ঋণের বিপরীতে আয় বাড়ানোর সক্ষমতা তৈরি করতে হবে: ফাহমিদা খাতুন

Originally posted in বাংলা স্ট্রিম on 29 September 2026

অর্থ সংগ্রহে সভরেন বন্ড ইস্যুর উদ্যোগ/শ্রীলঙ্কার মতো দেউলিয়া হওয়ার ভয় আছে কি

সভরেন বন্ড বা সার্বভৌম ঋণপত্র ইস্যুর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার থেকে সরকারের ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলার ঋণ গ্রহণের পরিকল্পনাটি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। চলতি সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকেই এ সংক্রান্ত পৃথক দুটি প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে সরকারের অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটি। এখন তা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ঋণের উৎস বৈচিত্রায়নে বাজারভিত্তিক ঋণের পথে হাঁটতেই হতো বাংলাদেশকে। কিন্তু নিয়ন্ত্রিত ও উৎপাদনশীল ব্যবহার নিশ্চিত না করা গেলে এই বাজারভিত্তিক ঋণই হয়ে উঠতে পারে বড় সংকটের কারণ।

তাদের ভাষ্যমতে, সভরেন বন্ডের সুদহার অন্যান্য বৈদেশিক উৎসের চেয়ে তুলনামূলক বেশি। আবার এটি পরিশোধে সময় পাওয়া যায় কম। দেশের অর্থনীতিতে সরকারের দায়দেনা এমনিতেই বড় ধরনের চাপ তৈরি করে রেখেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় তা আরো প্রকট হয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদেশী ঋণের ভিত্তিতে বেশ কিছু মেগাপ্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবায়নের দুর্বলতা, দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্নীতির কারণে এগুলোর বেশ কয়েকটিরই অর্থনৈতিক সুফল তেমন একটা পাওয়া যায়নি। যদিও অনেকগুলোর ঋণ ও ঋণের সুদ পরিশোধ এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে নতুন করে ঋণ নিয়ে ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে সরকারকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অর্থনীতির অব্যবস্থাপনায় বহিস্থ ও অভ্যন্তরীণ চাপ সামলানোর সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মারাত্মকভাবে। এ অবস্থায় সভরেন বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে বাজার থেকে ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে সরকারের সতর্ক ও সংযমী হওয়া উচিত। অন্যথায় বড় ধরনের দুর্বিপাকে পড়ে যেতে পারে দেশের অর্থনীতি।

এক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়া বাংলাদেশের জন্য জরুরি বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

দক্ষিণ এশিয়ার আরেক মধ্যম আয়ের দেশ শ্রীলঙ্কা দেউলিয়া হয়ে যায় ২০২২ সালে। মারাত্মক অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি দেশটির রাজনৈতিক-সামাজিক পরিমণ্ডলেও দেখা দেয় মারাত্মক অস্থিতিশীলতা। সে সময় দেশটির অর্থনৈতিক দুর্বিপাকের জন্য অনেকাংশেই দায়ী করা হয়েছে বাজারভিত্তিক ঋণকে।

দেশটির স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি শতকের শুরুর দশকের দিকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয় শ্রীলঙ্কা। এর পর শুরুতে সীমিত পর্যায়ে ঋণের বৈদেশিক উৎস হিসেবে সভরেন বন্ড ইস্যুর পদক্ষেপ নিয়েছিল দেশটি। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে দেশটির ঋণ পোর্টফোলিওতে সভরেন বন্ডের অংশ ক্রমেই বেড়েছে। ওই সময়ের পর লংকাদ্বীপের প্রায় প্রত্যেক সরকারই নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছে। উচ্চ সুদ ও তুলনামূলক কম মেয়াদে পরিশোধযোগ্য এসব ঋণ দেশটির বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যকে (ব্যালেন্স অফ পেমেন্টস) আরো ভঙ্গুর করে তুলেছে।

শ্রীলঙ্কা সরকারের ডিপার্টমেন্ট অফ এক্সটার্নাল রিসোর্সেসের ওই সময় প্রকাশিত এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটির মোট ঋণ পোর্টফোলিওর প্রায় অর্ধেকই (৪৭ শতাংশ) ছিল আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার থেকে সভরেন বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে সংগৃহীত।

চলতি শতকের শুরুর দশকের দিকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয় শ্রীলঙ্কা। এর পর শুরুতে সীমিত পর্যায়ে ঋণের বৈদেশিক উৎস হিসেবে সভরেন বন্ড ইস্যুর পদক্ষেপ নিয়েছিল দেশটি। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে দেশটির ঋণ পোর্টফোলিওতে সভরেন বন্ডের অংশ ক্রমেই বেড়েছে। ওই সময়ের পর লংকাদ্বীপের প্রায় প্রত্যেক সরকারই নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছে। উচ্চ সুদ ও তুলনামূলক কম মেয়াদে পরিশোধযোগ্য এসব ঋণ দেশটির বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যকে (ব্যালেন্স অফ পেমেন্টস) আরো ভঙ্গুর করে তুলেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী বা দাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে নেয়া ঋণের তুলনায় আন্তর্জাতিক বাজারে সভরেন বন্ড ইস্যু করে নেয়া ঋণ অনেক বেশি ব্যয়বহুল। টাকার অবমূল্যায়ন হলে বা রিজার্ভে টান পড়লে ডলারে নেয়া এসব ঋণ আমাদের ফেরত দেয়ার সক্ষমতাকে আরো চাপে ফেলে দিবে। এ কারণে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ঋণ নিতে হলে এর পরিমাণ ও সুদটাকে আমাদের সামর্থ্যের মধ্যে রাখতে হবে। ঋণ নিলে সেই ঋণের বিপরীতে আয় বাড়ানোর সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। প্রকল্প নিতে হবে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক ও বাস্তবসম্মত। দুর্নীতি, দীর্ঘসূত্রতাসহ প্রকল্প বাস্তবায়নের দুর্বলতাগুলো দূর করতে হবে।’

স্ট্রিমকে এ অর্থনীতিবিদ আরো বলেন, ‘শ্রীলঙ্কার ঘটনাটি আমাদের জন্য সতর্কবার্তা ও শিক্ষা। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ডলারে ঋণ নিয়ে দেশটি ব্যয়বহুল অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। কিন্তু সেসব প্রকল্প থেকে এ ঋণের অর্থ ফেরত দেয়ার মতো আয় তৈরি করা যায়নি। অর্থনীতির বহিস্থ ও অভ্যন্তরীণ ধাক্কাগুলো সামলানোরও কোনো প্রস্তুতি ছিল না। এর পর কভিডের সময় যখন দেশটির পর্যটন খাত থেকে আয় বন্ধ হয়ে গেল, নীতিগতভাবে কিছু ভুল পদক্ষেপ নেয়া হলো; এক পর্যায়ে দেখা গেল তারা আর ঋণের কিস্তি ফেরত দিতে না পেরে খেলাপি হয়ে পড়েছে, দেউলিয়া হয়ে পড়েছে।’

আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে কোনো দেশের সভরেন বন্ডের সুদহার (কুপন রেট বা ইল্ড) নির্ধারণ হয় সাধারণ একটি বেঞ্চমার্ক রেট এবং ওই দেশের অর্থনৈতিক ঝুঁকি বা প্রিমিয়ামের সমন্বয়ে। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীরা কোনো দেশের সরকারকে ঋণ দেয়ার আগে ন্যূনতম কাঙ্ক্ষিত মুনাফা ও ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনা করে থাকেন। এক্ষেত্রে ঝুঁকির মাত্রা যত, সুদহারও তত বেশি। বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশের ঋণমান কমিয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থাগুলো। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের ইস্যুকৃত সভরেন বন্ডের সম্ভাব্য সুদহার নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগের জায়গা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সরকারের বাজেটের আকার বাড়ছে প্রতি বছরই। এর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বাড়ছে না রাজস্ব আহরণ। ঘাটতি পূরণ করতে গিয়ে ঋণনির্ভরতা বাড়ছে সরকারের। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এক প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে বাংলাদেশে জিডিপির বিপরীতে সরকারের মোট ঋণের অনুপাত ৪১ দশমিক ৮ শতাংশ। আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছরের মধ্যেই এ হার ৪৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। আর ২০৩০-৩১ অর্থবছরে তা বেড়ে পৌঁছতে পারে ৪৮ দশমিক ৮ শতাংশে।

আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে কোনো দেশের সভরেন বন্ডের সুদহার (কুপন রেট বা ইল্ড) নির্ধারণ হয় সাধারণ একটি বেঞ্চমার্ক রেট এবং ওই দেশের অর্থনৈতিক ঝুঁকি বা প্রিমিয়ামের সমন্বয়ে। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীরা কোনো দেশের সরকারকে ঋণ দেয়ার আগে ন্যূনতম কাঙ্ক্ষিত মুনাফা ও ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনা করে থাকেন। এক্ষেত্রে ঝুঁকির মাত্রা যত সুদহারও তত বেশি। বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশের ঋণমান কমিয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থাগুলো। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের ইস্যুকৃত সভরেন বন্ডের সম্ভাব্য সুদহার নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগের জায়গা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সরকারি ভাষ্যেও এখন দূরদর্শী আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও অর্থায়ন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে আসছে। অর্থ বিভাগের মধ্যমমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতিবিবৃতি (২০২৬-২৭ থেকে ২০২৮-২৯) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিম্ন আয়ের দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বহুপক্ষীয় ও দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন অংশীদারদের কাছ থেকে নমনীয় ঋণসুবিধা (তুলনামূলক কম সুদহার ও দীর্ঘ পরিশোধকাল) ভোগ করে এসেছে। কিন্তু অর্থায়নের এ সহজ উৎস ধীরে ধীরে কমে আসবে বলে ধারনা করা হচ্ছে। এতে বাংলাদেশকে উচ্চ সুদহার ও স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক ঋণের ওপর আরো বেশি নির্ভর করতে হতে পারে। এতে ঋণ পরিশোধের ব্যয় বাড়বে। এমন প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন বিচক্ষণ আর্থিক ব্যবস্থাপনা, শক্তিশালী ঋণ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম ও একটি পরিকল্পিত ঋণ কৌশল। এর লক্ষ্য হবে পুনঃঅর্থায়ন ও বিনিময় হারের ঝুঁকি কমানো এবং একই সাথে অর্থায়নের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা। আর মধ্যম মেয়াদে ঋণের বিষয়টি মূলত কাঠামোগত ও আর্থিক সংস্কারের সফল বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে। এক্ষেত্রে প্রধান অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে রয়েছে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, স্থানীয় বন্ড বাজারকে শক্তিশালী করা, রপ্তানি বৈচিত্র্যময় করা, সরকারি বিনিয়োগে দক্ষতা উন্নয়ন এবং ঋণ ও নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে শক্তিশালী করা।

ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং বেশ কিছু ঋণের মেয়াদপূর্তি ও গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে যাওয়ায় আগামী বছরগুলোয় সরকারের ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা বাড়বে বলে মধ্যমমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতিবিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকার ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের অর্থ পরিশোধ করেছে ২৬১ কোটি ৪০ লাখ ডলার (সুদ ছাড়া)। বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তা বেড়ে ৩১৯ কোটি ৬০ লাখ ডলারে পৌঁছনোর প্রাক্কলন রয়েছে। আর ২০২৮-২৯ অর্থবছরে তা ৪২৭ কোটি ৬০ লাখ পৌঁছবে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে।

ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী স্ট্রিমকে বলেন, ‘জ্বালানি থেকে শুরু করে অর্থনীতির বড় সমস্যাগুলোর সমাধান করতে গেলে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার সংস্থান করতেই হবে। এতদিন আমরা বৈদেশিক ঋণের জন্য বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় আন্তর্জাতিক সহযোগীদের ওপর নির্ভর করেছিলাম। কিন্তু এসব ঋণ এখন আর আগের মতো সহজলভ্য নয়। সুদহারসহ সব শর্তই এখন আরো কঠিন পড়েছে। সুতরাং, অর্থায়নের জন্য সরকারকে অন্য উৎসের ব্যবহার করতেই হবে। তবে বাজারভিত্তিক ঋণের ক্ষেত্রে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে যাতে ঝুঁকিটা বেশি না হয়ে যায়।’

অর্থ মন্ত্রণালয়ের মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত হালনাগাদকৃত সর্বশেষ প্রান্তিক ঋণ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সরকারের মোট পুঞ্জীভূত ঋণে স্থানীয় উৎস থেকে নেয়া ঋণের হার ৫৭ শতাংশ। বাকি ৪৩ শতাংশ নেয়া হয়েছে বৈদেশিক উৎস থেকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একই সময় পর্যন্ত হালনাগাদকৃত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট পূঞ্জীভূত বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ১১০ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন (১১ হাজার ৯৩ কোটি) ডলারের বেশি। এর সিংহভাগই নিয়েছে সরকার, যার পরিমাণ ৯০ দশমিক ৯১ বিলিয়ন (৯ হাজার ৯১ কোটি) ডলারের বেশি। আর বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ আছে প্রায় ২০ দশমিক শূন্য ২ বিলিয়ন (প্রায় ২ হাজার ২ কোটি) ডলার।
তিনি বলেন, ‘অতীতে আমরা ঋণ নিয়ে যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছি, তার অনেকগুলোই পরে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর কারণ হলো সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত না করা ও বাস্তবায়নের দুর্বলতা। বাজারভিত্তিক ঋণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমরা এ অর্থ কতটা উৎপাদনশীল ও দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারছি। যদি সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত না করা যায়, তাহলে এটি সংকটের দিকে নিয়ে যাবে।’

অর্থ মন্ত্রণালয়ের মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত হালনাগাদকৃত সর্বশেষ প্রান্তিক ঋণ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সরকারের মোট পুঞ্জীভূত ঋণে স্থানীয় উৎস থেকে নেয়া ঋণের হার ৫৭ শতাংশ। বাকি ৪৩ শতাংশ নেয়া হয়েছে বৈদেশিক উৎস থেকে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একই সময় পর্যন্ত হালনাগাদকৃত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট পূঞ্জীভূত বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ১১০ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন (১১ হাজার ৯৩ কোটি) ডলারের বেশি। এর সিংহভাগই নিয়েছে সরকার, যার পরিমাণ ৯০ দশমিক ৯১ বিলিয়ন (৯ হাজার ৯১ কোটি) ডলারের বেশি। আর বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ আছে প্রায় ২০ দশমিক শূন্য ২ বিলিয়ন (প্রায় ২ হাজার ২ কোটি) ডলার।

সরকারের বিদেশী ঋণ নিয়ে করা মেগাপ্রকল্পগুলোর বড় একটি অংশ অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারেনি। এর কোনো কোনোটি প্রতিবছরই বিপূল পরিমাণ লোকসান দিয়ে চলছে। এসব প্রকল্পের ঋণ ও ঋণের সুদের পাশাপাশি এ লোকসানের বোঝাও বহন করতে হচ্ছে সরকারকে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নির্মিত কর্ণফুলী টানেল প্রকল্প। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) তথ্য অনুযায়ী, চীনের অর্থায়নে ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকায় নির্মিত প্রকল্পটি উদ্বোধনের পর থেকেই বড় অংকের অর্থ লোকসান দিয়ে যাচ্ছে। চালুর প্রথম বছরেই ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ১৪৭ কোটি টাকা লোকসান দেয় কর্ণফুলী টানেল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লোকসান হয়েছে প্রায় ১৮৯ কোটি টাকা। সর্বশেষ গত অর্থবছরেও (২০২৫-২৬) লোকসান দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এর চূড়ান্ত হিসাব হাতে পাওয়া যায়নি। আরেক মেগাপ্রকল্প পদ্মা সেতু রেল সংযোগ বাস্তবায়নে চীন থেকে ২৬৭ কোটি ডলার ঋণ নিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার। এটি চালু হয় ২০২৩ সালের নভেম্বরে। চালুর পর থেকে এ প্রকল্পটিও বড় অংকের লোকসান বহন করে চলেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক এ বিষয়ে স্ট্রিমকে বলেন, ‘বর্তমান প্রেক্ষাপটে অর্থায়নের উৎস বাড়ানোটা সরকারের প্রয়োজন, সেটা ঠিক। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) যে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য দেয়া হচ্ছে, সেটি তারা পূরণ করতে পারবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। আবার বাজট ঘাটতি পূরণ করার জন্য স্থানীয় উৎস থেকে অর্থায়নের সুযোগও সীমিত। সুতরাং বিদেশী উৎস থেকে সরকারের অর্থ সংগ্রহ বাড়ানোটা জরুরি। কিন্তু ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা ও ঝুঁকির বিষয়গুলোও ভালোমতো বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। আর এ ধরনের ঋণের ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের উদাহরণ-অভিজ্ঞতাও বিবেচনায় নেয়া জরুরি।’

ঋণনির্ভরতা মোকাবেলায় সরকারের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে মনযোগ দেয়া উচিত বলে মনে করছেন এ অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, ‘উচ্চব্যয়ের ও ঝুঁকিপূর্ণ অনেক প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন আছে। এগুলোসহ অগ্রাধিকারভিত্তিতে ব্যয়ের খাতগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নিতান্তই জরুরি ও প্রয়োজনীয় প্রকল্প বা খাতগুলোর ওপরে বেশি মনযোগ দিতে হবে।’

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.