Originally posted in কালেরকণ্ঠ on 2 October 2026
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমবারের মতো ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি বিবৃতি চালু করেছে। এই উদ্যোগ ইতিবাচক।
ছয় মাসের পরিবর্তে প্রতি তিন মাসে নীতির অবস্থান পর্যালোচনার এই উদ্যোগ এমন সময়ে এসেছে, যখন মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ, ঋণপ্রবাহ ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে। প্রথম ত্রৈমাসিক বিবৃতিতে অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০২৬ সময়ের জন্য নীতি সুদ ৯.৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এই পরিবর্তনের লক্ষ্য হলো নতুন তথ্য ও ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে মুদ্রানীতি আরো সময়োপযোগী করা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রথম ত্রৈমাসিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হলো দেশীয় ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যালোচনা করে প্রয়োজন হলে মুদ্রানীতির অবস্থান সময়মতো সমন্বয় করা।
সিদ্ধান্তটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে জুলাইয়ে ৮.৩২ এবং আগস্টে ৮.২৬ শতাংশে দাঁড়ালেও সরবরাহ ও ব্যয়জনিত ঝুঁকি রয়ে গেছে।
জ্বালানি ও সারের উচ্চমূল্য, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানির সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি এবং নতুন বেতন কাঠামোর সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যস্ফীতি আবার বাড়াতে পারে। একই সময়ে দুর্বল শিল্প উৎপাদন, ধীর বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগের মন্দা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে চাপে রেখেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আশা করছে, নিয়মিত পর্যালোচনার মাধ্যমে মূল্যস্থিতি বজায় রেখে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সহায়তা করার মধ্যে ভারসাম্য রাখা যাবে।
কমিটি দেশি-বিদেশি অর্থনৈতিক ও আর্থিক পরিবর্তন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনমতো নীতির অবস্থান ঠিক করতে চায়। বিবৃতিতে প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তার জন্য প্রণোদনা ও পুনরর্থায়ন কর্মসূচির কথাও বলা হয়েছে। তবে ত্রৈমাসিক বিবৃতির ফলে মূল্যস্ফীতি বা ঋণ কতটা কমবে বা বাড়বে, তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। বস্তুত এর ফল নির্ভর করবে নির্ভরযোগ্য তথ্য, সময়মতো সিদ্ধান্ত এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কারসহ পরিপূরক পদক্ষেপের ওপর।
বাংলাদেশ ব্যাংক আশা করছে, তারল্য পরিস্থিতির উন্নতির সঙ্গে অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়তে পারে।
তবে ব্যাংক বলেছে, মুদ্রানীতির সুদ একা প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার করতে পারবে না। উৎপাদন খাতে ঋণ পৌঁছাতে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা দূর করা, ঋণঝুঁকি কমানো এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও অবকাঠামোগত বাধা মোকাবেলা জরুরি।
এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির সাম্প্রতিক প্রবণতা থেকে দেখা যায় যে মূল্যস্ফীতির হার সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা কমলেও স্বস্তির পর্যায়ে আসেনি। ঋণ ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও দুর্বলতা রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে তিন মাস অন্তর মুদ্রানীতি পর্যালোচনার সুবিধা হলো, কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থনীতির পরিবর্তন নিয়ে লম্বা সময় নীরব থাকবে না। কিন্তু নীতি সুদ কমানো বা অপরিবর্তিত রাখার প্রভাব ঋণ ও বিনিয়োগে পৌঁছাতে সময় লাগে। নীতি সুদহার কিছুটা কমানোর পরও বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি আগস্টে ৪.৭৫ শতাংশ ছিল, যা আগের বছরগুলোর তুলনায় অনেক কম। ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি বিবৃতিতে কোন তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং কোন ঝুঁকিতে নীতি বদলাতে পারে, সেটি উল্লেখ থাকলে ব্যক্তি খাতের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সুবিধা হবে।
এ ছাড়া পূর্বাভাসের মান বাড়ানোও জরুরি। একটি নির্দিষ্ট মূল্যস্ফীতি-সংখ্যা প্রকাশের পাশাপাশি জ্বালানির দাম, বিনিময় হার, খাদ্য সরবরাহ বা সরকারি ব্যয়ের পরিবর্তনে সম্ভাব্য প্রভাব কী হতে পারে, তা দেখানো যায়। আগের পূর্বাভাস ও বাস্তব ফলের মধ্যে পার্থক্য থাকলে তার কারণ পরবর্তী বিবৃতিতে ব্যাখ্যা করা উচিত। এতে বাজার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বুঝতে পারবে কোন পরিবর্তন নতুন তথ্যের কারণে, আর কোনটি নীতির অবস্থান বদলের ইঙ্গিত।
ঋণপ্রবাহে বাধাগুলো দূর করাও জরুরি। ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ও দুর্বল শাসন, ঋণগ্রহীতার ঝুঁকি এবং বিনিয়োগে আস্থার ঘাটতি থাকলে কম নীতিসুদেও উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানে ঋণ পৌঁছাবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব বক্তব্যেও ব্যাংক পুনর্গঠন, মূলধন পুনরুদ্ধার, সুশাসন এবং ঋণ-শৃঙ্খলা জোরদারের প্রয়োজনীয়তা এসেছে।
সব শেষে, মুদ্রানীতিকে সরকারের রাজস্ব ও সরবরাহনীতির সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। সুদের হার বাড়িয়ে সামগ্রিক চাহিদা কমানো যায়, কিন্তু খাদ্য বা জ্বালানির সরবরাহজনিত মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি থামানো যায় না। খাদ্য আমদানি ও বাজারজাতকরণের বাধা কমানো, সরবরাহ পরিস্থিতি নজরে রাখা, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা—এসব পদক্ষেপও প্রয়োজন। সরকারি ঋণ ও বাজেট ঘাটতি যেন মুদ্রানীতির উদ্দেশ্যকে দুর্বল না করে, সে জন্য রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি বিবৃতি নীতি পর্যালোচনার সময় কমিয়ে অর্থনীতির পরিবর্তনের প্রতি দ্রুত সাড়া দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। এখন এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে তথ্যের সময়োপযোগিতা, পূর্বাভাসের বিশ্বাসযোগ্যতা ও সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতার ওপর। নিয়মিত পর্যালোচনা হলে এটি আশা করা যায় যে নতুন তথ্যের ভিত্তিতে ধারাবাহিক সিদ্ধান্ত ও তার যুক্তি স্পষ্ট হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগের আস্থা এবং ঋণপ্রবাহ বাড়াতে মুদ্রানীতির পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং সরকারের সরবরাহ ও রাজস্বনীতির সমন্বিত ভূমিকা অপরিহার্য।
লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সম্মাননীয় ফেলো, সিপিডি


