শুধু ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগের মধ্যে নেই আমরা, ক্রমেই ডেমোগ্রাফিক চ্যালেঞ্জের দিকেও এগোচ্ছি

Originally posted in বণিকবার্তা on 20 August 2026

ড. ফাহমিদা খাতুন, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক। তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক এবং ব্র্যাকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত ‘সমতাভিত্তিক ও টেকসই উন্নয়নের জন্য অর্থনীতির পুনঃকৌশল নির্ধারণ এবং সম্পদ সংগ্রহবিষয়ক টাস্কফোর্স’ এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে (বিবিএস) শক্তিশালী করার জন্য গঠিত টাস্কফোর্সের সদস্য ছিলেন। বিএনপি সরকারের ছয় মাসের পারফরম্যান্স প্রসঙ্গে কথা বলেছেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রথম নির্বাচিত সরকারের ছয় মাস পেরিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে এ সময়ের কার্যক্রমের একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ করা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে নতুন সরকার কোন কোন জায়গায় সাফল্য দেখাতে পেরেছে বলে মনে করেন?

ছয় মাস এমন কোনো সময় নয় যে এর মধ্যেই একটি সরকারের সব কার্যক্রমের চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা সম্ভব। আবার এটাও ঠিক যে ছয় মাসে কিছুটা বোঝা যায়—সরকার কোন পথে হাঁটছে, নির্বাচনী ইশতাহারে যেসব অঙ্গীকার করেছিল এবং নির্বাচনের পর যেসব পরিকল্পনার কথা বলেছে, সেগুলো বাস্তবায়নে কতটা উদ্যোগ নিয়েছে। উদ্যোগ নিলে সেগুলো সঠিক পথে এগোচ্ছে নাকি ভুল পথে যাচ্ছে সেটিও বিবেচনা করা যায়। এক্ষেত্রে প্রথমেই কয়েকটি ইতিবাচক দিকের কথা বলতে চাই। যদিও ইতিবাচক দিকের সংখ্যা খুব বেশি নয়।

সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে যে অর্থনীতি পেয়েছে, সেটি ছিল অত্যন্ত ভঙ্গুর। সরকারও বারবার সেটি বলছে এবং আমরাও বলছি। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ছিল দুর্বল, কয়েক বছর ধরেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি ছিল, ব্যাংক খাতে বড় ধরনের দুর্বলতা ছিল, জ্বালানি সংকট ছিল, বিনিয়োগের অভাব ছিল, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছিল না এবং রাজস্ব আহরণেও বড় ধরনের ঘাটতি ছিল। সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে কোনো স্বস্তির জায়গা ছিল না। এ সমস্যাগুলো দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হয়েছে এবং রাতারাতি এগুলোর সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য দুটি বিষয় প্রয়োজন। একটি হলো সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার। আরেকটি হলো গভীর সংস্কার। সংস্কার ছাড়া এসব সমস্যার টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।

সরকারের ছয় মাসের প্রথম ইতিবাচক দিক হলো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ধারাবাহিক বৃদ্ধি। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের পর থেকেই আমরা রিজার্ভের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে পাই। এর আগে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের একটি বড় অংশ হুন্ডির মাধ্যমে দেশে আসত। ফলে সেটি আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে আসত না এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও যুক্ত হতো না। পরবর্তী সময়ে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়তে শুরু করে। ওই অর্থবছরে জুলাইয়ের শেষে রিজার্ভ ছিল প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের মতো। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে সেটি ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। বর্তমানে এটি প্রায় ৩২-৩৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এটি অবশ্যই স্বস্তির জায়গা।

দ্বিতীয় ইতিবাচক দিক হলো সরকার নির্বাচনী ইশতাহারে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার মধ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বাস্তবায়নের উদ্যোগ দ্রুত শুরু করেছে। এর মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারকে মাসে আড়াই হাজার টাকা দেয়ার কথা রয়েছে এবং সেই অর্থ পরিবারের নারীরা পাবেন। নারীর ক্ষমতায়নের দিক থেকেও এটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ফ্যামিলি কার্ডের অর্থ কীভাবে বিতরণ করা হবে, সেখানে সুশাসন কীভাবে নিশ্চিত করা হবে এবং দুর্নীতি বা অনিয়ম কীভাবে ঠেকানো হবে—এসব বিষয় ভবিষ্যতে দেখতে হবে। উদ্যোগটি ইতিবাচক; কিন্তু বাস্তবায়নের মানের ওপর এর সাফল্য নির্ভর করবে।

তৃতীয় ইতিবাচক দিক হলো বাজেট প্রণয়ন। সরকার ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেয়ার পর জুনেই পরবর্তী অর্থবছরের বাজেট দিয়েছে। এটিকে আমি একটি ভালো অর্জন হিসেবে দেখব। কারণ বাজেট প্রস্তুতির প্রক্রিয়া সাধারণত ডিসেম্বর থেকেই শুরু হয়ে যায় এবং এর জন্য অনেক আগে থেকেই বিভিন্ন প্রস্তুতি নেয়া হয়। এ সরকার সেই প্রস্তুতি প্রক্রিয়ার সঙ্গে ছিল না। দায়িত্ব নেয়ার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যে তাদের একটি বাজেট তৈরি করতে হয়েছে। সেই কারণে এক্ষেত্রে সরকারকে সাধুবাদ দিতে হয়। বাজেটের লক্ষ্য ও ধরন দেখলেও বোঝা যায়, সরকার এটিকে বিনিয়োগবান্ধব, কর্মসংস্থানমুখী এবং রফতানিনির্ভর করার চেষ্টা করেছে। করনীতিতে কিছু ছাড় দেয়া হয়েছে, যাতে রফতানিমুখী শিল্প উৎসাহিত হয় এবং বিনিয়োগ আকর্ষণ করা যায়।

চতুর্থ বিষয়টি হলো বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের কথা রয়েছে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীরা এ উত্তরণ কিছুটা পিছিয়ে দেয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। তাদের যুক্তি ছিল, বাংলাদেশ এখনো এর জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয় এবং উত্তরণের জন্য আরো অনেক প্রস্তুতির প্রয়োজন। অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে প্রথমে কিছুটা আগ্রহ দেখালেও শেষ পর্যন্ত উদ্যোগ নেয়নি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর দ্রুত একটি আবেদন করেছে, যাতে এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেয়া হয়। কারণ দেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সমস্যার পাশাপাশি কভিড-১৯ মহামারী, বৈশ্বিক যুদ্ধ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংকট বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। ফলে প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজন রয়েছে বলে সরকার মনে করছে।

আরেকটি ইতিবাচক বিষয় হলো জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি কমেছে। জুনে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং জুলাইয়ে তা কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছে। এটি নিঃসন্দেহে স্বস্তির বিষয়। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা আছে। মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ কিন্তু পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়। এর অর্থ হলো, আগের তুলনায় দাম যে হারে বাড়ছিল, সেই হার কমেছে। কিন্তু সামগ্রিক মূল্যস্তর এরই মধ্যে অনেক ওপরে উঠে গেছে এবং সেখান থেকেই দাম বাড়ছে। অন্যদিকে মানুষের আয়ও সেই অনুপাতে বাড়েনি। দীর্ঘদিন ধরেই মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির নিচে রয়েছে।

বিগত সময়ের জঞ্জাল দূর করতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বেশ কয়েকটি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছিল। আপনি নিজেও বেশকিছু সংস্কার কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আপনার মতে কোন সংস্কারগুলো সবচেয়ে জরুরি ছিল এবং কোন সংস্কারগুলো হয়নি, যে কারণে নির্বাচিত সরকার নানা সমস্যায় পড়ছে?

বেশ কয়েকটি খাতেই সংস্কার প্রয়োজন এবং প্রায় প্রতিটি খাতই কোনো না কোনোভাবে দুর্বল। তবে অর্থনীতির মূল প্রাণকেন্দ্র হিসেবে কয়েকটি খাতকে আলাদা করে দেখতে হবে। এগুলো ছাড়া অর্থনীতি চলবে না। প্রথমেই আমি জ্বালানি খাতের কথা বলব। অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হচ্ছে জ্বালানি। কারখানা, বাসাবাড়ি, যানবাহন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই জ্বালানি প্রয়োজন। জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে কার্যত অর্থনীতিও বন্ধ হয়ে যাবে। জ্বালানি খাতে এখন কয়েকটি স্তরে নীতি নিতে হবে। স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি—এ তিন সময়সীমা মাথায় রেখে কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। স্বল্পমেয়াদে নতুন করে রাতারাতি বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব নয়। তাই প্রথম কাজ হতে পারে জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানো এবং অপচয় কমানো। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চালন থেকে শুরু করে অফিস-আদালত, কারখানা ও বাসাবাড়ি—বিভিন্ন জায়গায় জ্বালানির অপচয় হচ্ছে। দক্ষতা বাড়িয়ে এ অপচয় কমানো গেলে জাতীয় গ্রিডে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ যুক্ত করা সম্ভব। জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা অনেকদিন ধরেই এ কথা বলে আসছেন।

দ্বিতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যেতে হবে। এক্ষেত্রেও খুব দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে বাংলাদেশ অনেক দিন ধরেই কাজ করছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ৩০ শতাংশে উন্নীত করার মতো লক্ষ্যও রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে মোট জ্বালানি সরবরাহে সৌর ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎসের অংশ মাত্র ৩-৪ শতাংশের মতো। ফলে এখানে আমরা প্রয়োজনীয় গতিশীলতা দেখছি না। এ জায়গায় আরো দ্রুত উদ্যোগ নেয়া দরকার।

তৃতীয়ত, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে দ্রুত যেতে হবে। কূপ খননের জন্য দরপত্র আহ্বান, চুক্তি করা, বিনিয়োগ আহ্বান—এসব উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। কারণ গ্যাস অনুসন্ধান অত্যন্ত মূলধননির্ভর ও সময়সাপেক্ষ। কিন্তু সেই কাজটিও যথেষ্ট গতিতে হয়নি। এর ফলে এখন বিষয়টি আরো জটিল হয়েছে। দীর্ঘদিনের নীতিগত অবহেলার সঙ্গে নতুন কিছু বহিরাগত ঝুঁকিও যুক্ত হয়েছে। জিওপলিটিক্যাল টেনশন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল দেশ হিসেবে আমরা বড় ঝুঁকির মুখে পড়েছি। বিশেষ করে বাংলাদেশ যেহেতু প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর এবং এলএনজির উৎসও যথেষ্ট বৈচিত্র্যময় নয়, তাই মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা আমাদের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। একটা পর্যায়ে আমরা প্রায় সংকটের কিনারায় চলে গিয়েছিলাম। পরে পরিস্থিতি সামাল দেয়া গেছে। কিন্তু এখানে দীর্ঘদিনের যে নীতিগত অবহেলা ছিল, সেটিও আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। আমি বলব, এ অবহেলা পুরোপুরি অনিচ্ছাকৃত ছিল না। এর সঙ্গে রাজনৈতিক অর্থনীতির একটি বিষয় জড়িত। বিশেষ কিছু গোষ্ঠীকে উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানির সুযোগ দেয়া হয়েছে, যেখানে বাজারে খুব বেশি খেলোয়াড়ও ছিল না—এক-দুজনের মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ ছিল। ফলে কারা লাভবান হয়েছে এবং কেন এমন নীতি নেয়া হয়েছিল, সেটি রাজনৈতিক অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে। এ জায়গাটি বর্তমান সরকারকে সামাল দিতেই হবে।

দীর্ঘমেয়াদে আমাদের মাটির নিচে এবং সমুদ্রের যে গ্যাসসম্পদ রয়েছে, সেগুলোর অনুসন্ধান ও উত্তোলন করতে হবে। এগুলো শুরু করলেও জাতীয় গ্রিডে গ্যাস আসতে ১০-১৫ বছর বা তারও বেশি সময় লেগে যেতে পারে। কিন্তু তাই বলে শুরু না করার কোনো সুযোগ নেই। এখনই কাজ শুরু করতে হবে। আগামী ১০ বছরের জন্য দেশের জ্বালানি কৌশল কী হবে, তার একটি সুস্পষ্ট স্ট্র্যাটেজি বর্তমান সরকারকে তৈরি করতে হবে।

ব্যাংক ও আর্থিক খাত দীর্ঘদিন ধরেই ভঙ্গুর। এ খাত মেরামতে বিএনপি সরকারের উদ্যোগ কি যথেষ্ট মনে করেন?

অর্থনীতির লাইফলাইন হচ্ছে ব্যাংক খাত। এ খাতেও আমরা দীর্ঘদিনের দুর্বলতা দেখেছি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ব্যাংক খাতে সংস্কারের কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি হলো ব্যাংক রেজল্যুশন আইন। এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন বা রিস্ট্রাকচার করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। সব ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্য এক নয়। তাই কোন ব্যাংকের সম্পদের মান কেমন, অর্থাৎ অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ করা, প্রয়োজন হলে ব্যাংক একীভূত করা এবং কোনো ব্যাংক বন্ধ করার প্রয়োজন হলে সেই ব্যবস্থাও নেয়ার সক্ষমতা তৈরি করা—এসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

ডিপোজিটরদের সুরক্ষার ক্ষেত্রেও পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। কোনো ব্যাংক বন্ধ হয়ে গেলে আমানতকারীরা কত টাকা ফেরত পাবেন, সেই ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্সের সীমা আগে ১ লাখ টাকা ছিল, সেটি বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে। আমানতকারীদের আস্থা ফেরানোর জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া অর্থ ও চুরি যাওয়া সম্পদ উদ্ধারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। খেলাপি ঋণসহ যেসব অর্থ দেশের বাইরে চলে গেছে, সেগুলো ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াও চলছে। এসব উদ্যোগ এখনো চলমান এবং এগুলোকে আরো গতিশীল করতে হবে। এর পাশাপাশি ক্যাশলেস লেনদেনের দিকে যাওয়ার উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা কিউআরের মতো ব্যবস্থার মাধ্যমে নগদ অর্থের ব্যবহার কমানো গেলে লেনদেন আরো স্বচ্ছ হবে। এর ফলে অর্থনীতিতে লেনদেনের হিসাবের বাইরে থাকার সুযোগ কমবে এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ও বাড়তে পারে। কারণ নগদ লেনদেন যত বেশি হয়, লেনদেন গোপন করার এবং কর ফাঁকি দেয়ার সুযোগও তত বাড়ে।

তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ খাত হলো রাজস্ব, বিশেষত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সরকারের অভ্যন্তরীণ অর্থায়নের প্রধান উৎস হচ্ছে কর রাজস্ব। কিন্তু আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত অত্যন্ত কম। ২০২৫ সালে এটি কমতে কমতে ৬ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে। এদিকে ১৮ কোটির বেশি মানুষের দেশে সরকারের উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের চাহিদা অনেক বেশি। এসবের অর্থায়ন কোথা থেকে হবে? মূল অর্থ আসতে হবে অভ্যন্তরীণ উৎস, বিশেষ করে এনবিআরের রাজস্ব থেকে। কিন্তু এনবিআর সেই সক্ষমতা তৈরি করতে পারছে না। প্রায় প্রতি বছরই এনবিআরকে বড় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়, কিন্তু গত ১০-১২ বছরে তারা কোনো অর্থবছরে সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি। এর দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, অনেক সময় বাস্তবতা ও সক্ষমতা বিবেচনা না করেই এনবিআরকে বড় লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়। দ্বিতীয়ত, এনবিআরের নিজস্ব সক্ষমতারও ঘাটতি রয়েছে। এখানে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, জনবলের দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে।

এর পাশাপাশি নীতিগত সংস্কারও জরুরি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কর প্রশাসনে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল—কর নীতি প্রণয়ন ও কর আদায়ের কার্যক্রম আলাদা করার। কারণ একই প্রতিষ্ঠান যখন করনীতি তৈরি করে এবং সেই নীতি বাস্তবায়ন করে কর আদায় করে, তখন এক ধরনের স্বার্থের সংঘাত বা কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট তৈরি হতে পারে। যারা করনীতি তৈরি করবেন, তারা যদি কর আদায়ও করেন, তাহলে কর ফাঁকির মতো বিষয় মোকাবেলার ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সুযোগ থাকে। তাই নীতি প্রণয়ন এবং কর আদায়ের দায়িত্ব আলাদা করার উদ্যোগটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে তখন এ উদ্যোগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়েছিল এবং সেটিকে পুরোপুরি কার্যকর বা অপারেশনালাইজ করা সম্ভব হয়নি। বর্তমান সরকার আবার সেটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এটিও গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার।

তাই অর্থনীতির মূল কাঠামোর ক্ষেত্রে আমি তিনটি খাতকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলব—জ্বালানি, ব্যাংকিং ও রাজস্ব। এ তিন ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং কিছু কাজ এগিয়েছেও। তবে জ্বালানি খাতে আরো দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ জ্বালানি সংকট সরাসরি অর্থনীতির প্রতিটি খাতকে প্রভাবিত করে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজ এখনই শুরু করা জরুরি।

রফতানির ক্ষেত্রে আমরা একক পণ্যের ওপর বেশি নির্ভরশীল এবং রফতানি গন্তব্যও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে সীমিত। অন্য রফতানি পণ্যের দিকে আমরা সেভাবে মনোযোগ দিইনি। অন্যদিকে নতুন সরকারের লক্ষ্য এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি। নিশ্চয় একটি খাত দিয়ে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব নয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে আরএমজি খাতের বাইরে কোন কোন খাতকে সরকারের অগ্রাধিকার দেয়া উচিত?

এখানে তিনটি বিষয় আলাদাভাবে দেখতে হবে—রফতানির বহুমুখীকরণ, অর্থনীতির বহুমুখীকরণ ও বাজারের বহুমুখীকরণ। তিনটিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ক্ষেত্রে রফতানির ওপর অনেক বেশি নির্ভরতা রয়েছে। ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে তৈরি পোশাক শিল্প আমাদের অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা রেখে আসছে। কিন্তু এত বছর পরও রফতানির ক্ষেত্রে এটিই প্রধান এবং কার্যত একক পণ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে কোনো ধরনের বড় ধাক্কা এলে বা আমাদের প্রধান বাজারগুলোতে চাহিদা কমে গেলে আমরা বিকল্প উৎস থেকে কীভাবে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করব—সেটি বড় প্রশ্ন। রফতানি বহুমুখীকরণের কথা অনেকদিন ধরেই বলা হচ্ছে। প্রতিটি সরকারই এটি নিয়ে কথা বলেছে, বিভিন্ন সভা-সেমিনারেও আলোচনা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে আমরা খুব বেশি পরিবর্তন দেখতে পাইনি। এমন নয় যে আমাদের সম্ভাবনাময় পণ্য নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, সেই পণ্যগুলোর সম্ভাবনাকে আমরা কেন কাজে লাগাতে পারছি না।

লেদার ও লেদার গুডসের ক্ষেত্রেও সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সেখানে শুধু পণ্যের বৈচিত্র্য নয়, বাজারেরও বৈচিত্র্য প্রয়োজন। পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণ করতে না পারা, বিশেষ করে যথাযথ ইটিপি না থাকা আমাদের বড় একটি সমস্যা। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে এসব মৌলিক সক্ষমতা তৈরি করতেই হবে। বাংলাদেশের একটি প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হচ্ছে আমাদের মানবসম্পদের ব্যয় তুলনামূলক কম। আমি অবশ্য এটিকে ‘সস্তা শ্রম’ হিসেবে দেখতে চাই না। কিন্তু যেহেতু বাংলাদেশের জীবনযাত্রার ব্যয় উন্নত দেশগুলোর তুলনায় কম, তাই তুলনামূলকভাবে আমাদের শ্রমশক্তির ব্যয়ের একটি প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা রয়েছে। এ সুবিধাকে আমরা আরো দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগাতে পারিনি।

লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংসহ আরো অনেক নতুন খাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এসব খাত চিহ্নিত করে তাদের জন্য নীতি সহায়তা, প্রযুক্তি, অর্থায়ন, দক্ষ মানবসম্পদ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করতে হবে। তবে শুধু পণ্যের বহুমুখীকরণ করলেই হবে না।

আমাদের সেবা খাতকেও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি বড় উৎস হিসেবে দেখতে হবে। এখানে বাজারের বৈচিত্র্যও প্রয়োজন। আমাদের প্রচলিত শ্রমবাজারের বাইরে উন্নত দেশগুলোকেও গুরুত্ব দিতে হবে। জাপানে কর্মী পাঠানোর জন্য ভাষা শিক্ষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণের যে উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, সেটি এক্ষেত্রে একটি উদাহরণ। উন্নত অনেক দেশে এখন জনসংখ্যাগত পরিবর্তন ঘটছে। বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমছে। তাদের দেখাশোনার জন্য মানবসম্পদের প্রয়োজন তৈরি হচ্ছে। প্রযুক্তি ও রোবট অনেক কাজ করছে, কিন্তু মানুষের যত্ন, মানবিক স্পর্শ ও আবেগের জায়গা পুরোপুরি প্রযুক্তি দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। ফলে কেয়ারগিভিংসহ বিভিন্ন সেবা খাতে বাংলাদেশী দক্ষ জনশক্তির সুযোগ তৈরি হতে পারে। আমাদের এ সম্ভাবনাগুলোও দেখতে হবে। এর পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির বহুমুখীকরণও জরুরি। বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় ৫১ শতাংশ আসে সেবা খাত থেকে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কী ধরনের সেবা খাত তৈরি করছি? শুধু ছোট ছোট ব্যবসা বা অনানুষ্ঠানিক সেবা কার্যক্রমের মাধ্যমে বড় পরিসরে কর্মসংস্থান ও আয় বাড়ানো সম্ভব নয়।

ফার্মাসিউটিক্যালস তার একটি ভালো উদাহরণ। এটি বাংলাদেশের একটি উদীয়মান শিল্প এবং উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে ওষুধ উৎপাদনে বাংলাদেশের সক্ষমতা বেশ ভালো। আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো মানসম্মত ওষুধ উৎপাদন করতে পারে। এখন কেউ বলতে পারেন, ইউরোপের মতো উন্নত বাজারে বাংলাদেশের ওষুধের প্রবেশ কঠিন। সেটি ঠিক। কিন্তু ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকাই তো আমাদের একমাত্র বাজার নয়। আফ্রিকার দেশগুলোসহ অনেক উন্নয়নশীল দেশের বিশাল ওষুধের বাজার রয়েছে। বিশেষ করে এইচআইভি-এইডসসহ বিভিন্ন জীবনরক্ষাকারী ওষুধ তারা উন্নত দেশ থেকে অনেক বেশি দামে কিনে থাকে। বাংলাদেশের সেই ওষুধগুলো উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। আমরা সেসব বাজারে প্রবেশের চেষ্টা করতে পারি। আমাদের মতো আরো অনেক উন্নয়নশীল দেশের বাজারেও বাংলাদেশী ওষুধের সুযোগ রয়েছে।

বড় ও উচ্চমূল্য সংযোজনকারী সেবা খাতগুলোকে বিকশিত করতে হবে। যেমন আর্থিক খাত, বীমা, পর্যটন, ভ্রমণ ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সেবা খাত। এসব খাত আরো উন্নত করা গেলে একদিকে অর্থনীতির বহুমুখীকরণ হবে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান ও আয় দুটোই বাড়বে। এখন সরকার সৃজনশীল অর্থনীতি বা ক্রিয়েটিভ ইকোনমির কথাও বলছে। যারা শিল্পচর্চা করেন, খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত, ছবি আঁকেন, মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত, গান করেন—এ ধরনের সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের যথাযথ সহায়তা দিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আরো বেশি যুক্ত করা যায়। এর মাধ্যমে তাদের কাছ থেকে আরো বেশি অর্থনৈতিক মূল্য বা রিটার্ন পাওয়া সম্ভব। এটিও অর্থনীতির বহুমুখীকরণের একটি উদাহরণ হতে পারে।

তাই আমাদের আসলে একটি সামগ্রিক বহুমুখীকরণ কৌশল প্রয়োজন। শুধু আরএমজির বিকল্প হিসেবে একটি নতুন পণ্য খুঁজলেই হবে না। পণ্য, সেবা, শ্রমশক্তি এবং রফতানি বাজার—সব ক্ষেত্রেই বৈচিত্র্য আনতে হবে। এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে এ বহুমুখীকরণই সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

বাংলাদেশের একটি প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হচ্ছে আমাদের মানবসম্পদের ব্যয় তুলনামূলক কম। আমি অবশ্য এটিকে ‘সস্তা শ্রম’ হিসেবে দেখতে চাই না। কিন্তু যেহেতু বাংলাদেশের জীবনযাত্রার ব্যয় উন্নত দেশগুলোর তুলনায় কম, তাই তুলনামূলকভাবে আমাদের শ্রমশক্তির ব্যয়ের একটি প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা রয়েছে। এ সুবিধাকে আমরা আরো দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগাতে পারিনি।

নিম্ন দক্ষতার শ্রমিক পাঠিয়ে আমরা যে রেমিট্যান্স পাই, দক্ষতা বৃদ্ধি ও নতুন শ্রম বাজার অনুসন্ধানের মাধ্যমে তা বহুগুণ বাড়াতে পারি। এক্ষেত্রে নতুন সরকারের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত?

বর্তমানে বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশী শ্রমিকদের বড় একটি অংশই নিম্নদক্ষতার বা লো-স্কিলড শ্রমশক্তি। আমরা যদি আরো বেশি দক্ষ বা হাই-স্কিলড শ্রমশক্তি তৈরি করে বিদেশে পাঠাতে পারি, তাহলে একই সংখ্যক মানুষের কাছ থেকে অনেক বেশি আয় করা সম্ভব।

রেমিট্যান্স তার একটি উদাহরণ। আমরা রেমিট্যান্সের পরিমাণ বাড়ানোর কথা বলি, কিন্তু এর মধ্যেও বৈচিত্র্য আনার সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশী শ্রমিকদের বড় একটি অংশই নিম্নদক্ষতার বা লো-স্কিলড শ্রমশক্তি। আমরা যদি আরো বেশি দক্ষ বা হাই-স্কিলড শ্রমশক্তি তৈরি করে বিদেশে পাঠাতে পারি, তাহলে একই সংখ্যক মানুষের কাছ থেকে অনেক বেশি আয় করা সম্ভব। ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা ও ফিলিপাইনের দিকে তাকালে দেখতে পাই, তারা অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সমপরিমাণ বা তার চেয়ে কম জনশক্তি বিদেশে পাঠিয়েও বেশি রেমিট্যান্স আয় করছে। এর অন্যতম কারণ তাদের শ্রমশক্তির দক্ষতা তুলনামূলক বেশি। ফলে আমাদের জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা এবং তাদের আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে পাঠানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা বারবার জনসম্পদ ও ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের কথা বলি। নতুন যুগের প্রয়োজন মেটাতে আমাদের শিক্ষা খাতকে কোন দিকে নেয়া উচিত; কোন কোন খাতের জন্য প্রশিক্ষিত মানবসম্পদ তৈরি করা প্রয়োজন, যেহেতু আমাদের মানবসম্পদই অর্থনীতির বড় সম্পদ?

আমরা যত পরিকল্পনাই করি না কেন, সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য যদি দক্ষ জনশক্তি না থাকে, তাহলে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। সবচেয়ে বড় শঙ্কা হচ্ছে, আমাদের তরুণ জনশক্তি যেভাবে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ পাচ্ছে, তাতে তাদের শিক্ষার মূল্য দিন দিন কমে যাচ্ছে। তারা সার্টিফিকেট অর্জন করছে, অনেক সময় সেই সার্টিফিকেটের জন্য অর্থ ও সময় ব্যয় করছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই শিক্ষাকে বাস্তবে কাজে লাগিয়ে নিজেদের অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারছে না। ফলে তারা যেমন নিজেরা উপকৃত হচ্ছে না, তেমনি দেশের অর্থনীতিতেও প্রত্যাশিত অবদান রাখতে পারছে না। তাই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থাকে বাজারমুখী বা কর্মসংস্থানমুখী করতে হবে। বাজারে কী ধরনের দক্ষতার চাহিদা রয়েছে, সেটি বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষার বিষয় ও প্রশিক্ষণের কাঠামো তৈরি করতে হবে।

এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—বাজারের চাহিদা স্থির নয়। ১০ বছর আগে একটি প্রতিষ্ঠানের যে ধরনের দক্ষতার প্রয়োজন ছিল, এখন হয়তো সেই দক্ষতার চাহিদা নেই। প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কাজের ধরন ও প্রয়োজনীয় দক্ষতাও পরিবর্তিত হচ্ছে। উন্নত দেশগুলো এবং আমাদের কিছু প্রতিবেশী দেশেও মানুষ নিয়মিত নিজেদের দক্ষতা বাড়াচ্ছে। তারা সার্টিফিকেট কোর্স করছে, নতুন প্রযুক্তি শিখছে এবং নিজেদের কর্মদক্ষতা আপডেট করছে।

এখন আমরা চারদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে কথা বলছি। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এআইয়ের ব্যবহার শুরু হয়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করে বের হওয়া একজন তরুণ যদি নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত না হয় এবং নিজের দক্ষতা আপডেট না করে, তাহলে তার শিক্ষার কার্যকারিতা কতটা থাকবে—সেটি বড় প্রশ্ন। তাই শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতার মধ্যে সরাসরি সংযোগ থাকে। এক্ষেত্রে ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার সংযোগের কথা অনেকদিন ধরেই বলা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোও বলে থাকে যে তাদের মধ্যে আলোচনা হয়। কিন্তু শুধু আলোচনা বা সাধারণ কোনো সভা-সেমিনারের মধ্যে এটি সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না।

কোন শিল্পে কী ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন, আগামী পাঁচ বা দশ বছরে কী ধরনের দক্ষতার চাহিদা তৈরি হবে, সেই নির্দিষ্ট চাহিদাগুলো চিহ্নিত করে শিক্ষাক্রম ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার মধ্যে একটি কংক্রিট ও প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রত্যেকের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট বা ডিগ্রি অর্জন করাই যে একমাত্র পথ—এ ধারণা থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে। অনেক দেশেই উচ্চমাধ্যমিক বা দ্বাদশ শ্রেণী শেষ করার পর অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে না গিয়ে ভোকেশনাল ট্রেনিং, কারিগরি শিক্ষা বা বিশেষায়িত দক্ষতা অর্জনের দিকে যায়। দুই বছরের মতো স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা নির্দিষ্ট পেশায় প্রবেশ করে কর্মজীবন শুরু করতে পারে।

বাংলাদেশেও এ ধরনের দক্ষতাভিত্তিক ও ভোকেশনাল প্রশিক্ষণের সুযোগ আরো বাড়াতে হবে। একজন তরুণকে চার-পাঁচ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেই হবে—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে কে কোন ধরনের কাজে দক্ষ হতে চায়, তার ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন পথ তৈরি করতে হবে। তখনই আমাদের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বাস্তবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে। কারণ আমরা এখন শুধু ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগের মধ্যে নেই, ধীরে ধীরে ডেমোগ্রাফিক চ্যালেঞ্জের দিকেও এগোচ্ছি। তরুণ জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করে তারা নিজেরা উপকৃত হবে এবং দেশের অর্থনীতিও উপকৃত হবে—তখনই এ জনসংখ্যা আমাদের জন্য ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডে পরিণত হবে।

শিক্ষা খাতে আমরা প্রায়ই বলি, বাজেটে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। অবশ্যই বরাদ্দ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না। মূল বিষয় হচ্ছে শিক্ষার গুণগত মান এবং সেই শিক্ষা শেষ করার পর একজন তরুণ কী করতে পারছে।

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.