জ্বালানি নিরাপত্তায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি: মোস্তাফিজুর রহমান

Originally posted in প্রতিদিনের বাংলাদেশ on 21 August 2026

গ্যাস সংকট সমাধানে কার্গোর জন্য প্রতীক্ষা

দেশের চলমান গ্যাস সংকট থেকে উত্তরণের কার্যক্রম ও পদক্ষেপ সম্পর্কে সার্বক্ষণিক খোঁজ রাখছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সংকট উত্তরণের জন্য সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিচ্ছেন তিনি। এরই অংশ হিসেবে গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব জিয়াউল হককে ডেকে নিয়ে পুরো পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি নানা নির্দেশনাও দেন বলে জানা গেছে।

এদিকে আগামী রবিবারের আগে গ্যাস পরিস্থিতির ক্ষেত্রে অগ্রগতি ঘটার সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছে পেট্রোবাংলা। তাদের বক্তব্য, গতকাল একটি কার্গো এসেছে, যেটি সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) সঙ্গে যুক্ত হবে। আগামী রবিবার আরেকটি কার্গো আসার পর সেটি এক্সিলারেটের টার্মিনালের সঙ্গে যুক্ত হলেই গ্যাস সরবরাহ বাড়বে এবং পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হবে।

জ্বালানি তথা গ্যাস সংকটের বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গতকাল সকাল সাড়ে ১০টা থেকে প্রায় তিন ঘণ্টা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ সময় তিনি পরিস্থিতির অবনতির কারণ, গৃহীত পদক্ষেপ ও সেসবের কার্যকারিতা সম্পর্কে খোঁজ নেন। সংকট সমাধানে সামগ্রিক প্রচেষ্টা চালানোর পরামর্শ দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদকে এলএনজি ক্রয়সহ জ্বালানি বিভাগের কার্যক্রম নিয়মিত জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জ্বালানি বিভাগের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা জানান, সামগ্রিক বিষয় নিয়ে দিনে দুয়েকবার করে প্রধানমন্ত্রী বা তার টিমকে আপডেট জানাতে হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি নিতে হচ্ছে।

রবিবারের আগে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে না

টানা ২৫ দিনের তীব্র গ্যাস সংকটের পর গত শনিবার সামিটের টার্মিনাল পুরোদমে এবং এক্সিলারেটের টার্মিনাল আংশিক চালু হলে সরবরাহ কিছুটা বাড়ে। তবে চাহিদা অনুযায়ী সময়মতো কার্গো না আসায় গত বুধবার বেলা ৩টায় এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। গতকাল আসা কার্গোটি সামিটের টার্মিনালের সঙ্গে যুক্ত হবে। আর রবিবার আরেকটি কার্গো আসার পর এক্সিলারেটের টার্মিনালের সঙ্গে যুক্ত হলেই পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হবে।

আসেনি সরাসরি ক্রয়নীতির আওতায় কেনা কার্গো

আরপিজিসিএল সূত্র বলছে, নিয়মিত প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে কম দামে এলএনজি কিনতে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে বেশকিছু কার্গোর ক্রয়াদেশ দেওয়া হয়। এ মাসেই তার চারটি আসার কথা। কিন্তু এখনও সেগুলোর একটিও আসেনি। এই কার্গোগুলো না আসায় সংকট আরও বেড়েছে। টার্মিনাল তৈরি থাকলেও এলএনজি সরবরাহ করা যাচ্ছে না।

প্রতি ইউনিট ২৩.৯৩ মার্কিন ডলার দরে এক কার্গো অনুমোদন

দেশের গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রতি ইউনিট ২৩.৯৩ মার্কিন ডলার দরে এক কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কেনার অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। কমিটির বৈঠকে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের এক কার্গো এলএনজি আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর পিটিই লিমিটেড আগামী ১ থেকে ২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এই এলএনজি সরবরাহ করবে। প্রতি এমএমবিটিইউ (মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট) এলএনজির দাম ধরা হয়েছে ২৩.৯৩ মার্কিন ডলার। এটি ২০২৬ সালের ৪৪তম কার্গো।

স্থানীয় উৎসেও উৎপাদন কমছে

এলএনজি সংকটের পাশাপাশি ভাবিয়ে তুলেছে স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন হ্রাস। বিশেষ করে দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাস ফিল্ড বিবিয়ানার উৎপাদন কমে যাওয়াকে উদ্বেগের বলে মনে করছেন পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা। দেশে উৎপাদনে থাকা সবচেয়ে বড় গ্যাস ফিল্ড বিবিয়ানা থেকে ধারাবাহিকভাবে ফিল্ডটি থেকে গ্যাসের উৎপাদন কমছে। অন্য কোনো গ্যাসফিল্ড থেকে বড় আকারে জোগান বাড়ছে না। তাই বিবিয়ানার উৎপাদন হ্রাস দেশের সামগ্রিক গ্যাস সরবরাহে বড় প্রভাব ফেলছে। কারণ এ ফিল্ড স্থানীয় গ্যাসের ৪৫ শতাংশ জোগান দিচ্ছে। পেট্রোবাংলার তথ্য-উপাত্ত থেকে জানা গেছে, বিবিয়ানা ফিল্ডের বর্তমান উৎপাদন দৈনিক ৭৪০ মিলিয়ন ঘনফুট, যা চলতি বছরের মার্চেও ছিল ৮২০ মিলিয়ন ঘনফুটের কিছু বেশি। এপ্রিলের অর্ধেক সময়জুড়ে উৎপাদন ৮০৫-৮১০ মিলিয়ন ঘনফুটের মধ্যে নেমে যায়। গত সাড়ে পাঁচ মাসের ব্যবধানে ফিল্ডটির উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে ৮০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো।

বেড়েছে লোডশেডিং

এদিকে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার কারণে গ্যাস সরবরাহ আরও কমে গেছে। এর ফলে প্রতি ঘণ্টায়ই বেড়েছে লোডশেডিং। রাজধানী ঢাকাতেও লোডশেডিং করা হচ্ছে বিভিন্ন এলাকা ভাগ করে। গতকালও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সন্ধ্যার পর একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। গ্রামাঞ্চলের পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে লোডশেডিংয়ে ভোগান্তি বেড়েছে মানুষের। গতকাল বেলা ৩টায় সারা দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬১০৩ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে উৎপাদন ছিল ১৪৩২৯ মেগাওয়াট। এই সময় সারা দেশে লোডশেডিং দেখায় ১৭৭৪ মেগাওয়াট।

গ্যাস সংকটে স্থবির কারখানা

সারা দেশে তীব্র গ্যাস সংকটে বিপাকে পড়েছে শিল্পকারখানা। এ সংকটের প্রভাব পড়েছে নরসিংদীর শিল্পোৎপাদনেও। টানা গ্যাস সরবরাহে ঘাটতির কারণে জেলার গ্যাসনির্ভর কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও পুরোপুরি বন্ধ আছে কারখানা, কোথাও আবার কাঁচামাল পড়ে আছে অব্যবহৃত অবস্থায়। কাজ না থাকায় শ্রমিকরা অলস সময় কাটাচ্ছেন; কেউ কেউ কারখানার যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণে ব্যস্ত। নরসিংদীর সাটিরপাড়া, চৌয়ালা ও ঘোড়াদিয়া এলাকার কয়েকটি কারখানায় এমন চিত্র দেখা যায়।

এদিকে তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে ময়মনসিংহের ভালুকা শিল্পাঞ্চলের ২০টি কারখানার উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হওয়ায় শ্রমিকদের ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়েছে। গতকাল বিকালে শিল্প পুলিশ-৫-এর পুলিশ সুপার মো. আনছার উদ্দিন বলেন, ‘সকাল থেকে গ্যাস সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। গ্যাসের অভাবের মধ্যে শ্রমিকরা কারখানায় আসেন। তাই ২০টি কারখানার শ্রমিকদের দুপুরের খাবারের সময় পর্যন্ত ধাপে ধাপে ছুটি দিতে হয়েছে। বাকি কারখানাগুলোতেও উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।’ শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভালুকা পৌর এলাকা, তিতাস কার্যালয়ের আশপাশের কারখানাগুলোতে গ্যাসের কিছুটা চাপ থাকলেও দূরবর্তী কারখানাগুলোতে একেবারে নেই।

স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘জ্বালানির এই তীব্র সংকট বর্তমান সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। কারণ, বহুদিন বাপেক্স কাজ করেনি। অফশোর, অনশোর, নিয়ারশোর ড্রিলিং করা হয়নি। ড্রিলিং করতে আন্তর্জাতিক বিডিংয়ে কোনো কোম্পানি অংশ নেয়নি। এবার অবশ্য কিছু কিছু কোম্পানি এসেছে। এ অগ্রগতিকে ভালোভাবে কাজে লাগাতে হবেÑ যাতে নিজস্ব তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে সাফল্য পাওয়া যায়।’

তিনি বলেন, ‘জ্বালানি নিরাপত্তা না থাকলে দেশের অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব গভীর হবে। ভোক্তা থেকে শুরু করে আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, উৎপাদক সবাই এই পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত। তাই সরকারকে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিতে হবে। স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থা সব সময়ই ব্যয়বহুল হয়। সেজন্য মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদের কথা ভাবতে হবে। প্রয়োজনে ভারত ও নেপাল থেকে আরও বেশি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ আনার ব্যবস্থা করতে হবে।’

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.