Originally posted in কালের কন্ঠ on 18 August 2026
বর্তমান সরকারের প্রথম ছয় মাসের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে শুধু সাফল্য বা ব্যর্থতার সরল মাপকাঠিতে বিচার করলে বাস্তব চিত্রটি ধরা পড়বে না। সরকার এমন একসময় দায়িত্ব নিয়েছে, যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল রাজস্ব আদায়, ব্যাংক খাতের গভীর সংকট, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং জ্বালানি খাতের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল।
এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের ফলে গত ছয় মাসে কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষ করে রাজনৈতিক অস্থিরতা কমেছে, কিন্তু অর্থনীতির মূল চলকগুলোতে এখনো প্রত্যাশিত গতি দেখা যাচ্ছে না।
সরকারের প্রথম ছয় মাসে অর্থনীতি ও নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে কয়েকটি ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা গেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। বিশেষ করে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির ফলে বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থান শক্তিশালী করতে সহায়তা করেছে।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করেছে, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। বাজেটে বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, শিল্প সম্প্রসারণ ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আরেকটি সময়োপযোগী উদ্যোগ ছিল বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর অনুরোধ জানানো। তবে, মূল্যস্ফীতি এখনো অনেক বেশি।
জুলাই মাসে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ঘর থেকে ৮ শতাংশের ঘরে নেমে আসা স্বস্তির একটি সংকেত। কিন্তু এর সুফল সাধারণ মানুষ এখনো সেভাবে অনুভব করছে না। কারণ মূল্যস্ফীতি কমা আর পণ্যের দাম কমা এক বিষয় নয়; দাম এখনো বাড়ছে, শুধু বৃদ্ধির গতি কিছুটা কমেছে। গত কয়েক বছরে খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা যে পরিমাণ ক্ষয় হয়েছে, তা এক-দুই মাসের নিম্নমুখী মূল্যস্ফীতিতে পুনরুদ্ধার হবে না। তাই সামনের দিনে মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানের পাশাপাশি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও প্রকৃত আয়ের দিকেও সমান নজর দিতে হবে।
এই মুহূর্তে অর্থনীতির সবচেয়ে বড় তাৎক্ষণিক ঝুঁকি জ্বালানিসংকট। এর পেছনে সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সরবরাহ পরিস্থিতি ও এলএনজি অবকাঠামোর সমস্যার ভূমিকা থাকলেও সংকটটির মূল ভিত্তি তৈরি হয়েছে অনেক আগে। পূর্ববর্তী রাজনৈতিক সরকারের সময় দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না করে আমদানিনির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে; প্রাথমিক জ্বালানির নিশ্চয়তা ছাড়াই বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারিত হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি দক্ষতা ও সঞ্চালন অবকাঠামো যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। ফলে উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানির অভাবে অনেক কেন্দ্র পূর্ণ ক্ষমতায় চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
বর্তমান সরকার এই সমস্যা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে এটি সত্য। কিন্তু এখন সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত রপ্তানিমুখী শিল্প, কৃষি ও জরুরি সেবায় জ্বালানি সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং শিল্পকে সরবরাহ পরিস্থিতি সম্পর্কে আগাম তথ্য দেওয়া। পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, এলএনজির উৎস বৈচিত্র্য, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য ও জ্বালানি দক্ষতা নিয়ে একটি বাস্তবায়নযোগ্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। শুধু আরো বেশি জ্বালানি আমদানি করে বর্তমান ঘাটতি সাময়িকভাবে সামলানো যাবে; কিন্তু জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না।
অর্থনীতির দ্বিতীয় বড় উদ্বেগ বিনিয়োগ। জুনে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪.৪৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যা রেকর্ড সর্বনিম্ন। বিনিয়োগ শুধু ঋণের প্রাপ্যতা বা সুদহারের ওপর নির্ভর করে না। একজন উদ্যোক্তা নতুন কারখানা বা ব্যবসা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জানতে চান গ্যাস-বিদ্যুৎ পাবেন কি না, বাজারে চাহিদা থাকবে কি না, কর ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কতটা পূর্বানুমানযোগ্য এবং ব্যবসা নিরাপদে পরিচালনা করা যাবে কি না।
ব্যাংক খাতেও সংস্কারের কিছু উদ্যোগ ইতিবাচক। সম্পদের গুণগত মান পর্যালোচনা, খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র বের করা এবং দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠনের উদ্যোগ প্রয়োজনীয় ছিল। কিন্তু সংস্কারের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করবে দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার ওপর। আমানতকারীদের অবশ্যই সুরক্ষা দিতে হবে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে অসৎ মালিক বা ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের ক্ষতির দায় জনগণ বহন করবে।
ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো কর্মসূচি সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের দৃশ্যমান প্রচেষ্টা। তবে সতর্ক থাকতে হবে যাতে রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি কিংবা ভুল তথ্যের কারণে অযোগ্য ব্যক্তি অন্তর্ভুক্ত হলে এবং প্রকৃত দরিদ্র মানুষ বাদ না পড়ে।
আগামী ছয় মাস তাই সরকারের জন্য আরো গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচিত সরকার দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার বাস্তবায়নের রাজনৈতিক বৈধতা পেয়েছে; এখন সেই সুযোগকে অর্থনৈতিক ফলাফলে রূপান্তর করতে হবে। অগ্রাধিকারের তালিকা খুব দীর্ঘ করার প্রয়োজন নেই। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা, মূল্যস্ফীতির চাপ আরো কমানো, বিনিয়োগে আস্থা ফেরানো, ব্যাংক সংস্কারে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং রাজস্ব আহরণ বাড়ানোসহ কয়েকটি ক্ষেত্রে পরিমাপযোগ্য অগ্রগতি দরকার।
সরকারের ছয় মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হচ্ছে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্থবহ করতে হবে। বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, উৎপাদন সচল ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। আর মানুষের প্রকৃত আয় বাড়াতে হবে এবং জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে হবে। আগামী ছয় মাসে সরকার অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কতখানি সংস্কার কার্যকর করতে পারবে, তার ওপরই সাফল্যের মাত্রা নির্ভর করবে।
লেখক : অর্থনীতিবিদ এবং সিপিডির নির্বাহী পরিচালক


