Originally posted in JagoNews24 on 28 May 2026

‘নানার হাত ধরে ঈদের নামাজে যেতাম।’ একটি বাক্য। অথচ সেই বাক্যের ভেতর লুকিয়ে আছে অনেক স্মৃতি, আবেগ আর পুরো শৈশব।
ফেনী জেলার একটি ছোট্ট গ্রাম। সেখানেই কেটেছে তার শৈশবের অনেক ঈদ। ভোরের কুয়াশা ভেজা পথ, নতুন পাঞ্জাবি পরে ছোট্ট এক ছেলের নানার পাশে হাঁটা, চারপাশে ঈদের আনন্দে ভরা গ্রাম।
সেই সময়ের ঈদ তার কাছে ছিল শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়—ছিল অপেক্ষা, আবেগ, আর মানুষে মানুষে অদ্ভুত এক টান।
বলছিলাম দেশের একজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদের ছোটবেলার ঈদের স্মৃতিগাথা। তিনি বাংলাদেশের প্রথিতজশা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। অধ্যাপনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে।
ড. মোস্তাফিজুর রহমান বর্তমানে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ও থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জাগো নিউজের কাছে ছোটবেলার ঈদের স্মৃতিগাথা তুলে ধরেছেন এই অর্থনীতিবিদ।
নানার হাত ধরে ঈদের নামাজে যেতাম
‘কোরবানির ঈদ এলেই বাড়িতে গরু আনা হতো আগে থেকেই। সেই গরুকে খাওয়ানো, তার জন্য ঘাস কাটা—এসব ছিল ঈদের আনন্দেরই অংশ। শিশুমনে সেই দায়িত্বও ছিল উৎসবের মতো’, এভাবেই ছোটবেলার ঈদের স্মৃতিচারণ করছিলেন অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান।
‘এত বেশি উৎসাহ নিয়ে ঘাস কাটতাম যে গরু খেয়ে শেষ করতে পারত না’, হেসে স্মৃতিচারণ করেন তিনি।
ঈদুল আজহার নামাজ শেষে কোরবানি দেখা, তারপর বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া, আত্মীয়স্বজনদের বাসায় ঘুরে বেড়ানো—পুরো দিনটাই যেন ছিল এক অদ্ভুত উষ্ণতায় ভরা। তখন ঈদ মানেই ছিল ঘরের বাইরে বেরিয়ে পড়া। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি, এক উঠোন থেকে আরেক উঠোন।
সেই সময়ের একটি ছোট্ট স্মৃতি এখনও অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের মনে গেঁথে আছে—কোরবানির গরুর ভুঁড়ি আর ফেপসা দিয়ে তৈরি খেলনা নিয়ে খেলা। আজকের শিশুদের কাছে যা হয়তো কল্পনাও করা কঠিন, সেই সাধারণ জিনিসগুলোর মধ্যেই তখন লুকিয়ে ছিল আনন্দের বিশাল পৃথিবী।
আর ছিল ঈদি পাওয়ার আনন্দ। নতুন পাঞ্জাবি আর প্যান্ট পরে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো যেন ঈদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
কিন্তু তার স্মৃতিতে সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে আছে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের বিষয়টি।
নানার হাত ধরে ঈদের নামাজে যেতামসিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান, ছবি: সংগৃহীত
তাদের এলাকায় হিন্দু পরিবারের সংখ্যা ছিল অনেক। স্কুলের বন্ধুদের মধ্যেও ছিল বহু হিন্দু ছেলে। ঈদের দিন ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে সবাই মিলে খেলাধুলা, ঘুরে বেড়ানো, ফল পাড়া—এসবই ছিল স্বাভাবিক ঘটনা।
‘এক ধরনের সম্প্রীতি ছিল,’—নরম স্বরে বললেন অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান।
এ একটি বাক্যের মধ্যেই যেন ধরা পড়ে পুরোনো বাংলার সামাজিক সৌন্দর্য—যেখানে উৎসব মানেই ছিল সবাইকে নিয়ে আনন্দ করা।
তিনি বলেন, গ্রামের সেই জীবনটায় আত্মীয়তার সীমা ছিল অনেক বড়। শুধু রক্তের সম্পর্ক নয়, পুরো গ্রামটাই যেন ছিল আত্মীয়তার বন্ধনে বাঁধা।
‘সবাই মামা’—বলছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান।
এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে যাওয়া, খাওয়া-দাওয়া, গল্প—সব মিলিয়ে একটা কমিউনিটি অনুভূতি ছিল, যা আজকের শহুরে জীবনে অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে।
আজকের ঈদ তার কাছে অন্যরকম। এখন তিনি ঢাকায় থাকেন। গ্রামের সেই অবাধ ঘোরাঘুরি নেই, নেই সেই বিশাল কমিউনিটির উচ্ছ্বাস। তবু পরিবার এখনও তার ঈদের কেন্দ্রবিন্দু।
বর্তমানে ঢাকাকেন্দ্রিক জীবনে অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের ঈদ কাটে পরিবার ঘিরে। সকালে ৯৬ বছর বয়সী বাবার কাছে যান, তারপর তিন বোনের বাসায় ঘুরে বেড়ান। একসময় যিনি ঈদি পেতেন, এখন তিনিই ছোটদের ঈদি দেন।
‘বাবা এখনও আছেন—এটাই এখন আমার ঈদের সবচেয়ে বড় আনন্দ,’—বললেন তিনি।
কথাগুলো বলতে বলতে যেন তার কণ্ঠেও ভেসে ওঠে সময়ের দীর্ঘ পথচলার অনুভূতি।
অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, এখনকার শিশুদের আনন্দও আছে, উৎসাহও আছে, কিন্তু তার ধরন বদলে গেছে। আগে ঈদের আনন্দ ছিল বাইরে—দৌড়ঝাঁপে, মাঠে, মানুষের বাড়িতে বাড়িতে ঘুরে বেড়ানোয়। এখন সেই জায়গা অনেকটাই নিয়েছে ঘরের ভেতরের ডিজিটাল জগৎ।
‘আগে সবাই হাঁটতে হাঁটতে এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে যেত। এখন হয়তো পাশাপাশি বসে থেকেও মোবাইলে ব্যস্ত থাকে’—বললেন তিনি।
তবে এটাকে তিনি নেতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখেন না। তার মতে, সময়ের সঙ্গে সামাজিকতার ধরন বদলায়, কিন্তু অনুভূতির জায়গাটা পুরোপুরি হারিয়ে যায় না।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও বাংলাদেশ অনেক বদলেছে। তিনি বলেন, এখন ঈদের খাবার, পোশাক, আয়োজন—সবকিছুতেই এসেছে অনেক প্রাচুর্য। ছোটবেলায় যেসব জিনিস কল্পনাও করা যেত না, এখন সেগুলো সাধারণ বাস্তবতা। কিন্তু সেই সঙ্গে জীবনও হয়েছে অনেক জটিল।
‘ছোটবেলায় মানুষের চাহিদা কম ছিল। একটা সরলতা ছিল,’—বললেন তিনি।
অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের কথায়, হয়তো আজকের জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য বেড়েছে, কিন্তু শৈশবের সেই নির্ভেজাল অপেক্ষা আর আবেগকে আর ফিরিয়ে আনা যাবে না।
তারপরও তিনি আশাবাদী। তার বিশ্বাস, ঈদের মূল চেতনা—ত্যাগ, সহমর্মিতা, ভাগাভাগি আর সম্প্রীতি—এখনও টিকে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।
নতুন প্রজন্মের উদ্দেশে তার বার্তা খুবই সহজ কিন্তু গভীর। ‘ঈদ শুধু নিজের আনন্দের জন্য না। এটা সবাইকে নিয়ে আনন্দ করার সময়। এর মধ্যে ধর্মীয় দিক যেমন আছে, তেমনি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিকও আছে।’
তিনি চান, আগামী প্রজন্ম ঈদের সেই অন্তর্ভুক্তিমূলক চেতনাকে ধরে রাখুক—যেখানে মানুষ মানুষকে আপন ভাববে, আনন্দ ভাগাভাগি করবে, আর উৎসব হয়ে উঠবে সহমর্মিতার আরেক নাম।
সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলে যায়। গ্রাম বদলায়, মানুষ বদলায়, উৎসবের ধরন বদলায়। কিন্তু কিছু স্মৃতি থেকে যায় চিরকাল—নানার হাত ধরে ঈদের নামাজে যাওয়া, কোরবানির গরুর জন্য ঘাস কাটা, ঈদির অপেক্ষা, কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে গ্রামের পথে হেঁটে বেড়ানো।
সেই স্মৃতিগুলোই হয়তো আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ঈদের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য আসলে মানুষের কাছাকাছি আসার মধ্যেই।


