিশ্চয়তা এবং দুর্বল তদারকির কারণে উন্নয়ন প্রকল্পে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধিসহ ১৮টি প্রধান চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে আইএমইডি। ২৮ জুলাই ‘বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের প্রধান চ্যালেঞ্জ এবং সুপারিশ’ শীর্ষক এক বৈঠকে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়।

সরকার ভবিষ্যতে প্রকল্প নেয়ার ক্ষেত্রে সঠিক পরিকল্পনা নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি। গতকাল বিআইডিএসের এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘বর্তমান এডিপি প্রস্তুতের সময় সরকারের নির্বাচনী ইশতাহার ও প্রণয়নাধীন পাঁচ বছরব্যাপী উন্নয়ন ও সংস্কার কৌশলপত্রের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্য করার মতো পর্যাপ্ত সময় ছিল না। সে কারণে বাজেট ঘোষণার পরও প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করে প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এটি এক ধরনের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা দাঁড়াবে, যা সরকারের ইশতাহার ও কৌশলপত্রের সঙ্গে অনেক বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। এ লক্ষ্যে প্রায় ৬২টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করতে হচ্ছে। প্রতিটি প্রকল্পের লক্ষ্য, নকশা ও বাস্তবায়ন কাঠামো নতুন করে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। গত কয়েক মাসের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অনেক প্রকল্প আগেই নেয়া হলেও সেগুলোর গুণগত মান, লক্ষ্য অর্জনের সক্ষমতা এবং নকশায় বিভিন্ন ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.