Monday, June 22, 2026
spot_img

বাজেট বাস্তবায়নে আর্থিক শৃঙ্খলা রক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোতে মনোযোগ দরকার

Originally posted in সাম্প্রতিক দেশকাল on 20 June 2026

গত ১১ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট সংসদে উত্থাপিত হয়েছে। সদ্যোঘোষিত এই বাজেটের সামষ্টিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা, কাঠামোগত দুর্বলতা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন কথা বলেছেন সাম্প্রতিক দেশকালের সঙ্গে। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক স্থবিরতা উত্তরণে বিদ্যমান নীতিগত সীমাবদ্ধতাগুলো উঠে এসেছে তার এই সাক্ষাৎকারে। তিনি প্রচলিত জিডিপির অসম্পূর্ণতা তুলে ধরে ‘গ্রিন জিডিপি’র প্রয়োজনীয়তা, এলডিসি উত্তরণ বিলম্বিত হওয়ার পেছনের কারণ এবং ক্রমবর্ধমান বৈদেশিক ঋণের ঝুঁকি নিয়ে মত প্রদান করেছেন। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন সম্পাদকীয় সহযোগী সৈয়দ রাইয়ান আমীর

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটটি বাস্তবমুখী নাকি উচ্চাভিলাষী, তা সামষ্টিক অর্থনীতির নিরিখে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা, ঘাটতি অর্থায়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতের বরাদ্দের মধ্যে কতটা যৌক্তিক ভারসাম্য রয়েছে? অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে আমাদের কি জিডিপির অনুপাতে আরো সম্প্রসারিত বাজেট প্রণয়ন করা উচিত, নাকি বিদ্যমান কাঠামোগত সক্ষমতার দিকে বেশি নজর দেওয়া প্রয়োজন?

সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম, ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামো নির্মাণ, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ এবং উদীয়মান অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান বহুমুখী চাহিদা মেটাতে প্রস্তাবিত বাজেটকে উচ্চাভিলাষী হতেই হবে। একটি গতিশীল অর্থনীতির পথরেখা ধরে রাখতে এই উচ্চাকাক্সক্ষা যথার্থ। তবে সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, অর্থনীতি একটি দুর্বলতম অবস্থানে রয়েছে। কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিম্নমুখী জিডিপির প্রবৃদ্ধি, রাজস্ব খাতের দুর্বলতা এবং ব্যাংকিং ও জ্বালানি খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। আমরা একই সঙ্গে ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উচ্চ বেকারত্ব ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেখছি, যা অর্থনীতিতে একটা ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ বা মন্দাস্ফীতির মতো অবস্থা সৃষ্টি করেছে।

এ রকম পরিস্থিতিতে বাজেটে সরকারের ব্যয় পরিকল্পনা অনেক বড় হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে একটি নীতিগত দ্বন্দ্ব দেখা যায়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজারে অর্থপ্রবাহ কমাতে সংকুচিত বা ছোট আকারের বাজেট প্রণয়নের একটি প্রথাগত যুক্তি থাকে। কিন্তু নতুন সরকারকে তার রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন, মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর মতো প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য বাজেটের আকার বড় করতে হয়েছে। তাই এখানে ব্যয় করতে হবে খুবই সতর্কভাবে, যাতে সেগুলো উৎপাদন খাতেই বেশি হয় এবং কর্মসংস্থান হয়। এতে মানুষের হাতে অর্থ আসবে এবং তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে।

বাজেটের এই বিশাল ব্যয়ের চাহিদা মেটানোর প্রধান উৎস হলো অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ। কিন্তু দীর্ঘকাল ধরে রাজস্ব আহরণে কাঠামোগত দুর্বলতা, সংস্কারের অভাব ও পর্যাপ্ত দক্ষ জনবলের ঘাটতির কারণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড তার লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে বাজেটে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। আমাদের দেশে প্রতি বছর একটি ঘাটতি বাজেত প্রণীত হয়, যা ২০২৭ অর্থবছরে জিডিপির ৩.৬ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছে। এই ঘাটতি অর্থায়নে সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস হিসেবে ক্রমে ব্যাংক খাতের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। দেশের পুঁজিবাজার অত্যন্ত দুর্বল ও বন্ড মার্কেট অনুপস্থিত হওয়ায় ব্যাংক থেকেই সরকারকে বেশি ঋণ নিতে হচ্ছে। কিন্তু সরকার বেশি ঋণ নিলে ব্যাংকে তারল্য সংকট ও সুদহার বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হয়, যা ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে।

বাজেটের আকার জিডিপির অনুপাতে সম্প্রসারিত হবে নাকি সংকুচিত হবে, এই বিতর্কের চেয়ে কাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে বেশি নজর দেওয়া প্রয়োজন। বিশ্বের অনেক দেশে বাজেটের আকার জিডিপির ২০-২২ শতাংশ পর্যন্ত হয়, তাই আকার কোনো সমস্যা নয়। মূল সমস্যা হলো প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতার অভাব। কাঠামোগত সংস্কার, দক্ষ জনবল তৈরি এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে না পারলে বাজেটের আকার যা-ই হোক না কেন, সরকারের সব উন্নয়ন ও আকাক্সক্ষা বাস্তবে রূপ নেবে না।

প্রচলিত জিডিপি পরিমাপ পদ্ধতি নিয়ে উন্নয়ন অর্থনীতিতে বিতর্ক রয়েছে, কারণ এটি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত, গৃহস্থালি শ্রম ও পরিবেশগত অবক্ষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে না। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এই অসম্পূর্ণ চিত্রের বাইরে গিয়ে ‘গ্রিন জিডিপি’ বা ‘ওয়েলবিয়িং ইনডেক্স’-এর মতো টেকসই পরিমাপকগুলো নীতিনির্ধারণী আলোচনায় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করার সময় কি এসেছে?

বিশ্বব্যাপী দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রধান সূচক হিসেবে জিডিপি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু উন্নয়নকে শুধু জিডিপির সমার্থক হিসেবে বিবেচনা করা ভুল দৃষ্টিভঙ্গি। জিডিপি মূলত সূচক, যা বাজারে কেনাবেচা হওয়া পণ্য ও সেবার হিসাব তুলে ধরে। ফলে এটি উন্নয়নের পূর্ণাঙ্গ চিত্র নয়। কারণ জিডিপি এমন পণ্য ও সেবার অনেক কিছুর অন্তর্নিহিত মূল্য বিবেচনায় নেয় না, যা মানুষের জীবন ও কল্যাণের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ পরিবেশগত অবক্ষয়। কৃষিজমি নষ্ট করে বা বন উজাড় করে যখন শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠে, তখন উৎপাদিত পণ্য ও সেবা এবং মজুরি জিডিপিতে যুক্ত হয়। কিন্তু এর ফলে ধ্বংস হওয়া প্রাকৃতিক সম্পদ, চাষের জমি, বনাঞ্চল, বিষাক্ত হওয়া নদী বা মানুষের ক্রমবর্ধমান মৃত্যুঝুঁকি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি—এগুলোর হিসাব জিডিপিতে থাকে না, জিডিপি হিসাবের বর্তমান ফরমুলার মধ্যে এগুলো অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই উপলব্ধি জোরালো হয়েছে যে, শুধু উৎপাদন ও আয়ের বৃদ্ধি কোনো দেশের প্রকৃত উন্নয়নের পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে না। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত ব্রান্ডটল্যান্ড কমিশনের ঐতিহাসিক প্রতিবেদন Our Common Future এবং ১৯৯২ সালের রিও আর্থ সামিট বিশ্বকে প্রথমবারের মতো স্পষ্টভাবে দেখায় যে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য পরিবেশের ক্ষতি করা হলে তার বোঝা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বহন করতে হয়। এই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে এখন শুধু জিডিপি বৃদ্ধির হিসাব নয়, বরং সেই প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য পরিবেশের যে ক্ষতি হচ্ছে তারও মূল্যায়ন করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এ কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘গ্রিন জিডিপি’ নিয়ে আলোচনা ও গবেষণা গুরুত্ব পাচ্ছে।

গ্রিন জিডিপি হিসাবের ক্ষেত্রে বন উজাড়, প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষয়, দূষণ ও পরিবেশগত অবক্ষয়ের অর্থনৈতিক মূল্য প্রচলিত জিডিপি থেকে সমন্বয় করা হয়। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য এ ধরনের হিসাব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দ্রুত প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি উপেক্ষা করলে উন্নয়নের প্রকৃত সুফল সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ধারণা সৃষ্টি হতে পারে। তাই সময় এসেছে অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে শুধু প্রবৃদ্ধির সংখ্যায় নয়, বরং তার পরিবেশগত ও সামাজিক স্থায়িত্বের আলোকে মূল্যায়ন করার।

অন্যদিকে মানবকল্যাণের বৃহত্তর পরিসরে নারীদের গৃহস্থালি শ্রম অমূল্য হলেও জিডিপিতে সেটি অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ নেই। ঘরের ভেতরের যাবতীয় কাজকর্মসহ অন্যান্য কাজের আর্থিক মূল্য না থাকায় তা জিডিপির বাইরে থেকে যায়। অথচ এই কাজের কারণেই পরিবারের অন্য সদস্যরা বাইরে উপার্জনের সুযোগ পান, যাদের আয় জিডিপিতে যুক্ত হয়।

অনেক দেশ জিডিপির প্রচলিত হিসাবের বাইরে ‘স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট’ ব্যবহার করে নারীদের অবৈতনিক গৃহস্থালি ও সেবামূলক কাজের অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ করে। এতে জিডিপির মূল পরিসংখ্যান পরিবর্তিত হয় না, তবে অর্থনীতিতে এসব কাজের প্রকৃত অবদান দৃশ্যমান হয়।

স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তটি দীর্ঘ মেয়াদে আমাদের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক বাজারে কেমন প্রভাব ফেলবে?

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের সময়সীমা পিছিয়ে বাড়তি সময় চাওয়ার উদ্যোগ একটি কৌশল, যাতে বাংলাদেশ বাড়তি সময়ে প্রস্তুতি নিতে পারে। কিন্তু এটি আমাদের প্রস্তুতি নেওয়ার ক্ষেত্রে ঢিলেঢালা ভাব ও কাঠামোগত দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। ২০১৮ সালেই বাংলাদেশ জাতিসংঘের নির্ধারিত তিনটি মানদণ্ড—মাথাপিছু আয় (জিএনআই), হিউম্যান অ্যাসেট ইনডেক্স ও ইকোনমিক ভালনারেবিলিটি ইনডেক্স পূরণ করে এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করেছিল। এরপর ২০২১ সালের প্রথম ‘ট্রায়েনিয়াল রিভিউ’তেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। পরবর্তী সময়ে কোভিড মহামারির কারণে উত্তরণের অপেক্ষায় থাকা দেশগুলোর জন্য জাতিসংঘ উত্তরণের সময়কাল ২০২৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দুই বছর বাড়িয়েছিল। কিন্তু আমাদের দেশের প্রস্তুতির দুর্বলতার কারণে বর্তমান সরকার আরো তিন বছর সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে। এই প্রস্তুতির অভাব আমাদের জন্য বড় ঝুঁকির কারণ। উত্তরণ ঘটলে আমরা এলডিসি হিসেবে যেসব সুবিধা পেতাম, তা হারাব। প্রথমত, বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপানের মতো অনেক উন্নত দেশগুলোতে এবং অনেক উন্নয়নশীল দেশে তৈরি পোশাক ও অন্যান্য রপ্তানি পণ্যের শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার পেয়ে থাকে। এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে এই সুযোগ আর থাকবে না। এতে আমাদের রপ্তানি বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হবে। দ্বিতীয়ত, সহজ শর্তে বিদেশি ঋণ পাওয়া যাবে না; ঋণের সুদের হার বেড়ে যাবে এবং ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘গ্রেইস পিরিয়ড’ কমে যাবে। তৃতীয়ত, স্বাস্থ্য খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ‘ট্রিপস’ চুক্তির অধীনে ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস বাস্তবায়িত হলে ওষুধশিল্পে পেটেন্টিং ও লাইসেন্সিং বাধ্যতামূলক হবে। এতে ওষুধের দাম বহুগুণ বেড়ে জনস্বাস্থ্যের ব্যয় বাড়াবে। পাশাপাশি ডিজিটাল কনটেন্ট ব্যবহারের অবাধ সুযোগও সীমিত হবে, পয়সা দিয়ে সেগুলো কিনতে হবে।

অন্যদিকে আমাদের করকাঠামো মোটেও প্রস্তুত নয়। বর্তমানে আমাদের রাজস্ব আয়ের মাত্র ৩৫ শতাংশ আসে প্রত্যক্ষ আয়কর থেকে, বাকি ৬৫ শতাংশই পরোক্ষ কর অর্থাৎ ভ্যাট ও আমদানি শুল্কের ওপর নির্ভরশীল। উত্তরণের পর ‘নন-রেসিপ্রোসিটি’ সুবিধা আর থাকবে না। ফলে আমাদের দেশে অন্য দেশের আমদানির ওপর শুল্ক বসানো যাবে না, যদি আমরা ওই দেশগুলোতে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা পাই। সে ক্ষেত্রে আমরা কিছু পরিমাণ রাজস্ব আয় হারাব। কর প্রশাসনে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এখনো বাকি। আবার ব্যক্তি খাতেরও ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় অনেক বেশি। দুর্বল অবকাঠামো, বন্দর ও জ্বালানি সমস্যা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি ও দক্ষ জনশক্তির অভাবের কারণে তারা ভিয়েতনাম বা চীনের মতো দেশের সঙ্গে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। ইউরোপ উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে তিন বছরের একটা ‘গ্রেস পিরিয়ড’ দেবে। ওই সময়ের মধ্যে আমাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে, যাতে রপ্তানিতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা তৈরি হয়। রপ্তানি আয় কমলে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ, লজিস্টিকস বা পরিবহনসহ পুরো অর্থনীতিতে এর একটি বড় ধরনের বহুমুখী প্রভাব পড়বে। তাই এখন আর সময় নষ্ট না করে এই ধাক্কা সামলাতে সরকারের উচিত মসৃণ উত্তরণ কৌশলের সুনির্দিষ্ট সুপারিশগুলো ব্যক্তি খাত ও অন্যান্য অংশীজনকে সঙ্গে নিয়ে অবিলম্বে বাস্তবায়ন করা।

গত এক দশকের বাজেট বিশ্লেষণে একটি কাঠামোগত পরিবর্তন স্পষ্ট—বৈদেশিক অনুদান ক্রমে হ্রাস পাচ্ছে এবং বিপরীতে ঋণের অনুপাত বাড়ছে। এলডিসি উত্তরণ পিছিয়ে গেলেও অনুদান কমে যাওয়ার এই প্রবণতা ঠেকানো সম্ভব নয়। এই ক্রমবর্ধমান ঋণনির্ভরতা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ঋণ পরিশোধ সক্ষমতাকে কতটা ঝুঁকির মুখে ফেলছে?

বাজেট ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক খাতের পাশাপাশি বৈদেশিক উৎসের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। প্রস্তাবিত বাজেটে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি রেকর্ড লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বৈদেশিক ঋণের অর্থায়নে গৃহীত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) প্রকল্পগুলোতে দীর্ঘসূত্রতা দেখা যায়। অন্যদিকে ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের চাপ বাড়ায় দেশের ডেট-টু-জিডিপি অনুপাতের ক্রমে ঊর্ধ্বমুখিতা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ পরিশোধ সক্ষমতার মানদণ্ডে বাংলাদেশ এতদিন নিম্ন ঝুঁকিতে থাকলেও ক্রমবর্ধমান ঋণের কারণে তা এখন মাঝারি ঝুঁকিতে নেমে এসেছে, যা ভবিষ্যতের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা।

বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের জন্য একটি শক্তিশালী বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থাকা অপরিহার্য। বর্তমানে রিজার্ভ বাড়ছে। তবে জ্বালানি ও মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি ব্যয় বাড়লে এই রিজার্ভের ওপর চাপ পড়বে। বৈশ্বিক ফিন্যানশিয়াল আর্কিটেকচার পরিবর্তনের কারণে বৈদেশিক অনুদান প্রাপ্তি কমেছে। উন্নত দেশগুলোর জিএনআইয়ের ০.৭ শতাংশ ‘অফিশিয়াল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্স’ হিসেবে সাহায্য দেওয়ার কথা থাকলেও তারা সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারছে না। ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত, যুদ্ধ, মহামারি ও শরণার্থী সংকটের কারণে তারা তাদের সাহায্য অন্যদিকে সরিয়ে নিচ্ছে।

এ ছাড়া ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে ‘লোয়ার মিডল ইনকাম’ দেশে উন্নীত করার ফলে বৈদেশিক অর্থায়নের শর্তগুলোতে পরিবর্তন এসেছে। পাশাপাশি ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি পেয়েছে এবং গ্রেস পিরিয়ড কমে এসেছে। আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো (ফিচ, এসঅ্যান্ডপি, মুডিজ) বাংলাদেশের রেটিং কমিয়ে দিলে ঋণপ্রাপ্তি আরো কঠিন হয়ে পড়বে।

এই ক্রমবর্ধমান ঋণনির্ভরতা ও কঠিন শর্তের বেড়াজাল থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া এই শর্তগুলো পরিপালন করা অসম্ভব। তাই বৈদেশিক ঋণের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণের সক্ষমতা বাড়ানো এবং ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনার কোনো বিকল্প নেই।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি এবং সরকারের রাজস্বনীতির মধ্যে কার্যকর ও কাঠামোগত সমন্বয় কতটা নিশ্চিত করা গেছে?

দেশে প্রায় চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে যে ধরনের কার্যকর ও কাঠামোগত সমন্বয় থাকা প্রয়োজন ছিল, শুরুর দিকে তা দেখা যায়নি। কোভিড মহামারি ও ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির মারাত্মক চাপ সামলাতে অন্যান্য দেশ যখন সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করে বাজারে অর্থের সরবরাহ কমাচ্ছিল, বাংলাদেশ তখন উল্টো পথে হেঁটেছে। দীর্ঘ সময় ধরে ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশ এবং আমানতের সুদের হার ৬ শতাংশে (৯-৬) বেঁধে রাখা হয়েছিল। সুদের হার কম থাকায় বাজারে টাকা খুব সস্তা হয়ে যায়, যা মূল্যস্ফীতিকে আরো উসকে দেয়। অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কা সঠিক মুদ্রানীতির মাধ্যমে তাদের মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনতে পেরেছে। আমাদের দেশে অনেক দেরিতে বাংলাদেশ ব্যাংক পলিসি রেট ক্রমান্বয়ে বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করে। তবে কেবল সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি নিলেই হবে না, এর সঙ্গে রাজস্বনীতির যথাযথ সাজুয্য থাকতে হবে। বিগত সরকারের আমলে মেগা প্রকল্পগুলোতে বিপুল ব্যয়ের মাধ্যমে যে সম্প্রসারণমূলক রাজস্বনীতি অনুসরণ করা হয়েছিল, তা মুদ্রানীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। যদিও অন্তর্বর্তী সরকার বাজেটের আকার ছোট করে এবং কম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলো স্থগিত করে রাজস্বনীতিতে কিছুটা লাগাম টেনেছে, তার পরও মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশিত হারে কমছে না। কারণ আমাদের দেশের বর্তমান মূল্যস্ফীতি কেবল চাহিদাজনিত নয়, এটি মূলত একটি সরবরাহজনিত সমস্যা। তাই বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়াতে হবে।

নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্তকরণ এবং রাজস্ব প্রশাসনে কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা এই বাজেটে প্রতিফলিত হয়েছে কি?

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও অদক্ষতার সবচেয়ে বড় বহিঃপ্রকাশ হলো করজাল সম্প্রসারিত না হওয়া এবং বিদ্যমান করদাতাদের ওপরই বারবার করের বোঝা চাপানো। বিশেষ করে, বেতনভুক্ত চাকরিজীবী ও নিয়মিত করদাতাদের অনেক সময় নিরীক্ষার নামে বারবার হয়রানি করা হয়। গত কয়েক বছরে অর্থনীতির আকার বড় হয়েছে, মানুষের আয় বেড়েছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বহুমুখীকরণ হয়েছে, বড় শহরের বাইরে উপশহর ও গ্রামগঞ্জে ছোট-মাঝারি ব্যবসা এবং কৃষি খাতেও অনেক মানুষের আয় সক্ষমতা করযোগ্য সীমার ভেতর প্রবেশ করেছে। নতুন সম্ভাব্য করদাতাদের করজালে অন্তর্ভুক্ত করার সুস্পষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এই পরিস্থিতি উত্তরণে রাজস্ব প্রশাসনে কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য। এনবিআরকে কর প্রশাসন ও কর আদায়—এই দুই বিভাগকে সম্পূর্ণ আলাদা করার যে প্রাথমিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা যৌক্তিক। এই সংস্কার সফল করতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। কর আদায় প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় করার পাশাপাশি টিআইএন, ব্যাংক হিসাব ও জাতীয় পরিচয়পত্রকে একীভূত করতে হবে, যাতে ফাঁকির পথ খোলা না থাকে। তবে মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তির পেছনেও মানুষ কাজ করে, তাই সেখানে সুশাসন নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরি। এবারের বাজেটে অর্থমন্ত্রীর বক্তৃতায় এনবিআরের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সুশাসনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। বাজেটের প্রতিশ্রুতিগুলো শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ না রেখে দৃশ্যমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে না পারলে, শেষ পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ের মূল লক্ষ্যমাত্রা থেকে বড় ধরনের বিচ্যুতি ঘটবে।

বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে, যাকে অর্থনীতিতে ‘ক্রাউডিং-আউট ইফেক্ট’ বলা হয়। এই ঝুঁকি প্রশমনে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল কী হওয়া উচিত?

তাত্ত্বিকভাবে সম্প্রসারণমূলক রাজস্বনীতি সামষ্টিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করলেও বাংলাদেশের মতো অত্যন্ত কম রাজস্ব আদায়ের দেশে এর যথাযথ প্রয়োগ চ্যালেঞ্জিং একটি বিষয়। দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাহিদার কারণে বড় বাজেটের মাধ্যমে সরকারি ব্যয়, বিশেষ করে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাড়ানোর কোনো বিকল্প আমাদের সামনে নেই। তবে সরকার যদি বাজেট ঘাটতি মেটানোর উদ্দেশ্যে ব্যাংক খাত থেকে মাত্রাতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ করে, তখন ব্যাংকঋণের ক্ষেত্রে ‘ক্রাউডিং-আউট ইফেক্ট’ অর্থাৎ ব্যক্তি খাতের জন্য ঋণ সংকুচিত হয়ে যায় এবং বিনিয়োগ সরাসরি বাধাগ্রস্ত হওয়ার সমূহ ঝুঁকি তৈরি হয়। ব্যক্তি খাত কোনো মতে ঋণ পেলেও তা নিতে হয় অনেক চড়া সুদে। এর ফলে তাদের ব্যবসায়ের পরিচালনা ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যায়। এই ধরনের অন্তর্নিহিত অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বগুলো থেকে বের হয়ে আসতে হবে। দেশে সত্যিকার অর্থে ব্যক্তি খাতের উন্নয়নের মাধ্যমে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে চাইলে উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অর্থায়নের সুযোগ নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। এ ক্ষেত্রে কেবল বৃহৎ শিল্প-কারখানা বা বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে দৃষ্টি দিলেই চলবে না, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা এসএমই খাতের দিকেও বিশেষ নজর দিতে হবে। কারণ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এই খাতের অবদান অপরিসীম। ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকটের কারণে সৃষ্ট উচ্চ সুদ পরিশোধের সক্ষমতা এসএমই খাতের নেই। তাই তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকারের এ ধরনের ঝুঁকি এড়াতে মধ্যম থেকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হিসেবে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। নিজস্ব উৎস থেকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের লক্ষ্যে অন্যান্য দেশের সফল দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে আমাদের অভ্যন্তরীণ পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে হবে।

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.