Originally posted in বণিকবার্তা on 29 July 2026

বিশ্বকাপ চলাকালীন শুধু মাঠে ফুটবল খেলা হয় না; খেলা হয় অর্থনীতি, প্রযুক্তি, ব্যবসা, পরিচয় ও আবেগেরও।
কোটি কোটি মানুষ একই সময়ে একই গোলের আনন্দে উল্লাস করে, একই পরাজয়ে হতাশ হয়। ভূরাজনৈতিক বিভাজন, বাণিজ্য সংঘাত ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও ফুটবল মানুষকে এমন এক যৌথ অভিজ্ঞতায় যুক্ত করে, যা আজকের বিভক্ত বিশ্বে বিরল।
কিন্তু এ আবেগের পেছনে বর্তমানে কাজ করছে বিপুল এক বাণিজ্যিক ব্যবস্থা। ফিফা বিশ্বকাপ আর শুধু বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আয়োজন নয়; এটি একবিংশ শতাব্দীর অর্থনীতিরও একটি প্রতিচ্ছবি। ব্র্যান্ড, সম্প্রচারস্বত্ব, প্রযুক্তি, পর্যটন, মেধাস্বত্ব এবং মানুষের মনোযোগ ও আবেগ—সবকিছুকে কীভাবে অর্থনৈতিক মূল্যে রূপান্তর করা যায়, বিশ্বকাপ তার একটি অসাধারণ উদাহরণ।
ক্রীড়া অর্থনীতিবিদ স্টেফান সিমানস্কি তার ২০০৯ সালের বই Playbooks and Checkbooks: An Introduction to the Economics of Modern Sports-এ দেখিয়েছেন, আধুনিক ক্রীড়ায় মাঠের প্রতিযোগিতাকে বাজার, গণমাধ্যম, অর্থায়ন ও জননীতি থেকে আলাদা করে দেখা যায় না। বিশ্বকাপ এ রূপান্তরের সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণগুলোর একটি। এর মধ্যে বিশ্বায়ন, ডিজিটালাইজেশন, আচরণগত অর্থনীতি, নেটওয়ার্ক প্রভাব, সুপারস্টার বাজার এবং বৈষম্যের মতো বৃহত্তর অর্থনৈতিক বাস্তবতা একসঙ্গে কাজ করে।
ফিফার আয়ের পরিসংখ্যান থেকে এ পরিবর্তনের মাত্রা বোঝা যায়। ২০১৫-১৮ চক্রে ফিফার আয় ছিল ৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার। ২০১৯-২২ চক্রে তা বেড়ে ৭৫৭ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। ২০২৩-২৬ সময়ের জন্য প্রাক্কলিত বাজেট ১ হাজার ১০০ কোটি ডলার। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের পর এ অংক ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে পৌঁছতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থাৎ খেলাটি যত বৈশ্বিক হয়েছে, এর বাণিজ্যিক মূল্যও তত দ্রুত বেড়েছে।
এ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি সম্প্রচারস্বত্ব, স্পন্সরশিপ, টিকিট, আতিথেয়তা, লাইসেন্সিং ও পণ্য বিপণন। লক্ষণীয় বিষয় হলো, ফিফার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ কোনো কারখানা বা স্টেডিয়াম নয়। তাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ ‘বিশ্বকাপ’ নামের ব্র্যান্ডটি এবং সেই ব্র্যান্ডের সঙ্গে কোটি কোটি মানুষের গভীর আবেগ ও আনুগত্য।
এখানেই বিশ্বকাপ আধুনিক অর্থনীতির একটি বড় পরিবর্তনের কথা বলে। গত শতাব্দীতে সম্পদ সৃষ্টির প্রধান ভিত্তি ছিল কারখানা, যন্ত্রপাতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ। এখন বিশ্বের বহু মূল্যবান প্রতিষ্ঠানের শক্তি মেধাস্বত্ব, ব্র্যান্ড, প্রযুক্তি, ডিজিটাল প্লাটফর্ম ও নেটওয়ার্কে। অ্যাপল, ডিজনি, নেটফ্লিক্স বা গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা তাদের ভৌত সম্পদের চেয়ে অনেক বেশি নিহিত ধারণা, প্রযুক্তি, সুনাম এবং মানুষের সঙ্গে সংযোগের মধ্যে। ফিফার ক্ষেত্রেও তাই। বিশ্বকাপ ব্র্যান্ড, একচেটিয়া সম্প্রচারস্বত্ব এবং সমর্থকদের আনুগত্যই এর অর্থনৈতিক শক্তির প্রধান ভিত্তি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘মনোযোগের অর্থনীতি’। ডিজিটাল যুগে মানুষের মনোযোগ নিজেই একটি মূল্যবান সম্পদ। বিশ্বকাপের সময় কোটি কোটি মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা খেলা দেখেন, দল নিয়ে আলোচনা করেন, ভিডিও দেখেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানান। এ বিপুল মনোযোগই বিজ্ঞাপনদাতা, সম্প্রচারকারী ও স্পন্সরদের কাছে অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হয়।
একইভাবে বিশ্বকাপ ‘অভিজ্ঞতার অর্থনীতি’রও শক্তিশালী উদাহরণ। একজন দর্শক শুধু একটি আসন কিনছেন না; তিনি কিনছেন একটি স্মৃতি, একটি আবেগ, একটি পরিচয়। ভরা স্টেডিয়ামে জাতীয় সংগীত শোনা, প্রিয় দলের জার্সি পরে হাজারো মানুষের সঙ্গে উল্লাস করা কিংবা বিশ্বকাপের শহরে কয়েক দিন কাটানো—এসবের মূল্য শুধু টাকার অংকে মাপা যায় না। আর এ আবেগের ওপর ভিত্তি করেই প্রিমিয়াম টিকিট, বিলাসবহুল আতিথেয়তা ও নানা ধরনের বিশেষ সেবার বাজার তৈরি হয়।
প্রযুক্তি এ ব্যবসাকে আরো বিস্তৃত করেছে। ডিজিটাল সম্প্রচার, স্ট্রিমিং, মোবাইল অ্যাপ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশ্বকাপকে মাঠের সীমা ছাড়িয়ে ২৪ ঘণ্টার একটি বৈশ্বিক অভিজ্ঞতায় পরিণত করেছে। খেলার আগে বিশ্লেষণ, খেলার সময় সরাসরি প্রতিক্রিয়া, পরে আলোচনা, ভিডিও, ফ্যান্টাসি ফুটবল, বেটিং এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক কনটেন্ট—সব মিলিয়ে একটি ম্যাচের অর্থনৈতিক আয়ু এখন ৯০ মিনিটের অনেক বাইরে।
ফুটবল ৯০ মিনিটের খেলা; কিন্তু এর ব্যবসা চলে সারা বছর। তবে বিশ্বকাপের এ অভাবনীয় বাণিজ্যিক সাফল্য একটি মৌলিক প্রশ্নও সামনে আনে: এ খেলা এখন আসলে কার?
ফুটবল ঐতিহাসিকভাবে ‘জনগণের খেলা’। একটি বল ও সামান্য জায়গা থাকলেই খেলা যায়। আয়, শ্রেণী বা সামাজিক অবস্থান কখনই ফুটবলকে ভালোবাসার পূর্বশর্ত ছিল না। কিন্তু যে বাণিজ্যিকীকরণ ফুটবলকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিনোদন শিল্পগুলোর একটিতে পরিণত করেছে, সেটিই এখন বিশ্বকাপের সরাসরি অভিজ্ঞতাকে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
টিকিটের দাম এর একটি অংশ মাত্র। আন্তর্জাতিক দর্শকের জন্য রয়েছে বিমান ভাড়া, আবাসন, স্থানীয় যাতায়াত এবং অন্যান্য ব্যয়। বিশ্বকাপের সময় এসব খরচ আরো বেড়ে যায়। উন্নয়নশীল দেশের একজন মধ্যবিত্ত ফুটবলপ্রেমীর জন্য তাই বিশ্বকাপের মাঠে বসে খেলা দেখা ক্রমেই একটি দুর্লভ বিলাসিতায় পরিণত হচ্ছে।
করপোরেট আতিথেয়তার বিস্তার এ বিভাজনকে আরো স্পষ্ট করেছে। বিলাসবহুল আসন, বিশেষ প্রবেশাধিকার, খাবার ও অন্যান্য সুবিধাসহ প্রিমিয়াম প্যাকেজ তৈরি হচ্ছে উচ্চ আয়ের দর্শক ও করপোরেট গ্রাহকদের জন্য। অর্থনীতির ভাষায় এটিকে বলা হয় বৈষম্যমূলক মূল্য নির্ধারণ। অর্থাৎ ভোক্তার অর্থ প্রদানের সক্ষমতা ও আগ্রহ অনুযায়ী ভিন্ন মূল্য নির্ধারণ। ব্যবসার দিক থেকে এটি যৌক্তিক এবং আয় বাড়াতে কার্যকর। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আয় সর্বোচ্চ করার এ যুক্তি কত দূর পর্যন্ত একটি ‘জনগণের খেলা’র সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
এখানে প্রযুক্তি এক অদ্ভুত বৈপরীত্য সৃষ্টি করেছে। বিশ্বকাপে সরাসরি উপস্থিত থাকা আগের তুলনায় ব্যয়বহুল, কিন্তু বিশ্বকাপ দেখা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় সহজ। টেলিভিশন, স্ট্রিমিং ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোটি কোটি মানুষকে পৃথিবীর প্রায় যেকোনো জায়গা থেকে প্রতিটি ম্যাচের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
অর্থাৎ দর্শক হিসেবে ফুটবল আরো গণতান্ত্রিক হয়েছে; কিন্তু সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ আরো অসম হয়েছে।
বাণিজ্যিকীকরণকে অবশ্য একপক্ষীয়ভাবে দেখার সুযোগ নেই। বিপুল বাণিজ্যিক আয় ফুটবলের বৈশ্বিক বিস্তার, অবকাঠামো ও নানা ধরনের উন্নয়নে অর্থ জুগিয়েছে। কিন্তু বিশ্বকাপ একই সঙ্গে দেখায়, বাজারের দক্ষতা এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির মধ্যে ভারসাম্য হারালে সমস্যাও তৈরি হয়। ফুটবলের সবচেয়ে বড় সম্পদ সম্প্রচারস্বত্ব, স্পন্সরশিপ কিংবা করপোরেট প্যাকেজ নয়, এর সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো সাধারণ মানুষের সঙ্গে এর আবেগের সম্পর্ক। সেই সম্পর্ক দুর্বল হলে ফুটবল হয়তো আরো লাভজনক হবে, কিন্তু তার সামাজিক শক্তি কমে যাবে।
বাংলাদেশের জন্য বিশ্বকাপের অর্থনীতি থেকে শেখার বিষয় এখানেই শেষ নয়, বরং এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা খেলাধুলার বাইরেই। বাংলাদেশের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাক শিল্প ও তুলনামূলক কম শ্রমমূল্যের সুবিধার ওপর দাঁড়িয়ে অগ্রসর হয়েছে। এ খাত এখনো অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য। কিন্তু ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা শুধু কম খরচে পণ্য উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। জ্ঞান, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, দক্ষতা, ব্র্যান্ড, সৃজনশীলতা এবং মানুষের অভিজ্ঞতা তৈরির সক্ষমতা ক্রমেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে।
বাংলাদেশকেও তাই উৎপাদনভিত্তি শক্তিশালী রাখার পাশাপাশি জ্ঞান ও সেবানির্ভর অর্থনীতির দিকে এগোতে হবে। ডিজিটাল দক্ষতা, সৃজনশীল শিল্প, পর্যটন, ক্রীড়া ব্যবস্থাপনা, গণমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক মানের নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরির সুযোগ এখন অনেক বেশি গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।
বিশ্বকাপ আরেকটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখায়: প্রযুক্তি শুধু কোনো শিল্পকে দক্ষ করে না, পুরো ব্যবসার ধরনই বদলে দিতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডেটা, ডিজিটাল সম্প্রচার ও অনলাইন প্লাটফর্ম ফুটবলের খেলা, ব্যবস্থাপনা এবং সমর্থকদের সম্পৃক্ততার ধরন পাল্টে দিয়েছে। উৎপাদন, অর্থায়ন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জনপ্রশাসনেও একই রূপান্তর ঘটছে। যে দেশ গবেষণা, ডিজিটাল অবকাঠামো, উদ্ভাবন ও মানবসম্পদে যত দ্রুত বিনিয়োগ করবে, জ্ঞানভিত্তিক বিশ্ব অর্থনীতিতে তার প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তত শক্তিশালী হবে।
আর বিশ্বকাপের সম্ভবত সবচেয়ে সহজ অথচ গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো প্রতিভা নিজে থেকে তৈরি হয় না। একটি সফল জাতীয় দলের পেছনে থাকে বছরের পর বছর তৃণমূল পর্যায়ের প্রশিক্ষণ, দক্ষ কোচিং, ক্রীড়াবিজ্ঞান, প্রতিভা অন্বেষণ এবং সুসংগঠিত প্রতিষ্ঠান।
একটি সফল অর্থনীতির ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নেই। সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য ভৌত অবকাঠামো প্রয়োজন। কিন্তু তার সঙ্গে যদি শিক্ষা, দক্ষতা, গবেষণা, প্রযুক্তি ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান তৈরি না হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো কঠিন। তরুণদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে শুধু কর্মসংস্থান সৃষ্টি নয়, তাদের এমন দক্ষতাও দিতে হবে যাতে তারা পরিবর্তিত বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতা করতে পারে।
সবশেষে বিশ্বকাপ আমাদের আরো একটি কথা মনে করিয়ে দেয়। অর্থনৈতিক সাফল্য ও মানুষের অংশগ্রহণ এক জিনিস নয়। একটি আয়োজন বিপুল আয় করতে পারে, অথচ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। একইভাবে একটি দেশের জিডিপি দ্রুত বাড়তে পারে, কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সবার কাছে না-ও পৌঁছতে পারে।
তাই উন্নয়নের প্রশ্ন শুধু কত দ্রুত অর্থনীতি বড় হচ্ছে, তা নয়। প্রশ্ন হলো, সেই প্রবৃদ্ধি কত মানুষের জন্য সুযোগ তৈরি করছে, বৈষম্য কতটা কমাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ নিজেদের সেই অগ্রযাত্রার অংশ বলে অনুভব করছে কিনা।
শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের অর্থনীতি শুধু ফুটবলের গল্প নয়। এটি ভবিষ্যতের অর্থনীতিরও গল্প—যেখানে সম্পদের উৎস শুধু কারখানা ও অবকাঠামো নয়; সৃজনশীলতা, প্রযুক্তি, প্রতিভা, ব্র্যান্ড, আস্থা এবং মানুষের সম্পৃক্ততাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের জন্য তাই চ্যালেঞ্জ শুধু প্রবৃদ্ধি বাড়ানো নয়। এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তোলা, যা হবে আরো উৎপাদনশীল ও উদ্ভাবনী, কিন্তু একই সঙ্গে আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অভিঘাতসহনশীল।
কারণ বিশ্বকাপের মতো অর্থনীতিতেও শেষ প্রশ্নটি শুধু কত অর্থ তৈরি হলো, তা নয়। প্রশ্ন হলো, সাধারণ জনগণ সেই সাফল্যের অংশ হতে পারল কিনা।
ফাহমিদা খাতুন: অর্থনীতিবিদ ও নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)


