Originally posted in Citizens’ Voice on 19 August 2026
গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাস পার করেছে। একটি দেশের অর্থনীতি যখন চারপাশের নানামুখী চাপে পিষ্ট হতে থাকে, তখন নতুন সরকারের জন্য কাজ শুরু করা কতটা কঠিন, তা সহজেই অনুমেয়। ঠিক এমন একটি প্রেক্ষাপটেই এই সরকার ক্ষমতায় আসে, যখন চারদিকে ছিল লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায়ের কঙ্কালসার অবস্থা, ব্যাংকিং খাতের অস্থিতিশীলতা, বেসরকারি বিনিয়োগে মন্দা এবং জ্বালানি খাতের তীব্র সংকট। এর আগে জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যাংকিং খাত ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) কিছু সংস্কারের চেষ্টা করলেও তাদের রাজনৈতিক ভিত্তির অভাব ছিল। তবে একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা থাকে ভিন্ন এবং দীর্ঘদিনের মন্দা কাটিয়ে অর্থনৈতিক গতি ফেরানোর জন্য তাদের হাতে রয়েছে রাজনৈতিক বৈধতা। এই অবস্থায় দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণ থেকে সরকারের প্রথম ছয় মাসের অর্থনৈতিক খতিয়ান স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যেখানে কিছু আশার আলোর পাশাপাশি বেশ কিছু গভীর উদ্বেগের চিত্রও ফুটে উঠেছে।
অর্থনীতির সবচেয়ে বড় স্বস্তির জায়গাটি তৈরি হয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে, যা দীর্ঘদিন ধরে আমাদের ভাবিয়ে তুলছিল। পরিসংখ্যান বলছে, প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স বৃদ্ধির ওপর ভর করে দেশের রিজার্ভে দৃশ্যমান গতি এসেছে। গত বছরের জুলাইয়ের শেষে যা ছিল ২০.৪৯ বিলিয়ন ডলার, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩০.০৬ বিলিয়ন ডলারে এবং ১২ আগস্ট নাগাদ তা আরও উন্নীত হয়ে ৩২.২৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। রেমিট্যান্সের এই জোয়ার কেবল রিজার্ভ বাড়ায়নি, বরং সামগ্রিক বৈদেশিক মুদ্রা বাজারকে একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। এর পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে সরকার তাদের নির্বাচনী অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি দ্রুত চালু করেছে। এই প্রকল্পের আওতায় দরিদ্র পরিবারের নারীদের প্রতি মাসে দুই হাজার পাঁচশো টাকা করে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা মূলত দারিদ্র্য বিমোচন ও নারী ক্ষমতায়নকে একসাথে তরান্বিত করবে। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র তিন মাসের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করা এবং সেখানে রপ্তানি বৈচিত্র্যায়ন ও শিল্প প্রসারের জন্য বিভিন্ন কর ছাড়ের প্রস্তাব করাও সরকারের অন্যতম একটি দ্রুত ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ।
তবে মুদ্রার অপর পিঠটি কিন্তু বেশ উদ্বেগজনক, আর তা হলো সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রধান মাথাব্যথা অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি। গত চার বছর ধরে টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের পকেটের অবস্থা সংকটাপন্ন। পরিসংখ্যানের খাতায় হয়তো দেখা যাচ্ছে মূল্যস্ফীতির হার ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ১১.৭ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৯.১৩ শতাংশ এবং জুলাইয়ে তা আরও কিছুটা কমে ৮.৩২ শতাংশে নেমেছে। কিন্তু সাধারণ ক্রেতার জন্য বাজারে এই সামান্য পতনের প্রভাব খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। অর্থনীতির সোজা নিয়ম হলো, মূল্যস্ফীতির হার কমা মানে কিন্তু পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়, বরং দাম বাড়ার গতি কিছুটা ধীর হওয়া। ফলে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল বা শাকসবজির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে গিয়ে সাধারণ মানুষ যখন আগের মতোই চড়া দাম দেখছেন, তখন এই পরিসংখ্যান তাদের কোনো স্বস্তি দিতে পারছে না। অন্যদিকে, জাতীয় মজুরি সূচকের হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম থাকায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর বাস্তব ক্রয়ক্ষমতা দিন দিন আরও সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
এই ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের মূল কারণগুলোর গভীরে গেলে দেখা যায়, বাজারে পর্যাপ্ত নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না এবং এর পেছনে মূল খলনায়ক হলো ব্যক্তিগত বিনিয়োগের স্থবিরতা। বিগত অর্থবছরে দেশের জিডিপির মাত্র ২১.৫৩ শতাংশ এসেছে বেসরকারি বিনিয়োগ থেকে, যা একটি উদীয়মান অর্থনীতির জন্য মোটেও পর্যাপ্ত নয়। যদিও নতুন সরকার বাজেটে বিনিয়োগবান্ধব নানা ব্যবস্থার ঘোষণা দিয়েছে এবং আগামী দিনগুলোতে এই হার আরও বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে ছয় মাস পার হয়ে গেলেও তার কোনো দৃশ্যমান প্রভাব এখনো ব্যবসায়ে প্রতিফলিত হয়নি। বিনিয়োগকারীরা কেবল সুযোগ-সুবিধাই চান না, তারা দেখতে চান নীতির স্থায়িত্ব এবং সার্বিক স্থিতিশীলতা। উপরন্তু, দেশের রাজস্ব আদায়ের অবস্থা এতটাই দুর্বল যে কর-জিডিপি অনুপাত এখনো ৭ শতাংশের নিচে রয়ে গেছে। ডিজিটালাইজেশন, কর ফাঁকি রোধ এবং অন্যায্য কর ছাড় বন্ধ করার মতো কঠোর পদক্ষেপ ছাড়া এই বিপুল রাজস্ব ঘাটতি মেটানো প্রায় অসম্ভব একটি কাজ।
একই সাথে দেশের শিল্প উৎপাদন ও সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি খাতের ক্রান্তিকাল। ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার মতো বাহ্যিক কারণ যেমন রয়েছে, তেমনি অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে বিগত সরকারের সময়কার ভুল নীতি ও অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। বর্তমানে দেশের অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস বসে থাকলেও সরকার বাৎসরিক বিপুল অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ বা কেন্দ্র ভাড়া মেটাতে বাধ্য হচ্ছে, যা রাজকোষের ওপর এক বিশাল চাপ। এই অবস্থায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট কাটিয়ে ওঠাই নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। স্বল্পমেয়াদে যেমন জরুরি জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো এবং টেকসই জ্বালানি কৌশল তৈরি করার কোনো বিকল্প নেই।
তবে সবচেয়ে গভীর ক্ষতটি রয়ে গেছে দেশের ব্যাংকিং খাতে, যেখানে বছরের পর বছর জমে থাকা খেলাপি ঋণের বোঝা পুরো আর্থিক ব্যবস্থাকে অচল করে দেওয়ার উপক্রম করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫.৫৭ লাখ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩০.৬ শতাংশ। এর বাইরে আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে আটকে থাকা ঋণের পরিমাণও এক লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকার বেশি। সরকার অবশ্য দায়িত্ব নিয়েই ‘ব্যাংক রেজুলেশন আইন ২০২৬’ ও ‘ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স আইন ২০২৬’ পাসের মতো কিছু জরুরি ও সাহসী আইনি সংস্কার সম্পন্ন করেছে। তবে শুধু আইন পাস করলেই সমস্যা রাতারাতি মিটে যায় না; দুর্বল ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণ করা, পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছার বাস্তব প্রয়োগ ঘটাতে হবে।
দিনশেষে বলা যায়, গত জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকারের রাজনৈতিক বৈধতা শতভাগ নিশ্চিত হলেও, অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিকে পুরোপুরি পুনরুজ্জীবিত করতে তাদের আরও পথ হাঁটতে হবে। শুধু ভালো নীতি ঘোষণা করলেই বিনিয়োগ আসে না, তার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা, দীর্ঘমেয়াদী প্রশাসনিক সংস্কার এবং আইনি কাঠামোর স্বচ্ছতা। প্রথম ছয় মাসে কিছু ইতিবাচক প্রাথমিক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও মূল কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো এখনো বিদ্যমান। পরবর্তী ছয় মাসে সরকার কীভাবে এই ব্যাংকিং ও জ্বালানি খাতের সংকট সামাল দেয় এবং মূল্যস্ফীতি কমিয়ে এনে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটায়, তার ওপরই নির্ভর করবে এ দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ।


