বিনিয়োগ ও জ্বালানি সংকট দূর না হলে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ফেরানো কঠিন: মোস্তাফিজুর রহমান

Originally posted in জাতীয় অর্থনীতি on 5 September 2026

প্রবৃদ্ধির পতনে স্পষ্ট অর্থনীতির দুর্দশা

বছর দশেক আগেও মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি যে গতিতে ছুটছিল তা দেখে বাংলাদেশকে ‘এশিয়ার উদীয়মান নতুন বাঘ’ আখ্যা দিয়েছিলেন অর্থনীতির বিশ্লেষকেরা। সময়ের ব্যবধানে সেই বাঘ ক্ষীপ্রতা হারিয়েছে। নানামুখী সংকটে এখন খাদের কিনারে দেশের অর্থনীতি, যা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বছর বছর প্রবৃদ্ধির পতনে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রায় সব সূচকেই অর্থনীতি অবস্থা এখন বেশ নাজুক। নতুন কোনো বিনিয়োগ নেই, ফলে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হচ্ছে না। উল্টো গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে উৎপাদন খাতে ধস নেমেছে। এতে প্রবৃদ্ধিতেও পতন ঘটছে ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) সম্প্রতি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির নিয়মিত হালনাগাদ ‘জাতীয় হিসাব পরিসংখ্যান-২০২৬’ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে দেখা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি (সাময়িক হিসাব) দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। এ সময় কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি ২ হয়েছে দশমিক ৭৮ শতাংশ। আর শিল্প ও সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি সামান্য বেড়ে ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ হয়েছে।

গত বছরের অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির যে হিসাব বিবিএস দিয়েছে তা ২০১৭-১৮ অর্থবছরের তুলনায় বড় পতনেরই নির্দেশক।

বিবিএসের প্রতিবেদন ঘেটে দেখা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ। ওই অর্থবছরে কৃষি খাতে ৩ দশমিক ২০ শতাংশ, শিল্প খাতে ৮ দশমিক ২৭ শতাংশ এবং সেবা খাতে ৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়। পরের ২০১৭-১৮ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি শূন্য দশমিক ৭৩ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৩২ শতাংশ।

প্রবৃদ্ধি অর্জনে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগে করোনা মহামারির সময়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি নেমে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশে। ওই বছর কৃষিতে সামান্য বাড়লেও শিল্প ও সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৩ দশমিক ৬১ এবং ৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। পরের দুই অর্থবছর প্রবৃদ্ধি সামান্য বাড়লেও ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির সূচক ধারাবাহিক মন্দা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ সময়ে তিন খাতেই প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে।

বিবিএস জানায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশে। এ সময় কৃষি খাতে ৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও শিল্প খাতে কমে ৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ এবং সেবা খাতে তা ৫ দশমিক ৩৭ শতাংশে নেমে আসে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির এ পতন আরও প্রকট আকার ধারণ করে। এ সময়ে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ২২ শতাংশে নেমে আসে। ওই অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৩১ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৫ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। আর সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি শূন্য দশমিক ৩১ কমে হয়েছে ৫ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার আরও সংকুচিত হয়ে গত এক দশকের মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে নেমে আসে। এ সময় শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি অত্যন্ত নাজুক হয়ে ৪ দশমিক ৩৫ শতাংশে দাঁড়ায়। একই সঙ্গে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি কমে হয় মাত্র ২ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি হয় ৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ।

বিবিএসের সর্বশেষ হিসাব তথা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সাময়িক হিসাবে দেখা যাচ্ছে, সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ সময় কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি ২ হয়েছে দশমিক ৭৮ শতাংশ। আর শিল্প ও সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি সামান্য বেড়ে ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ হয়েছে। তবে এক দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি শিল্প খাতের ধারাবাহিক পতনই সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে বড় পতনের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগ পরিবেশের নানা অনিশ্চয়তা, উচ্চসুদহার, জ্বালানি সংকট, জমি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং নীতির ধারাবাহিকতার অভাবে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ আগ্রহ কমেছে। এর সঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাও নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের গতি কমেছে। রাজনৈতিকসংবাদ পড়ুন

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র‍্যাপিড) এবং এফইএস বাংলাদেশের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, পুঁজিনির্ভর ও অটোমেশনভিত্তিক হয়ে ওঠার কারণে গত এক দশকে শিল্প খাতে মোট কর্মসংস্থান ৯৫ লাখ থেকে কমে ৮১ লাখে এসেছে। ফলে কর্মসংস্থান কমেছে ১৪ লাখ। ২০১৩ সালে উৎপাদন খাতে নারী কর্মীর সংখ্যা ছিল ৩৭ লাখ ৫০ হাজারের বেশি। ২০২৪ সালের মধ্যে এই সংখ্যা কমে প্রায় ২০ লাখে ঠেকেছে। সেই হিসাবে ১৮ লাখ নারী শ্রমিক শ্রমবাজার থেকে ছিটকে গেছেন। এতে এ খাতে নারীদের অংশীদারত্ব ৪০ থেকে কমে ২৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে আনতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, একটি একক উপাদানের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়; বরং এর পেছনে অনেকগুলো অনুঘটক কাজ করে, যার মধ্যে জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা বিধান করা অন্যতম প্রধান বিষয়। পাশাপাশি বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করতে সেবা বাস্তবায়ন করা, পণ্য সরবরাহ বা রসদ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো এবং বন্দরে পণ্য খালাস ও জাহাজ ঘোরার সময় কমিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে দেশের সামগ্রিক শিক্ষা খাতকে, বিশেষ করে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন আঙ্গিকে ঢেলে সাজাতে হবে। বর্তমানে চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের যে কৌশলগত দ্বিপাক্ষিক উদ্যোগ ও সহযোগিতা চলমান রয়েছে, সেগুলোকে আরও বেগবান করা প্রয়োজন। কারণ আগামী তিন বছরের মধ্যে কিংবা তারও আগে অর্থনীতিতে যে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জগুলো আসবে, তা দৃঢ়ভাবে মোকাবিলা করতে হলে এই কৌশলগুলো সময়মতো বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সিপিডির এই সম্মাননীয় ফেলো বলেন, অর্থনৈতিক যেকোনো সংকট তৈরি হলে তার প্রথম বড় ধাক্কাটি এসে পড়ে শিল্প খাতের ওপরই। অনুকূল আবহাওয়া থাকলে কৃষি খাত কোনোভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে এবং সেবা খাতের কার্যক্রমও সাধারণত একটি নির্দিষ্ট ধারায় চলমান থাকে। কিন্তু বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি হলে দেশের উৎপাদনশীল খাত, রপ্তানি খাত, আমদানি প্রতিস্থাপনকারী শিল্প এবং রপ্তানিমুখী খাতসহ সব ধরনের শিল্প খাতই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই সংকটময় পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে জ্বালানি নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.