পরিবর্তিত শ্রমবাজারের সঙ্গে নীতি তাল মেলাতে পারবে?

Originally posted in দৈনিক সমকাল on 13 July 2026

বিগত কয়েক দশকে শ্রমনির্ভর উৎপাদন শিল্পের ওপর ভিত্তি করেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উত্থান ঘটেছে। বিশেষত তৈরি পোশাকশিল্প দেশের রপ্তানি, প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু যে উন্নয়ন মডেল এত দিন সাফল্যের ভিত্তি ছিল; প্রযুক্তির অগ্রগতিতে তা এখন বড় রূপান্তরের মুখে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অটোমেশন এবং বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থার রূপান্তর কাজের ধরন দ্রুত পাল্টে দিচ্ছে। এর প্রভাব শুধু ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে সীমাবদ্ধ নয়। উচ্চমূল্য সংযোজনকারী সেবা খাত যেমন– ডিজিটাল অর্থনীতি এবং প্ল্যাটফর্মভিত্তিক খাতেও বিস্তৃত। এ পরিস্থিতিতে বেশি ঝুঁকিতে তরুণ, নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা। কারণ তাদের বড় অংশ এখনও অনানুষ্ঠানিক, অনিরাপদ এবং প্রযুক্তি দিয়ে প্রতিস্থাপনযোগ্য কাজে নিয়োজিত। একটি হিসাবে, এআই ও অটোমেশনের কারণে বাংলাদেশের প্রায় ৪০ শতাংশ চাকরিচ্যুত হতে পারে। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) মর্যাদা থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাও তীব্রতর হবে। প্রশ্ন হলো, দেশের শ্রমবাজার ও নীতিকাঠামো কি এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে প্রস্তুত?

ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের ঝুঁকি

প্রযুক্তিগত রূপান্তর গোটা বিশ্বের শ্রমবাজারেই প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। কারণ এখানে শ্রমবাজারের ভিত্তি এখনও দুর্বল। ম্যানুফ্যাকচারিং খাত সম্প্রসারিত হলেও একই হারে কর্মসংস্থান বাড়ছে না। অন্যদিকে উচ্চমূল্য সংযোজনকারী ডিজিটাল সেবা খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও এর বেশির ভাগ কর্মসংস্থান অনিরাপদ ও সামাজিক সুরক্ষাবিহীন।

এই সীমাবদ্ধতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থায়। শিক্ষা এখনও শ্রমবাজারের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা পদ্ধতি অনেক ক্ষেত্রেই বর্তমান শিল্পের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং সামাজিকভাবে কম আকর্ষণীয়। ফলে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।

অটোমেশন ও ডিজিটাল রূপান্তরের প্রভাব ইতোমধ্যে ম্যানুফ্যাকচারিং ও সেবা খাতে দৃশ্যমান।

গবেষণা অনুযায়ী ২০৪১ সাল নাগাদ তৈরি পোশাকশিল্পে কর্মরত নারীর প্রায় ৬০ শতাংশ প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়বে অনানুষ্ঠানিক, কম দক্ষ এবং সহজে প্রতিস্থাপনযোগ্য কাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা।

তৈরি পোশাকশিল্পের নারী শ্রমিক, উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে প্রবেশের জন্য সংগ্রামরত তরুণ এবং অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাই এর বড় শিকার হবে। ২০২৪ সালের হিসাবেই দেশে প্রায় ১৩ লাখ কর্মসংস্থান কমেছে, যার প্রায় ৯০ শতাংশই নারী। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি না থাকলে প্রযুক্তিগত রূপান্তর বিদ্যমান বৈষম্যকে আরও গভীর করবে।

তাল মেলাতে না পারা নীতি

ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, দক্ষতা উন্নয়ন কিংবা ডিজিটাল অর্থনীতি নিয়ে গত এক দশকে নানা নীতি, কৌশল ও পরিকল্পনা হলেও বাস্তব পরিবর্তনে রূপ নেওয়ার গতি এখনও ধীর। এই ঘাটতি সবচেয়ে স্পষ্ট বাস্তবায়নে। শিল্পভিত্তিক রূপান্তর কৌশল, শ্রমিকদের পুনঃদক্ষতা কর্মসূচি এবং ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারের প্রস্তুতি এখনও বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে উচ্চশিক্ষা, মূলধারার শিক্ষা থেকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ– কোনো ক্ষেত্রেই এআই, অটোমেশন ও ডিজিটালাইজেশনের চাহিদা পর্যাপ্তভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। প্ল্যাটফর্মভিত্তিক ও ডিজিটাল খাত দ্রুত বিস্তৃত হলেও এর জন্য এখনও কার্যকর নীতিগত কাঠামো গড়ে ওঠেনি।
মূল সংকট নীতির অভাবে নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতিতে। অগণিত পরিকল্পনা ও সমন্বয় কাঠামো বিদ্যমান থাকলেও খুব কম ক্ষেত্রেই নীতির মনিটরিং ও মূল্যায়নের ধারাবাহিকতা দেখা যায়। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির দুর্বলতাই বারবার সংস্কারের সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

পরিবর্তনের সূচনা হোক এখনই

বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে এখন প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। আমাদের গবেষণার ভিত্তিতে কয়েকটি অগ্রাধিকার বিশেষভাবে সামনে আসে।

শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থার সংস্কার

কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকে শিল্পের চাহিদাভিত্তিক ও ফলাফলনির্ভর ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে হবে। নিয়োগকর্তাদের অংশগ্রহণে পাঠ্যক্রম প্রণয়ন, শিক্ষানবিশ বাড়ানো এবং নতুন শিল্প ও বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে প্রশিক্ষণের সামঞ্জস্য নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জাতীয় শিক্ষানীতি ও জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি এমনভাবে হালনাগাদ করতে হবে, যাতে ডিজিটাল ও ভবিষ্যৎমুখী দক্ষতা উন্নয়ন অগ্রাধিকার পায়। পাশাপাশি সম্প্রতি অনুমোদিত বাংলাদেশ ন্যাশনাল কোয়ালিফিকেশনস ফ্রেমওয়ার্কের কার্যকর বাস্তবায়ন করতে হবে।

পুনঃদক্ষতার সুযোগ নিশ্চিত করা

কর্মজীবনের শুরু থেকে মাঝ পর্যন্ত দক্ষতা হালনাগাদ এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের পুনঃদক্ষতা ও পুনর্বাসনে পৃথক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য শ্রমিকদের জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং জাতীয় কর্মসংস্থান নীতিতে পুনঃদক্ষতা ও শ্রমিক পুনর্বিন্যাসের সুস্পষ্ট ব্যবস্থা যুক্ত করা প্রয়োজন।

শিল্প সহায়তা ও কর্মসংস্থানের সংযোগ

শিল্প প্রণোদনা, ঋণ সুবিধা, রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল এবং অন্যান্য রপ্তানি সহায়তাকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দক্ষতা উন্নয়নের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে সিএসআরকে দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হবে। স্কুলশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষায় সরকারি বিনিয়োগ ধাপে ধাপে বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যমান সম্পদের পুনর্বিন্যাস করে ভবিষ্যৎ চাহিদাসম্পন্ন দক্ষতায় অগ্রাধিকার দিতে হবে। দক্ষতার চাহিদা, কর্মসংস্থানের প্রবণতা, শূন্য পদ ও খাতভিত্তিক পরিবর্তনের তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করে তা শিক্ষা, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা-প্রশিক্ষণ, শিল্পনীতি, রপ্তানি কৌশল ও বিনিয়োগ পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

শ্রমবাজারের উপযোগী সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা প্ল্যাটফর্ম ও গিগ অর্থনীতির জন্য শ্রমিকের আইনি অবস্থান, প্ল্যাটফর্মের দায়িত্ব এবং বিরোধ নিষ্পত্তির কাঠামো নির্ধারণের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, দুর্ঘটনা সুরক্ষা, পেনশন ও আয়-নিরাপত্তাকে স্থানান্তরযোগ্য সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে। জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলে এই পরিবর্তন প্রতিফলিত হতে হবে। নারী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক পুনঃদক্ষতা, কর্মসংস্থান সহায়তা, সহজ প্রবেশ্য অবকাঠামো, সহায়ক প্রযুক্তি এবং উপযুক্ত প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন বিদ্যমান বৈষম্য আরও না বাড়ায়।

শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়

এআই, অটোমেশন ও ডিজিটালাইজেশনের বাস্তবতায় শিল্প, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও সামাজিক সুরক্ষা নীতিকে সমন্বিত ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান কাঠামোর অধীনে আনতে হবে। জবাবদিহির জন্য একটি কর্মসংস্থান পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।

শ্রমবাজার এখন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে প্রযুক্তি, জনমিতি লভ্যতা, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জলবায়ু পরিবর্তন কাজের ধরন দ্রুত বদলে দিচ্ছে; অন্যদিকে সেই পরিবর্তনের জন্য নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি এখনও পিছিয়ে। এই ব্যবধান যত দীর্ঘ হবে, তত বাড়বে কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা ও বৈষম্য।

পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সময়ও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। এ জন্য শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, শিল্পনীতি, সামাজিক সুরক্ষা ও শ্রমবাজারকে সমন্বিত কাঠামোর আওতায় এনে বাস্তবায়ন করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং জাতীয় পর্যায়ের ন্যূনতম ঐকমত্য।

আশার কথা, বর্তমান সরকার নির্বাচনী ইশতেহার এবং পরবর্তী বিভিন্ন বক্তব্যে এআই, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এবং কারিগরি শিক্ষা সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছে। তবে এই স্বীকৃতি এখনও শিল্প খাতভিত্তিক রূপান্তর কৌশল, শ্রমিকদের পুনঃদক্ষতা কর্মসূচি কিংবা ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারের প্রস্তুতির সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত হয়নি। সরকার আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরি করতে চায়। সেই কর্মসংস্থান কেমন হবে– প্রশ্নটা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

প্রযুক্তি অপেক্ষা করবে না। আমাদের সামনে বড় প্রশ্ন– কত দ্রুত নিজেদের প্রস্তুত করতে পারব। বর্তমান সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে ট্রিলিয়ন ডলারে নিতে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চাইছে। কিন্তু এ লক্ষ্য তখনই অর্থবহ হবে, যদি তা সবার জন্য উৎপাদনশীল, মর্যাদাপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারে।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, তৌফিকুল ইসলাম খান, মমতাজুল জান্নাত, মালিহা রহমান: সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) যথাক্রমে সম্মাননীয় ফেলো, অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা), জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী, প্রোগ্রাম সহযোগী

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.