Originally posted in বাংলাদেশ প্রতিদিন on 22 July 2026
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, ভারত থেকে বাংলাদেশের আমদানি করলেও লাভ, রপ্তানি করলেও লাভ। সে কারণে দেশটির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য স্বাভাবিক রাখা উচিত। গতকাল বিকালে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে সেলফোনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। বিগত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ভারতের রপ্তানি ১৬ বিলিয়ন ডলার থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নানামাত্রিক বাধার মুখে পড়েছে। এসব বিষয়ে সিপিডির সম্মাননীয় এই ফেলো বলেন, ২০২১ সালের দিকে নানা কারণে আমদানি পণ্যের দাম বেড়ে যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে ওই সময় ভারত যে ১৬ বিলিয়ন ডলার বাণিজ্য করেছে বাংলাদেশে, এর পেছনে ‘প্রাইস ইফেক্ট’ কাজ করেছে। এই ‘প্রাইস ইফেক্ট’ বাদ দিলে বাংলাদেশে ভারতের বাণিজ্য কমার পেছনে অন্য যে কারণগুলো রয়েছে- তার মধ্যে ইম্পোর্ট ডাইভারসিফিকেশনের বিষয় আছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ অন্য জায়গা থেকে আমদানি করছে।
ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ভালোবেসে তো কেউ আমদানি করে না, প্রতিযোগিতার বিচারে বেসরকারি খাত পণ্য আমদানি সূত্র বেছে নেয়। ভারত সময় সময় বিভিন্ন পণ্যে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। কখনো চাল, কখনো পিঁয়াজে। বাংলাদেশ ওইসব পণ্যের চাহিদা মেটাতে বিকল্প গন্তব্য থেকে আমদানির পথ বেছে নিয়েছে। আবার (ভারত থেকে) স্থলপথে সুতা আমদানিও বন্ধ রেখেছে বাংলাদেশ। এসব কারণেও ভারতের রপ্তানি বাণিজ্য কিছুটা সক্ষমতা হারিয়েছে। অন্যদিকে তারাও (ভারতও) স্থলপথে কিছু পণ্য আমদানি বন্ধ রেখেছে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য হ্রাস পেয়েছে এসব কারণেই।
রাজনৈতিক সংকটের কারণে বাণিজ্যে স্থবিরতার বিষয়ে অর্থনীতির এই অধ্যাপক বলেন, ভারত থেকে আমদানি করে বেসরকারি খাত; রপ্তানিও করে বেসরকারি খাত। দেশটি থেকে যদি প্রতিযোগিতামূলক দরে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি করা যায়, তবে রপ্তানি খাতে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকব আমরা। ভারত থেকে আমদানির ফলশ্রুতিতে ভোক্তা কল্যাণ বৃদ্ধি পায় এবং আমদানি প্রতিস্থাপন ও রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা শক্তিশালী হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশের আমদানি বাড়লে ভারতেরও বাণিজ্য বাড়ে। এখন দুই পক্ষের মধ্যে এই লাভজনক বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে গেলে উভয় পক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। কিছু নন-ট্যারিফ বাধা আছে সেগুলো দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। আমরা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য যত উন্মুক্তভাবে করতে পারি ততই ভালো।
দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের আলোচনা বন্ধ চার বছর ধরে। হচ্ছে না যৌথ বাণিজ্য কমিশনের বৈঠকও। এ পরিস্থিতিতে বাণিজ্য গতি আনতে- কূটনৈতিক যোগাযোগের ওপর গুরুত্ব দিয়ে ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এত কিছুর পরও ভারত বাংলাদেশকে শূন্য শুল্ক সুবিধা (জিরো ট্যারিফ) দিচ্ছে ২০১১ সাল থেকে। এর সুফল পেয়েছে বাংলাদেশ। ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি ১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে ৪০ বছর লেগেছিল। জিরো ট্যারিফ সুবিধার কারণে ২০১৭ সালে ১ বিলিয়ন ডলার বাণিজ্য পরবর্তী ৫ বছরে, ২০২২ সালে সেটি দ্বিগুণ বেড়ে ২ বিলিয়ন ডলার হয়। এ সুবিধা কীভাবে আরও কাজে লাগানো যায় সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া উচিত। এ ছাড়া আগামী সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের এলডিসি সুবিধা নিয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যে ভোটাভুটি হবে- সেখানে ভারত, চীনসহ বিভিন্ন দেশ ভোট দেবে। আমাদের প্রয়োজনেই এ দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়াতে হবে। ভারতে আমরা যে শূন্য শুল্ক পাচ্ছি সেই সুবিধা আরও সম্প্রসারণ করতে- অর্থাৎ এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তীতে শূন্য শুল্ক সুবিধা সম্প্রসারণের আলোচনায় ভারতের সঙ্গেও আলোচনা শুরু করতে পারি- যেমনটা করেছি ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও চীনের সঙ্গে। মর্যাদার ভিত্তিতে, উইন-উইন সিচুয়েশন থেকে ভারতের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে আমরা যদি প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়াতে পারি, সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক করতে পারি- তবে সেটিও আমাদের বাণিজ্যের জন্য লাভজনক হবে।


