Originally posted in জাতীয় অর্থনীতি on 2 September 2026

বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের প্রধান গন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমলেও বেড়েছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। গত অর্থবছরে (জুলাই’২৫-জুন’২৬) মধ্যপ্রাচ্যে কর্মী যাওয়ার হার আগের অর্থবছরের তুলনায় কমেছে ১১ দশমিক ৭ শতাংশ। একই সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বিশ্লেষণে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
ইউরোপের কয়েকটি দেশ থেকে রেমিট্যান্স আসার হারেও দেখা গেছে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি। ২০২৫-২৬ অর্থবছর যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশে এসেছে ৫০৭ কোটি ২০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৬০ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। ইতালি থেকে রেমিট্যান্স বেড়েছে ২৪ দশমিক ১ শতাংশ। তবে বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স— দুই ক্ষেত্রেই মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্ব এখনও বেশি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছে সৌদি আরব থেকে।
বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৯ লাখ ৮৫ হাজার কর্মী বিভিন্ন দেশে গেছেন। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় গেছেন প্রায় ৭ লাখ ৮৫ হাজার জন। হিসাব অনুযায়ী, ৭ লাখ ৮৫ হাজার কর্মী ৯ লাখ ৮৫ হাজারের প্রায় ৭৯ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় ৮০ শতাংশই গেছে মধ্যপ্রাচ্যে।
এর আগের অর্থবছর মধ্যপ্রাচ্যে গিয়েছিলেন প্রায় ৮ লাখ ৮৯ হাজার বাংলাদেশি। ফলে বছরের ব্যবধানে এ অঞ্চলে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমেছে প্রায় ১ লাখ ৪ হাজার বা প্রায় ১১ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যে কর্মী যাওয়ার প্রবাহ কমলেও বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের চার-পঞ্চমাংশ এখনও এ অঞ্চলনির্ভর।
ইউরোপের চিত্র এর বিপরীত। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রায় ২০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী গিয়েছিলেন। পরের এক বছরে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৯ হাজারে। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে ইউরোপে গেছেন ১৯ হাজার বা ৯৫ শতাংশ বেশি কর্মী। এ সময়ে ইউরোপে যাওয়া কর্মীদের মধ্যে নারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৮৫০।
ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কর্মী গেছেন ইতালিতে ১১ হাজার ৪১৭ জন। এরপর পর্তুগালে ৬ হাজার ৩৭০, রাশিয়ায় ৪ হাজার ৭৩৫, সার্বিয়ায় ৪ হাজার ৩৬৯, সাইপ্রাসে ৩ হাজার ৯২৮, বেলারুশে ১ হাজার ৭৬৭, উত্তর মেসিডোনিয়ায় ১ হাজার ৩৮৮, পোল্যান্ডে ৮৬৭ এবং রোমানিয়ায় ১৫৮ জন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছর দেশে রেমিট্যান্স এসেছে মোট ৩ হাজার ৫৫৮ কোটি ৯৪ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছর ছিল ৩ হাজার ৩২ কোটি ২৮ লাখ ডলার। দুই অর্থবছরের ব্যবধান ৫২৬ কোটি ৬৬ লাখ ডলার বা প্রায় ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেমিট্যান্সের সবচেয়ে বড় উৎস ছিল সৌদি আরব। দেশটি থেকে এসেছে ৫৮৪ কোটি ৯১ লাখ ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৭ দশমিক ২ শতাংশ বেশি।
দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা যুক্তরাজ্য থেকে এসেছে ৫০৭ কোটি ২০ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরে দেশটি থেকে এসেছিল ৩১৬ কোটি ৮৬ লাখ ডলার। অর্থাৎ বেড়েছে ১৯০ কোটি ৩৪ লাখ ডলার বা প্রায় ৬০ দশমিক ১ শতাংশ।
ইতালি থেকে এসেছে ২০৫ কোটি ১৫ লাখ ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২৪ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। এছাড়া সিঙ্গাপুর থেকে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৫২ দশমিক ৪ শতাংশ, কাতার থেকে ২৯ দশমিক ৩ শতাংশ, ওমান থেকে ২৫ দশমিক ৩ শতাংশ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ১০ শতাংশ।
তবে বাংলাদেশের অন্যতম বড় রেমিট্যান্সের উৎস যুক্তরাষ্ট্রে চিত্রটি ছিল ভিন্ন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটি থেকে এসেছে ৩০১ কোটি ৩১ লাখ ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৬ দশমিক ৩ শতাংশ কম।
নতুন শ্রমবাজারের সম্ভাবনা
বৈদেশিক কর্মসংস্থানে মধ্যপ্রাচ্যের আধিপত্য এখনও স্পষ্ট। গত এক বছরে বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশি কর্মীদের প্রায় ৮০ শতাংশই গেছেন এ অঞ্চলের দেশগুলোতে। তবে আগের বছরের তুলনায় কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমে আসায় নতুন শ্রমবাজার খোঁজার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
অন্যদিকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা বাড়ছে। নতুন কর্মসংস্থানের গন্তব্য হিসেবে ইউরোপের বাজার বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করছে। তবে ইউরোপে নতুন কর্মী যাওয়ার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে রেমিট্যান্স বৃদ্ধিকে সরাসরি একই কারণের ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ কোনো দেশের রেমিট্যান্স শুধু ওই সময়ে যাওয়া নতুন কর্মীদের কাছ থেকে আসে না; সেখানে আগে থেকে থাকা প্রবাসীরাও রেমিট্যান্স পাঠান।
দক্ষ কর্মী পাঠানো বড় চ্যালেঞ্জ
ইউরোপের শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে শুধু কর্মীর সংখ্যা বাড়ানো যথেষ্ট নয়। কারিগরি দক্ষতা, ভাষাজ্ঞান, পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সনদ গুরুত্বপূর্ণ। তাই ইউরোপের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, বৈধ অভিবাসনের পথ সহজ করা এবং আরও বেশি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় শ্রমবাজার চুক্তি করা প্রয়োজন।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি কর্মী যাওয়ার সংখ্যা ১১ শতাংশ কমা এবং ইউরোপে প্রায় দ্বিগুণ হওয়া শ্রমবাজারে বৈচিত্র্য আসার ইতিবাচক ইঙ্গিত। মধ্যপ্রাচ্যে মজুরি তুলনামূলক কম, কর্মপরিবেশ অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল। অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকিও রয়েছে। ইউরোপের বাজার সম্প্রসারিত হলে দক্ষ কর্মীদের উচ্চ মজুরি, উন্নত কর্মপরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ বাড়বে। তবে সংখ্যার দিক দিয়ে ইউরোপ এখনও মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প হয়ে ওঠেনি।
তিনি আরও বলেন, এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে ইউরোপের চাহিদা অনুযায়ী ভাষা, কারিগরি দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি, আতিথেয়তা ও বয়স্কদের পরিচর্যার মতো খাতে বিশেষভাবে কর্মী প্রস্তুত করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে সরকারকে নতুন দ্বিপক্ষীয় চুক্তি, দক্ষতার স্বীকৃতি এবং বৈধ অভিবাসনপথ সম্প্রসারণে উদ্যোগী হতে হবে। নিয়োগে উচ্চব্যয়, দালাল নির্ভরতা ও প্রতারণা নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি। তবে মধ্যপ্রাচ্যের বাজার ধরে রাখার পাশাপাশি ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলে পরিকল্পিতভাবে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ করতে হবে।


