Friday, June 12, 2026
spot_img
Home CPD in the Media

বাজেটে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা উচ্চাকাঙ্ক্ষী: ফাহমিদা খাতুন

আজ সংসদে বাজেট পেশ

Originally posted in সমকাল on 11 June 2026

ইশতেহার বাস্তবায়নে উচ্চাভিলাষ দেখাবেন অর্থমন্ত্রী

নতুন নির্বাচিত সরকারের প্রথম জাতীয় বাজেট আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করবেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি মাথায় রেখেই তা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এবারের বাজেট সাজানো হয়েছে। বাজেটের আয়-ব্যয় কাঠামোতে উচ্চাভিলাষ দেখাবেন অর্থমন্ত্রী। বর্তমান পরিস্থিতির বিবেচনায় তা অনেকের কাছে ‘পরাবাস্তব’ মনে হতে পারে।

সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করা। সেই লক্ষ্য অর্জনের অংশ হিসেবে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বড় বাজেট ঘোষণা করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরা হচ্ছে সাড়ে ৬ শতাংশ। প্রবৃদ্ধি যেখানে তিন বছর ধরে ৪ শতাংশের আশপাশে। বিশ্বব্যাংকও আগামী অর্থবছরে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেটের ব্যয় নির্বাহে আগামী অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হচ্ছে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি। অথচ চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে রাজস্ব আদায় হয়েছে তিন লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের ধারণা, চলতি অর্থবছরে প্রকৃত রাজস্ব আদায় পাঁচ লাখ কোটি টাকার বেশি হবে না। ফলে নতুন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভেতরেও বড় বাজেটের অর্থায়ন নিয়ে সংশয়ের কথা জানা গেছে।

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রস্তাব থাকতে পারে। তবে মূল বাজেটে বাড়তি বরাদ্দ থাকছে না। অর্থ মন্ত্রণালয়

সূত্রে জানা গেছে, সংশোধিত বাজেটে বাড়তি অর্থের সংস্থান দেখানো হবে। আগামী ১ জুলাই থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের সুপারিশ করা মূল বেতনের ৫০ শতাংশ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বাকি ৫০ শতাংশ পাবেন পরের অর্থবছরে। তার পরের অর্থবছরে পাবেন তারা ভাতা, অর্থাৎ ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে বেতন-ভাতা সবই পাবেন সরকারি কর্মচারীরা।

গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন সমকালকে বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটের আকার, রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য, প্রবৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা– সব মিলিয়ে এটি একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষার বাজেট বলে মনে হচ্ছে। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এসব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সহজ হবে না। বিশেষ করে রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে এনবিআরের লক্ষ্য পূরণ খুব চ্যালেঞ্জিং। চলতি অর্থবছরেই রাজস্ব আদায়ে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। ফলে কর প্রশাসনের সংস্কার, করজাল সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ এবং করদাতাবান্ধব ব্যবস্থা দ্রুত কার্যকর না হলে এ লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে।

তিনি বলেন, বেসরকারি বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরে স্থবির রয়েছে, ব্যাংকিং খাত চাপের মধ্যে আছে, জ্বালানি ও অবকাঠামো-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা পুরোপুরি দূর হয়নি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও অনিশ্চয়তা বিদ্যমান। তাই ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। সাধারণ মানুষের জন্য উচ্চ মূল্যস্ফীতি একটি চিন্তার কারণ। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য খাদ্যপণ্যের সরবরাহ, বাজার ব্যবস্থাপনা, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে।

ফাহমিদা খাতুনের মতে, বাজেট ঘাটতি অর্থায়নের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। যদি ঘাটতি পূরণে অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ে, তাহলে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তি ও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই বৈদেশিক অর্থায়ন, ব্যাংক ঋণ, সঞ্চয়পত্র এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণের মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার বাজেটের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে জোর দিচ্ছে। এটি রাজনৈতিকভাবে স্বাভাবিক এবং প্রত্যাশিত। তবে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অর্থায়নের সক্ষমতা ও বাস্তবায়ন দক্ষতা। সামাজিক সুরক্ষা, সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা কিংবা অবকাঠামো খাতে ব্যয় বৃদ্ধি যদি উৎপাদনশীলতা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে তা দীর্ঘ মেয়াদে ইতিবাচক ফল দিতে পারে। কিন্তু রাজস্ব সক্ষমতা না বাড়িয়ে ব্যয় সম্প্রসারণ করা হলে বাজেট ঘাটতি, ঋণের চাপ এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়তে পারে। ফলে সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হবে নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা– এই দুইয়ের মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য বজায় রাখা।

অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তব্যে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাজেটে অর্থনীতির পুনর্গঠন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যাংক ও আর্থিক খাত সংস্কার, পুঁজিবাজার উন্নয়ন, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ এবং অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। এ ছাড়া কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার কর্মপরিকল্পনা, সুনীল অর্থনীতির বিকাশ, যোগাযোগ ও পরিবহন অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির রূপরেখাও বাজেট বক্তৃতায় তুলে ধরা হবে। সব মিলিয়ে সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের রূপরেখা নির্ধারণে এবারের বাজেটকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

যেমন হচ্ছে বাজেটের আকার
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ বাড়িয়ে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার। চলতি অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা।

বিশাল ব্যয়ের সংস্থান করতে আগামী অর্থবছরে মোট ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে সংগ্রহের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকা। বাকি ৯১ হাজার কোটি টাকা আসবে এনবিআর-বহির্ভূত বিভিন্ন উৎস থেকে। রাজস্ব আয়ের বাইরে বাজেট ঘাটতি মেটাতে দেশি ও বিদেশি উৎস থেকে মোট দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

অন্যদিকে, আগামী অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে এর মধ্যে এক লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকাই ‘থোক বরাদ্দ’ হিসেবে সংরক্ষিত থাকবে, যা বাংলাদেশের বাজেট ইতিহাসে নজিরবিহীন। তুলনামূলকভাবে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে থোক বরাদ্দ ছিল মাত্র ১০ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা। ফলে এডিপির বাস্তবায়ন, প্রকল্প নির্বাচন এবং ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন ও আলোচনা তৈরি হয়েছে।

সামাজিক নিরাপত্তায় এগিয়ে ফ্যামিলি কার্ড
দারিদ্র্য হ্রাস এবং শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা বিএনপি সরকারের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী অঙ্গীকার। এর অংশ হিসেবে সরকার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি চালু করেছে। আগামী অর্থবছরে এ কর্মসূচির আওতায় ৪১ লাখ মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। নারীপ্রধান পরিবারগুলোকে মাসে দুই হাজার ৫০০ টাকা করে সহায়তা দেওয়া হবে। এ খাতে আগামী অর্থবছরে ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা।

একইভাবে ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির পরীক্ষামূলক কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। প্রথম ধাপে ২০ হাজার কৃষককে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণ করা হবে। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে আগামী অর্থবছরে মোট বরাদ্দ বাড়িয়ে এক লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা করা হচ্ছে, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। পাশাপাশি প্রথমবারের মতো আটটি নতুন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি যুক্ত করা হচ্ছে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে গুরুত্ব বাড়ছে
নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী শিক্ষা খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হচ্ছে। আগামী অর্থবছরে এ খাতে মোট এক লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে, যা জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে এ বরাদ্দ ছিল ৯৭ হাজার ৮০৫ কোটি টাকা। সরকারের লক্ষ্য প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দক্ষতাভিত্তিক করা। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু বরাদ্দ বৃদ্ধি নয়, বরং বরাদ্দের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ। আগামী অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে মোট ৬৯ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে, যা চলতি অর্থবছরের ৩৪ হাজার ৭১৯ কোটি টাকার প্রায় দ্বিগুণ।

ব্যবসা পরিচালনা সহজ করতে সংস্কার
বেসরকারি খাতের উন্নয়নে সার্বিক নীতিগত সুবিধা প্রদান ও লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজীকরণ করার অঙ্গীকার দেওয়া হয় নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে। এর অংশ হিসেবে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংস্কার আনার ঘোষণা থাকছে বাজেটে। নতুন ব্যবস্থায় লাইসেন্স বা অনুমোদনের আবেদন জমা দেওয়ার সাত দিনের মধ্যে সাময়িক অনুমতি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চূড়ান্ত লাইসেন্স দিতে ব্যর্থ হলে সেটিকে স্বয়ংক্রিয় অনুমোদন হিসেবে গণ্য করা হবে। বিভিন্ন লাইসেন্স ও অনুমতির মেয়াদ পাঁচ বছর করার প্রস্তাবও থাকছে। অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় ‘ডিরেগুলেশনের মাধ্যমে ব্যবসা সহজীকরণ’ নামে একটি পৃথক অধ্যায় যুক্ত করা হয়েছে, যেখানে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে বিভিন্ন নীতিগত সংস্কারের ঘোষণা থাকবে।

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.