Tuesday, June 2, 2026
spot_img
Home CPD in the Media

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বাজেটের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত: দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

Originally posted in দেশ রুপান্তর on 2 June 2026

কী চমক দেখাবেন অর্থমন্ত্রী

দায়িত্বগ্রহণের পর থেকে নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে সরকার। এর মধ্যে বিগত সময়ে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির ফলে ভেঙেপড়া অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ সব থেকে বড়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, বিগত সময়ে শুধু ব্যাংকিং খাত থেকে চুরি হয়েছে পাঁচ লাখ কোটি টাকা। অনিয়ম, কারসাজি ও দুর্নীতির ফলে প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত পুঁজিবাজার। অর্থসংকটে বন্ধ হয়েছে শত শত কল-কারখানা। আবার বন্ধের উপক্রম উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী অনেক শিল্প। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থার ফলে জ¦ালানি সংকট ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রয়েছে উদ্বেগজনক অবস্থায়। এ থেকে উত্তরণে নির্বাচনী ইশতেহারকে গুরুত্ব দিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট পরিকল্পনা করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, যা আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে উত্থাপন করবেন তিনি। যেখানে থাকবে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কৌশল। নতুন কিছু চমকও দেখাতে হবে অর্থমন্ত্রী হিসাবে তার প্রথম এই বাজেটে। তবে বিশাল এ বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা। কারণ অর্থমন্ত্রী বলেছেন, সার্বিকভাবে অর্থনীতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে।

প্রায় ২০ বছর পর দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। তবে ৩০ বছর আগে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সময়ে দলটি এককভাবে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিল। তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এখন তার ছেলে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে দীর্ঘ দিন সরকারের বাইরে থাকায় নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে সরকারকে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাই এ সময়ে সরকারের অন্যতম দায়িত্ব।

তারা বলছেন, সরকার অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক যেসব সমস্যা মোকাবিলা করছে, এসব ঝুঁকি বা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের টেকসই পরিকল্পনা না থাকলে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এটা সমাধানে আগামী বাজেটে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার স্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকতে হবে। শুধু বাজেট প্রণয়ন করলেই হবে না, বরং ব্যয়ের দক্ষতা, প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং রাজস্ব আহরণের বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ তাদের।

সরকার আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পরিকল্পনা তৈরি করেছে। প্রস্তাবিত বাজেটে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা হতে পারে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। আর ঘাটতি হতে পারে দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। বাজেটে সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্প, সৃজনশীল অর্থনীতি, ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ড, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, খাল কাটা কর্মসূচি এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের বাজেট উত্থাপন করবেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী। সম্প্রতি বাজেট বিষয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে বাজেটের আয়-ব্যয়, কর কাঠামো, রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি, ঘাটতি বাজেট, মূল্যস্ফীতি, নবম পে-স্কেল, বিনিয়োগ, সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প, সামাজিক নিরাপত্তা, অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি ঋণের বিষয়গুলো চূড়ান্ত করা হয়েছে। সামাজিক বিভিন্ন কর্মসূচির ভাতা ও উপকারভোগী বৃদ্ধির বিষয়ে ঘোষণা থাকবে আগামী বাজেটে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন অর্থবছরের বাজেটের আকার চলতি অর্থবছরের তুলনায় এক লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি ধরে পরিকল্পনা করা হয়েছে। নতুন অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের চেয়ে এক লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা বেশি। আর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার তিন লাখ কোটি টাকা। এটি চলতি অর্থবছরের চেয়ে ৭০ হাজার কোটি টাকা বেশি এবং সংশোধিত বাজেট থেকে এক লাখ কোটি টাকা বেশি। বাজেটে ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় ধরা হতে পারে কমবেশি দেড় লাখ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হতে পারে ৭ থেকে সাড়ে ৫ শতাংশ। আর বিদ্যুৎ, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), সার, খোলাবাজারে খাদ্যপণ্য বিক্রি (ওএমএস), ফ্যামিলি কার্ড ইত্যাদি খাতে এক লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি হিসেবে রাখা হতে পারে। এ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হারের চিন্তা করা হচ্ছে ৬ থেকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ, যা চলতি অর্থবছরে ৪ থেকে ৪ দশমিক ৭ শতাংশের মধ্যে হতে পারে বলে ধারণা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং এডিবির মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো।

সম্প্রতি এক আলোচনা সভায় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দীর্ঘ সময়ের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও অস্থিরতা কাটিয়ে অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের প্রতিফলন থাকবে আগামী বাজেটে। তার ভাষ্যমতে, ‘বাজেট বড় হওয়া’ দরকার আছে, কিন্তু আমাদের যে অর্থের সংকট রয়েছে, তাও বাস্তবতা। হিসাব মেলানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

অর্থমন্ত্রী জানান, আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে এবং ধীরে ধীরে বাংলাদেশকে একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে পরিণত করাই বিএনপি সরকারের লক্ষ্য। তিনি বলেন, কত প্রবৃদ্ধি হলো, সেই ইতিহাস বলে লাভ নেই। সাধারণ মানুষের কী লাভ হলো, সেটাই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, এমন প্রবৃদ্ধির কোনো মূল্য নেই, যা মানুষের জীবনমানের উন্নতি ঘটাতে পারে না।

অর্থমন্ত্রী বলেন, দায়িত্বগ্রহণের পর সরকার ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জে পড়েছে। অর্থনীতির খারাপ অবস্থা, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবতায় ও ইরান যুদ্ধের প্রভাবে অতিরিক্ত ব্যয়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে সরকারকে। তার মতে, দায়িত্বে থাকলে চ্যালেঞ্জ থাকবে, এ থেকে উত্তরণের কৌশল নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ। এটা একা সরকার মোকাবিলা করলে হবে না, সম্মিলিতভাবে সমাধানের পথে এগিয়ে যেতে হবে। সে ক্ষেত্রে সরকার বেসরকারি খাতকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তাদের অসুবিধাগুলো দূর করার উদ্যোগ নিয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করার জন্য যে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, প্রধানমন্ত্রী সেসব বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো সে আলোকে কাজ শুরু করেছে।

অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, একদিকে অমীমাংসিত কাঠামোগত সংস্কারের অভাব এবং প্রতিকূল বৈশ্বিক পরিস্থিতি, অন্যদিকে আইএমএফের শর্ত ও জনগণের উচ্চাশা এই চতুর্মুখী চাপের মুখে দাঁড়িয়ে অর্থমন্ত্রীকে বাজেট প্রণয়ন করতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে বাজেটের মূল লক্ষ্য করা উচিত হবে। তিনি বলেন, সরকারের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা এবং বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটে যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে, সেটি বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন আছে। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বাংলাদেশ এ মুহূর্তে অর্থনৈতিক বিভিন্ন চাপের মধ্যে রয়েছে। এই সরকার অর্থনীতিকে কতটা দুর্বল অবস্থায় পেয়েছে, সেটি এখনো তারা স্পষ্ট করতে পারেনি। তারাও অন্তর্বর্তী সরকারের মতো একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করতে পারত, কিন্তু সেটি তারা করেনি। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ফ্যামিলি কার্ড, খাল খননের মতো বিষয়গুলো নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করলেও অর্থনীতি কীভাবে স্থিতিশীল হবে, সেটি নিয়ে আলোচনা খুবই সামান্য। মূল্যস্ফীতিকে কীভাবে সামাল দেবে, কর্মসংস্থান কীভাবে বাড়ানো যাবে এ বিষয়গুলোতে তারা যথাযথভাবে ফোকাস করছে না।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের মতে, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে দেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে বাস্তবভিত্তিক এবং ভবিষ্যৎমুখী করার ওপর জোর দিতে হবে। সরকার সে লক্ষ্যে কাজ করছে।

জানতে চাইলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘বাজেট এমন হওয়া প্রয়োজন, যা একদিকে অর্থনীতির বর্তমান চাপ মোকাবিলা করবে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে সহায়ক হবে। তবে কথা হচ্ছে বাজেট বাস্তবায়নে সক্ষমতা কেমন সেটি দেখতে হবে। সময়মতো প্রকল্প শেষ হচ্ছে কি না, প্রকল্পে বাড়তি ব্যয় হচ্ছে নাকি সাশ্রয়ী হচ্ছে। সে জন্য শুধু বাজেট প্রণয়ন করলেই হবে না, বরং ব্যয়ের দক্ষতা, প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং রাজস্ব আহরণের বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণে গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ ও ব্যাংক খাতের দুর্বলতার মধ্যে বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি অপচয় ও দুর্নীতি কমানোর কার্যকর উদ্যোগ থাকা জরুরি। একই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, জানতে পারলাম সরকার তিন লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এর আগে দেখা গেছে, উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সময়মতো শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না। আবার প্রকল্প পরিকল্পনায় অদক্ষতার কারণে অর্থ অপচয় হচ্ছে। ফলে নতুন সরকারকে প্রকল্প সময়সীমা ও বাস্তবায়নে বাস্তববাদী হতে হবে। যাতে উন্নয়নের নামে অর্থের অপচয় না হয়।

আরেকটি বিষয় হলো সরকারের মধ্যে অনেকে বলার চেষ্টা করছেন বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো পূর্ববর্তীদের মাধ্যমে পেয়েছে। ফলে সরকার কঠিন সময় পার করছে। এটা কথা বলার জন্য সঠিক হলেও রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক নয়। কারণ সংকট সবসময় থাকবে এবং নতুন নতুন সংকট তৈরি হবে। সেখান থেকে উত্তরণের উপায় বের করাই একটা সরকারের ভালো গুণ। ফলে অন্যের ওপর দায় চাপিয়ে বেশি দিন সুবিধা পাওয়া যাবে না।

অবশ্য সরকার বলেছে, বিগত সময়ের সমস্যা চিহ্নিত করে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাবে। এটা সরকার ভালো বলেছে। এখন দেখার বিষয় কি উদ্যোগ নিচ্ছে এবং তা কতটা অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তায় অবদান রাখছে।

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.