খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে ব্যাংক খাতে আমূল সংস্কার ও কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন: ফাহমিদা খাতুন

Originally posted in বণিক বার্তা on 3 September 2026

অনেক ছাড় দিয়েও খেলাপি ঋণ কমাতে পারছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নীতিছাড়ের কারণে কেবল ২০২৫ সালেই রেকর্ড ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে। ২০২৪ সালে পুনঃতফসিলকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৮৫ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা।

দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমাতে পুনঃতফসিলের সুযোগসহ নানামুখী নীতিসহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ সুযোগ নিয়ে গত বছর রেকর্ড ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিলও হয়েছে। সে ধারা অব্যাহত রয়েছে চলতি বছরও। এর পরও খেলাপি ঋণ কমছে না।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, কেবল চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। আর বছরের প্রথম ছয় মাসের (জানুয়ারি-জুন) হিসাবে এ বৃদ্ধির পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকায় ঠেকেছে। জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের স্থিতি ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এ নিয়ে দেশে দ্বিতীয়বারের মতো খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়াল।

এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রথমবারের মতো খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়ায়। সে সময় ব্যাংক খাতে বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮০ কোটি টাকা, যার ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ বা ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা খেলাপির খাতায় ওঠে। এরপর খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে নানামুখী নীতিসহায়তার উদ্যোগ নেয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ঋণ পুনঃতফসিল, সুদ মওকুফ করে হলেও এককালীন এক্সিট সুবিধা, বড় ঋণখেলাপিদের জন্য ১৫ বছর মেয়াদি ঋণ পুনর্গঠনের মতো নীতিসহায়তা। কিন্তু এসবের পরও খেলাপি ঋণ কমছে না।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে ব্যাংকের টাকা ফেরত না দেয়া এখন অনেকটা সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এত নীতিছাড়ের পরও খেলাপিরা ব্যাংকের অর্থ পরিশোধে এগিয়ে আসছেন না। আর ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সময়ে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে যেসব ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, তার বেশির ভাগের হদিসও মিলছে না। অস্তিত্বহীন কোম্পানির নামে বিতরণকৃত ঋণ খেলাপি হওয়ায় সেগুলো আদায়ের পথও নেই। এমন পরিস্থিতিতে নীতিছাড় নয়, বরং ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকটের স্থায়ী সমাধানের কথা বলছেন তারা।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার উদারতা খেলাপি ঋণের পরিস্থিতিকে এতটা খারাপ জায়গায় নিয়ে এসেছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক এ প্রধান অর্থনীতিবিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঋণখেলাপিদের বিষয়ে বছরের পর বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংক নমনীয়তা দেখিয়েছে। এক্ষেত্রে দেখানো উদারতা সংকটের সমাধান করেনি। বরং সংকটকে আরো ঘনীভূত করেছে। অপরাধ ও অপরাধীকে প্রশ্রয় দেয়া হয়েছে। এ কারণে খেলাপি ঋণ কমানোর উদ্যোগগুলো কাজে আসছে না।’

ড. জাহিদ হোসেন আরো বলেন, ‘কেবল ইউক্রেন যুদ্ধের কথা বলে ২০২২ সাল থেকে আমরা অনেক নীতিছাড় দিয়েছি। সেগুলোর কোনো কার্যকর ফল মেলেনি। যুদ্ধের মধ্যেও সারা দুনিয়া এগিয়ে গেছে। কিন্তু আমরা ইউক্রেন কিংবা মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের মধ্যে আটকে আছি। ব্যাংকগুলোয় ডিস্ট্রেসড অ্যাসেটও (দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ) বেশি। খেলাপি ঋণ কমাতে হলে অবশ্যই কার্যকর করপোরেট ও রেগুলেটরি গভর্ন্যান্স দরকার।’

প্রতি ত্রৈমাসিকে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের তথ্য প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিক তথা ৩১ মার্চ ব্যাংক খাতে বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকায়। এর মধ্যে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা ছিল খেলাপির খাতায়, যা ছিল বিতরণকৃত ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। তিন মাস পর গত জুন শেষে বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি দাঁড়ায় ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৩৮১ কোটি টাকায়। এর মধ্যে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকাই খেলাপির খাতায় উঠেছে। সে হিসাবে তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে খেলাপির হার দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে সরকার গঠন করে। ওই সময় দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা। টানা দেড় দশকের বেশি ক্ষমতাসীন থাকার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। ওই বছরের জুনে খেলাপি ঋণের স্থিতি দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকায়, যা ছিল বিতরণকৃত ঋণের ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশ। তবে এ চিত্র ছিল ঢেকে রাখা হিমবাহের চূড়ামাত্র।

আওয়ামী সরকারের পতনের পর দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে থাকে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণের স্থিতি রেকর্ড ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায় ঠেকে। এরপর পুনঃতফসিলের নীতিমালায় উদারীকরণসহ বিভিন্ন নীতিছাড়ের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকায় নেমে আসে। তবে চলতি বছর খেলাপি ঋণ আবারো বাড়তে শুরু করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, ২০০৯ সাল-পরবর্তী দেড় দশকে আওয়ামী সরকারের আমলে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে বিতরণকৃত ঋণ খেলাপি হওয়ার পাশাপাশি ঋণ গণনার নীতি পরিবর্তন, সুদহার বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবে খেলাপি ঋণ এতটা বেড়েছে। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে একটিতে রূপান্তরের উদ্যোগ নেয়া হয়। এ ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৮০ শতাংশই খেলাপি। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে বিতরণকৃত ঋণের প্রায় অর্ধেক খেলাপি হয়ে যাওয়ার প্রভাবও এক্ষেত্রে রয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে রয়েছেন। বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলোর দায়িত্বে থাকা এ অর্থনীতিবিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অতীতের অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে বিতরণকৃত ঋণের প্রকৃত চিত্র এখনো পুরোপুরি সামনে আসেনি। ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান যাচাই করতে আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একিউআর (অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ) অব্যাহত রয়েছে। এ কারণে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার উদ্যোগের সুফল এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়নি। এর পাশাপাশি বিরাজমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিরও বিরূপ প্রভাব ব্যাংক ঋণের ওপর পড়েছে।’

ড. ফাহমিদা খাতুন আরো বলেন, ‘খেলাপি ঋণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে ব্যাংকগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। এজন্য দরকার আমূল সংস্কার ও একীভূতকরণের মাধ্যমে শক্তিশালী ব্যাংক সৃষ্টি। বেসরকারি খাতের পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে একটি করা হয়েছে। এখন দুর্বল সরকারি ব্যাংকগুলোও একীভূত করে শক্তিশালী ব্যাংক তৈরির উদ্যোগ দরকার। বহু বছর ধরে সরকারি ব্যাংকগুলোকে জনগণের অর্থে মূলধন জোগান দেয়া হয়েছে। কিন্তু সে অর্থ কোনো কাজে আসেনি। এখন দেশের অর্থনীতির স্বার্থেই সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নীতিছাড়ের কারণে কেবল ২০২৫ সালেই রেকর্ড ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে। ২০২৪ সালে পুনঃতফসিলকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৮৫ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা। এর আগে ২০২৩ সালেও ৯১ হাজার ২২১ কোটি ও ২০২২ সালে ৬৩ হাজার ৭১৯ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছিল।

পুনঃতফসিলকৃত ঋণকে ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট বা দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ হিসেবে অভিহিত করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। বাছবিচার ছাড়াই গ্রাহকরা পুনঃতফসিলের সুযোগ পাওয়ায় প্রতি বছর এ ধরনের ঋণের স্থিতি অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। ২০২৪ সাল শেষেও পুনঃতফসিলকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। ২০২৫ সাল শেষে এ ঋণের স্থিতি ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকায় ঠেকেছে। আদায় না থাকায় পুনঃতফসিলকৃত ঋণও পরবর্তী সময়ে আবার খেলাপির খাতায় যুক্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের দেয়া নীতিসহায়তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হওয়া এবং এসব ঋণের সুদহার যোগ হওয়ায় খেলাপি ঋণ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘নীতিসহায়তা দেয়ার পর অনেক গ্রাহক ব্যাংকগুলোতে যোগাযোগ করে পুনঃতফসিলের আবেদন করেছেন। এ সুবিধা পেতে হলে ডাউন পেমেন্ট হিসেবে ঋণের একটি নির্দিষ্ট অংশ ব্যাংকে জমা দিতে হবে। অনেক গ্রাহক টাকা জোগাড় করতে পারেননি, সেজন্য সংখ্যাটা বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া খেলাপীকৃত এসব ঋণের সুদহার যোগ হওয়ায়ও মোট খেলাপির পরিমাণ আবারো ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।’

আরিফ হোসেন খান জানান, খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ১৮ মাসের একটি রোডম্যাপ গ্রহণ করেছে। রোডম্যাপ অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এরই মধ্যে কিছু প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। রোডম্যাপ বাস্তবায়ন হলে খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে।

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.