পুনরুদ্ধার ও প্রবৃদ্ধির চ্যালেঞ্জে অর্থনীতি – ড. ফাহমিদা খাতুন

Originally posted in কালের কন্ঠ on 4 September 2026

বর্তমান অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও প্রবৃদ্ধির দ্বৈত চ্যালেঞ্জ কিভাবে মোকাবেলা করছে? জ্বালানিসংকট কতটা বাধাগ্রস্ত করছে অর্থনীতির চক্র? পে স্কেল সরকারি ও বেসরকারি খাতে আয় বৈষম্য উসকে দেবে কি না—এসব বিষয়ে কালের কণ্ঠের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ফারুক মেহেদী

প্রশ্ন: নতুন অর্থবছর, নতুন সরকার কেমন চলছে অর্থনীতি?

ড. ফাহমিদা খাতুন: নতুন সরকার এমন একসময় দায়িত্ব নিয়েছে, যখন অর্থনীতি একই সঙ্গে স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার ও প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার দ্বৈত চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। ইতিবাচক দিক হলো—প্রবাস আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা উন্নতি হয়েছে, বিনিময় হার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল এবং মূল্যস্ফীতিও আগের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কিছুটা নেমেছে।

তবে এগুলোকে এখনই পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার বলা যাবে না।

মূল্যস্ফীতি এখনো সাধারণ মানুষের সহনীয় পর্যায়ে আসেনি। তবে কমার গতিতে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ পণ্যের দাম কমা নয়, দাম বৃদ্ধির গতি কমা।

কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির ফলে পরিবারগুলোর যে ক্রয়ক্ষমতা ক্ষয় হয়েছে, তা এখনো পুনরুদ্ধার হয়নি। একই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল, ব্যক্তি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি ঐতিহাসিকভাবে নিম্ন পর্যায়ে এবং রাজস্ব আদায় কাঙ্ক্ষিত মাত্রার অনেক নিচে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ঘাটতি শিল্পোৎপাদন ও ব্যবসার ব্যয় বাড়াচ্ছে।
অতএব, বর্তমান পরিস্থিতিকে আমি বলব, কয়েকটি সূচকে স্বস্তি ফিরলেও অর্থনীতির ভিত এখনো নাজুক।

জনপ্রত্যাশাকে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও মানুষের জীবনযাত্রায় দৃশ্যমান উন্নতিতে রূপ দিতে হলে দ্রুত, সমন্বিত ও বিশ্বাসযোগ্য পদক্ষেপ প্রয়োজন।

প্রশ্ন: এ সময়ের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

ড. ফাহমিদা খাতুন: এই মুহূর্তে মূল সমস্যা হলো—সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান পুনরুজ্জীবিত করা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কঠোর মুদ্রানীতি প্রয়োজন, কিন্তু উচ্চ সুদের হার বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহকে দুর্বল করতে পারে। আবার সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে অর্থনীতিকে সচল করার চেষ্টা করলে রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংকঋণ ও মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে। এই ভারসাম্য রক্ষা করাই বড় পরীক্ষা।

এর সঙ্গে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা সরাসরি যুক্ত। আরেকটি মৌলিক চ্যালেঞ্জ হচ্ছে রাজস্ব আহরণ। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত অত্যন্ত কম। ফলে সরকারকে বেতন, ভর্তুকি, সুদ, সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়ন—সব খাতের চাহিদা সীমিত সম্পদের মধ্যে মেটাতে হচ্ছে।

প্রশ্ন : বাজেট ঘোষণার পর পে স্কেল দেওয়া হলো; অর্থের যুক্তিসংগত উৎস পরিষ্কার নয়। আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

ড. ফাহমিদা খাতুন: প্রায় ১১-১২ বছর সরকারি কর্মচারীদের বেতনকাঠামো সমন্বয় না হওয়ায়, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির পর বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর যৌক্তিকতা রয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয়সহ নানা কারণে নীতিগতভাবে বেতন সমন্বয়কে অযৌক্তিক বলা যাবে না।

তবে উদ্বেগের জায়গা হলো—অর্থের উৎস। নতুন বেতনকাঠামো সম্পূর্ণ বাস্তবায়নে প্রায় এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে, বাজেটের কোন খাত থেকে কত অর্থ আসবে, পুনর্বিন্যাসের পর কোন কর্মসূচি ক্ষতিগ্রস্ত হবে—এসবের পূর্ণাঙ্গ হিসাব জনসমক্ষে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। পে স্কেল শুধু এক বছরের ব্যয় নয়। এটি সরকারের পুনরাবৃত্ত ও দীর্ঘমেয়াদি দায়। তাই অনুমোদনের আগে একটি মধ্যমেয়াদি রাজস্ব কাঠামো, মূল্যস্ফীতির সম্ভাব্য প্রভাব এবং সরকারি সেবার মানোন্নয়নের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা উচিত ছিল।

প্রশ্ন: সরকার পে স্কেলের টাকা জোগাড়ে কোন পথে যেতে পারে?

ড. ফাহমিদা খাতুন: অর্থের সবচেয়ে টেকসই উৎস হতে হবে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়। কিন্তু বিদ্যমান করদাতাদের ওপর আরো চাপ দিয়ে নয়। কর অব্যাহতি ও অপ্রয়োজনীয় কর-সুবিধা পর্যালোচনা, উচ্চ আয়ের ব্যক্তি ও সম্পদধারীদের কার্যকরভাবে করজালে আনা, কর ফাঁকি ও অবৈধ আর্থিক প্রবাহ প্রতিরোধসহ রাজস্ব প্রশাসন শক্তিশালী করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক শৃঙ্খলা বাড়ানো প্রয়োজন।

পরিচালন ব্যয়ের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর ও প্রশাসনিক অপচয় কমানো যেতে পারে। তবে কৃচ্ছ্রসাধন যেন কেবল ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না থাকে এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা বা জরুরি রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় যেন নির্বিচারে না কমে। কম অগ্রাধিকার ও দুর্বল বাস্তবায়নক্ষম প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন করা যেতে পারে। কিন্তু ব্যাপকভাবে উন্নয়ন ব্যয় কেটে বেতন দেওয়া সঠিক সমাধান নয়।

প্রশ্ন: বিপুল অর্থ অনুৎপাদনশীল খাতে গেলে উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হবে কি?

ড. ফাহমিদা খাতুন: বেতনকে সম্পূর্ণভাবে অনুৎপাদনশীল ব্যয় বলা সঠিক নয়। দক্ষ, সৎ ও অনুপ্রাণিত সরকারি কর্মীবাহিনী শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইন-শৃঙ্খলা, রাজস্ব আদায় এবং বিনিয়োগসেবা উন্নত করতে পারে। সরকারি কর্মচারীদের বাড়তি আয় ভোগ ও অভ্যন্তরীণ চাহিদাও বাড়ায়। সুতরাং বেতন ব্যয় থেকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুফল পাওয়া সম্ভব। কিন্তু বেতন বাড়লেও যদি সেবার মান, দক্ষতা, উপস্থিতি, জবাবদিহি ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে উন্নতি না হয়, তাহলে এই ব্যয় কার্যত উৎপাদনশীল হবে না। বিশেষ করে অর্থের সংস্থান করতে যদি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, জ্বালানি, পরিবহন, জলবায়ু অভিযোজন বা কর্মসংস্থানমুখী প্রকল্প কমানো হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সক্ষমতা দুর্বল হবে।

প্রশ্ন: বেসরকারি কর্মীদের ওপর মূল্যস্ফীতির বোঝা পড়লে সমাজে কী বার্তা যাবে?

ড. ফাহমিদা খাতুন: এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ন্যায্যতার প্রশ্ন। মোট শ্রমশক্তির তুলনায় সরকারি কর্মচারীর সংখ্যা সীমিত। বিপুলসংখ্যক বেসরকারি কর্মচারী, শ্রমিক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মী, শিক্ষক, সাংবাদিক ও স্বনিয়োজিত মানুষের আয় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বিত হয়নি। সরকারি বেতন বৃদ্ধির ফলে চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ না বাড়লে মূল্যস্ফীতির চাপ সবার ওপর পড়বে; কিন্তু আয়বৃদ্ধির সুবিধা পাবে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী। তাতে সমাজে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে সংগঠিত ও রাষ্ট্রীয় খাতের স্বার্থ অগ্রাধিকার পাচ্ছে অথচ বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার সংকট যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না। এই অনুভূতি সামাজিক বৈষম্য ও অসন্তোষ বাড়াতে পারে। এর সমাধান বেসরকারি খাতকে হঠাৎ একই হারে বেতন বাড়াতে বাধ্য করা নয়। বরং ন্যূনতম মজুরি নিয়মিত পর্যালোচনা, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ, নিম্ন আয়ের মানুষের কর-সুবিধা, খাদ্য ও পরিবহন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতাভিত্তিক মজুরি বৃদ্ধির পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

প্রশ্ন: বাজেট পুনর্বিন্যাস ও প্রকল্প কাটছাঁট সরকারি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে কি?

ড. ফাহমিদা খাতুন: রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া, কম অগ্রাধিকারসম্পন্ন, দীর্ঘদিন স্থবির, অতিমূল্যায়িত অথবা দুর্বল অর্থনৈতিক ফলসম্পন্ন প্রকল্প বাদ দেওয়া হলে সেটি ক্ষতি নয়; বরং সরকারি অর্থের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করবে। কিন্তু শুধু সহজে অর্থ সাশ্রয়ের জন্য চলমান ও উৎপাদনশীল প্রকল্পের বরাদ্দ কমালে সমস্যা হবে।

অবকাঠামো, বিদ্যুৎ-গ্যাস, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি প্রকল্প কাটলে নির্মাণ, পরিবহন ও সংশ্লিষ্ট শিল্পে কর্মসংস্থান কমতে পারে। সরকারি বিনিয়োগ কমলে বেসরকারি বিনিয়োগও নিরুৎসাহ হয়। এ অবস্থায় উৎপাদনশীল সরকারি বিনিয়োগের আকস্মিক সংকোচন প্রবৃদ্ধিকে আরো মন্থর করতে পারে। তাই নির্বিচারে কাটছাঁট নয়, প্রকল্পভিত্তিক মূল্যায়ন প্রয়োজন।

প্রশ্ন: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট থেকে উত্তরণের উপায় কী?

ড. ফাহমিদা খাতুন: বর্তমান সংকটের কিছু অংশ আন্তর্জাতিক বাজার ও সরবরাহব্যবস্থার অস্থিরতার ফল, কিন্তু মূল দুর্বলতা দীর্ঘদিনের। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হওয়ায় আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে। এখন তাৎক্ষণিকভাবে উৎপাদনশীল শিল্প, কৃষি ও জরুরি সেবায় জ্বালানি সরবরাহ অগ্রাধিকার দিতে হবে; অপচয় ও অবৈধ সংযোগ বন্ধ করতে হবে; এলএনজি ও জ্বালানি আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করতে হবে এবং মজুদ ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে।

মধ্য মেয়াদে স্থল ও সমুদ্রে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, পুরনো কূপ সংস্কার, সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার ক্ষতি কমানো, শিল্পে জ্বালানিদক্ষ প্রযুক্তি এবং সৌরবিদ্যুৎ ও আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যের চেষ্টা করতে হবে।

প্রশ্ন: স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল অর্থনীতি গড়তে এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার কী?

ড. ফাহমিদা খাতুন: প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত মূল্যস্ফীতি কমিয়ে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করা। তবে শুধু সুদের হার বাড়িয়ে নয়, খাদ্য সরবরাহ, বাজার প্রতিযোগিতা, আমদানি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবহন ও জ্বালানি ব্যয় মোকাবেলার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির সরবরাহগত কারণও সমাধান করতে হবে। একই সঙ্গে চারটি ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি দরকার : রাজস্ব সংস্কার, ব্যাংক খাতের প্রকৃত আর্থিক স্বাস্থ্য প্রকাশ ও পুনর্গঠন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন।

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.