নবায়নযোগ্য জ্বালানিই হতে পারে সংকট মোকাবিলার টেকসই সমাধান – ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম

Originally posted in জাগোনিউজ২৪ on 30 August 2026

বাংলাদেশের প্রচলিত গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থা সংকটে পড়েছে। অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ছে না, বরং উৎপাদন কমছে। এ অবস্থায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগিয়ে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তারমতে, শিল্পকারখানা, সরকারি ভবন, বাসাবাড়ি ও কৃষিতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ হতে পারে বাংলাদেশের জন্য টেকসই সমাধান। এজন্য এখনই বাস্তবসম্মত নীতি প্রণয়ন, বিনিয়োগে প্রণোদনা ও দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।

বর্তমান জ্বালানি সংকট ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা নিয়ে জাগো নিউজের বিশেষ সংবাদদাতা ইব্রাহীম হুসাইন অভির সঙ্গে কথা বলেছেন খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

জাগো নিউজ: দেশের বর্তমান জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে?

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম: দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাসের মজুত কমে আসছে। দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস অনুসন্ধানও পর্যাপ্তভাবে হয়নি। একই সঙ্গে আমদানিনির্ভর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহও সব সময় নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা, পরিবহন, বাসাবাড়ি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়ছে।

এ অবস্থায় বিকল্প জ্বালানি উৎস তৈরির কোনো বিকল্প নেই। নবায়নযোগ্য জ্বালানি সেই বিকল্পের অন্যতম বড় পথ। সৌরবিদ্যুৎ বাড়াতে পারলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর চাপ কমবে। একই সঙ্গে শিল্পকারখানা, কৃষি ও বাসাবাড়িতে ছোট পরিসরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রচলিত জ্বালানির ব্যবহারও কমানো সম্ভব।

জাগো নিউজ: বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের বাইরে কোথাও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব?

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম: শিল্পকারখানার ছাদ, বাসাবাড়ি, কৃষিজমি ও সরকারি ভবন- সব জায়গাতেই এর সুযোগ রয়েছে। অনেক শিল্পকারখানা এরই মধ্যে তাদের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করেছে, এতে তারা নিজেদের মোট জ্বালানি চাহিদার ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয় করতে পারছে।

আমরা সিপিডির একটি গবেষণায় দেখিয়েছি, শুধু তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের কারখানাগুলোর ছাদ ব্যবহার করে প্রায় এক হাজার ৭৬৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এ বিদ্যুৎ উৎপাদন হলে একই পরিমাণ বিদ্যুতের জন্য গ্যাস বা ডিজেল ব্যবহারের প্রয়োজন কমবে।

কৃষিতেও বড় সম্ভাবনা রয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে সেচব্যবস্থা চালানো যেতে পারে। আবার বিদ্যুৎ উৎপাদনের অতিরিক্ত অংশ জাতীয় গ্রিডে দেওয়ার জন্য পরিমাপকভিত্তিক বিদ্যুৎ বিনিময় ব্যবস্থা ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে কৃষিতে ডিজেলের ব্যবহারও কমানো সম্ভব।

জাগো নিউজ: তাহলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রধান বাধা কোথায়?

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম: বড় বাধাগুলোর একটি হলো অনুমোদন প্রক্রিয়া। বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত অনুমতি দিতে হবে। কিন্তু বাস্তবে বিভিন্ন অজুহাতে অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদন প্রক্রিয়া ধীর করা হচ্ছে। কোথাও দুর্নীতি ও ঘুষের অভিযোগ রয়েছে।

এর সঙ্গে স্বার্থের একটি বিষয়ও আছে। বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রচলিতভাবে গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহের মাধ্যমে একটি কমিশন পায়। কিন্তু কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিজেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করে গ্রিডে দিলে তাদের সেই আয় কমে যায়। ফলে কোথাও কোথাও অনুমোদন ধীর করার বা অতিরিক্ত মাশুল আরোপের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

এ ধরনের প্রতিবন্ধকতা দ্রুত দূর করতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির অনুমোদন ও গ্রিড সংযোগকে সহজ ও দ্রুত করতে হবে।

জাগো নিউজ: নবায়নযোগ্য জ্বালানি পণ্যে করব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত?

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম: সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি, মাউন্টিং স্ট্রাকচারসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির সরঞ্জামে দীর্ঘমেয়াদি, সহজ ও অভিন্ন করনীতি প্রয়োজন। বর্তমানে পণ্যের ধরন ও এইচএস কোডভেদে শুল্ক-কর কাঠামোর পার্থক্য ব্যবসা ও বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।

সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে সরাসরি ব্যবহৃত পণ্য ও যন্ত্রাংশে শূন্য শতাংশ আমদানি শুল্ক রাখা যেতে পারে। একই সঙ্গে রেগুলেটরি ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক, অগ্রিম আয়করসহ অন্যান্য আমদানি কর প্রত্যাহার করা এবং ভ্যাটমুক্ত রাখা উচিত। স্থানীয় উৎপাদনকারীদের জন্য কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ ও উৎপাদন-যন্ত্র আমদানিতেও সমান বা আরও বেশি কর সুবিধা দেওয়া উচিত।

এতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রাথমিক বিনিয়োগ ব্যয় কমবে, বাজার সম্প্রসারিত হবে এবং স্থানীয় উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়বে। পাশাপাশি নীতির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে উদ্যোক্তারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

জাগো নিউজ: সরকারি ভবনগুলোতে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের বিষয়ে আপনার পরামর্শ কী?

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম: সরকারকে জাতীয় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ কর্মসূচিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। সারাদেশে সরকারের ৪৮ হাজারের বেশি ভবন রয়েছে। এসব ভবনের ছাদ ব্যবহার করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ দ্রুত শেষ করা দরকার। এতে সরকারি বিদ্যুৎ ব্যয় কমবে এবং একই সঙ্গে দেশে সৌরবিদ্যুতের একটি বড় বাজার তৈরি হবে।

জাগো নিউজ: নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্পের অনুমোদনের ক্ষেত্রেও কী অগ্রগতি দরকার?

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম: অবশ্যই। নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ৫৫টি দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ১২টির লাইসেন্স ও চুক্তি দেওয়া হয়েছে। বাকি প্রকল্পগুলোর চুক্তিও দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। শুধু দরপত্র আহ্বান করলেই হবে না, প্রকল্প বাস্তবায়নের পরবর্তী ধাপগুলোও দ্রুত শেষ করতে হবে।

জাগো নিউজ: তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ আসতে সময় লাগবে। স্বল্পমেয়াদে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় কী করা উচিত?

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম: নবায়নযোগ্য জ্বালানি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু স্বল্পমেয়াদে অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান ও এরই মধ্যে আবিষ্কৃত গ্যাস দ্রুত জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে।

যেমন শ্রীকাইল ও টেংরাটিলায় পাওয়া গ্যাস দ্রুত গ্রিডে যুক্ত করা গেলে গ্যাসের ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব। ভোলায় পাওয়া গ্যাসও জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা গেলে বড় ধরনের সাশ্রয় হবে। একই সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগ বন্ধ করতে হবে। এতে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ ও গ্যাস বৈধ গ্রাহকদের জন্য উন্মুক্ত হবে, সরবরাহ পরিস্থিতি ততটাই উন্নত করা সম্ভব।

জাগো নিউজ: নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে অর্থায়ন ও করব্যবস্থার ক্ষেত্রে কী করা দরকার?

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম: সরকার এবারের বাজেটে করসংক্রান্ত বেশ কিছু জটিলতা দূর করার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে আরও কিছু বিষয়ে প্রজ্ঞাপন ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় পরিবর্তন প্রয়োজন।

আমার প্রস্তাব হলো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য অন্তত পাঁচ বছরের একটি বিশেষ বিনিয়োগ-সুবিধা ব্যবস্থা তৈরি করা। এই সময়ে যারা নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ করতে চান, তাদের জন্য বিনিয়োগ প্রক্রিয়া, করব্যবস্থা, অর্থায়ন, অনুমোদন ও লাইসেন্স— সবকিছু সহজ করতে হবে।

এটি স্বাভাবিক সময়ের নীতিতে করা যাবে না। আমরা এখন জ্বালানি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। তাই সংকটকালীন ব্যবস্থা হিসেবে পাঁচ বছরের একটি বিশেষ সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। বিনিয়োগকারীদের জন্য যদি বড় ধরনের জটিলতা না থাকে, তাহলে বিনিয়োগকারী ও অর্থায়নকারী- দুই পক্ষই দ্রুত এগিয়ে আসবে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির বাস্তবায়নও ত্বরান্বিত হবে।

জাগো নিউজ: বাংলাদেশে জমির সংকটকে অনেক সময় নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের বড় বাধা বলা হয়। আপনি কি তা মনে করেন?

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম: এখন বিষয়টি শুধু জমির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা ঠিক হবে না। আমাদের কাছে জমির পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ ব্যবহারযোগ্য জায়গা বা ছাদ রয়েছে। তাই শুধু বড় জমি খুঁজে অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই।

শিল্পকারখানার ছাদ, বাসাবাড়ি, কৃষি ও সরকারি ভবন- এসব জায়গাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। যেখানে বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য জমি পাওয়া সম্ভব, সেখানে সরকার কাজ করবে। কিন্তু জমির সংকটকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক হবে না।

জাগো নিউজ: আপনার মতে, বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপগুলো কী?

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম: প্রথমত, শিল্পকারখানা, কৃষি, বাসাবাড়ি ও সরকারি ভবনে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার দ্রুত বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়ার সুযোগ সহজ করতে হবে এবং অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত করতে হবে। তৃতীয়ত, দরপত্র হয়ে যাওয়া নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে।

চতুর্থত, নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য পাঁচ বছরের বিশেষ বিনিয়োগ ও কর-সুবিধা দিতে হবে। পঞ্চমত, অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান ও এরই মধ্যে আবিষ্কৃত গ্যাস দ্রুত ব্যবহারের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে অবৈধ গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বর্তমান সংকটকে স্বাভাবিক সময়ের মতো পরিচালনা করলে চলবে না। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

জাগো নিউজ: আপনার ব্যস্ততার মধ্যেও সময় দেওয়ার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম: আপনাকে ও জাগো নিউজকে ধন্যবাদ।

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.