অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি – নাজনীন আহমেদ

Originally posted in বাংলাদেশ প্রতিদিন on 15 September 2026

ড. নাজনীন আহমেদ বাংলাদেশের অর্থনীতি ও উন্নয়ন গবেষণার অভিজ্ঞ গবেষক ও বিশ্লেষক বিআইডিএসে ২৫ বছর এবং ইউএনডিপিতে পাঁচ বছর কাজের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক, আইএলও, আইএফসি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেছেন। গত ১ সেপ্টেম্বর তিনি সিপিডির নির্বাহী পরিচালক হিসেবে যোগ দিয়েছেন

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ বলেছেন, বর্তমান অর্থনীতি একটি নাজুক স্থিতিশীলতার পর্যায়ে রয়েছে। সামষ্টিক অর্থনীতির কয়েকটি সূচকে আগের তুলনায় কিছুটা উন্নতি হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কিছুটা কমেছে, রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী হয়েছে এবং সামগ্রিক বৈদেশিক খাতের অবস্থানেও কিছুটা স্বস্তি এসেছে। তবে অর্থনীতির অন্তর্নিহিত দুর্বলতাগুলো এখনো গভীর। আমার বিবেচনায় সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের দুর্বলতা, ব্যাংকিং খাতের সংকট এবং রাজস্ব আহরণের সীমিত সক্ষমতা।

তিনি বলেন, বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় কাঠামোগত সমস্যা। শুধু অর্থায়নের অভাব দিয়ে এটি ব্যাখ্যা করা যাবে না। নীতিগত অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদের হার, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, নিয়ন্ত্রক জটিলতা এবং ব্যবসার উচ্চ ব্যয়-সবকিছুই এর পেছনে ভূমিকা রাখছে। সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ও নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে নাজনীন বলেন, বড় বিনিয়োগ পাঁচ, দশ বা পনেরো বছরের জন্য করা হয়। করনীতি, শুল্কনীতি, জ্বালানির মূল্য, বৈদেশিক মুদ্রার প্রাপ্যতা কিংবা নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্ত ঘন ঘন পরিবর্তিত হলে বিনিয়োগকারীরা স্বাভাবিকভাবেই নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক হন। তাই সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ও নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে, ব্যাংকিং খাতকে সুস্থ করে উৎপাদনশীল ও ভালো উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে হবে এবং ব্যবসা শুরু করা থেকে জমি, জ্বালানি, কর, কাস্টমস ও মুনাফা প্রত্যাবাসন পর্যন্ত পুরো নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়াকে সহজ, স্বচ্ছ ও সময়বদ্ধ করতে হবে।

ছোট ও মাঝারি শিল্পের ওপর এই চাপ তুলনামূলকভাবে বেশি জানিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, শিল্প খাত বর্তমানে একই সঙ্গে উচ্চ উৎপাদন ব্যয় এবং সরবরাহের অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। শুধু গ্যাস বা বিদ্যুতের দাম নয়, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়াও অনেক ক্ষেত্রে বড় সমস্যা। এর সঙ্গে রয়েছে উচ্চ সুদের হার, আমদানি করা কাঁচামালের ব্যয় এবং বিনিময় হারের প্রভাব। এসবের সম্মিলিত প্রভাবে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, উৎপাদন সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার করা যাচ্ছে না এবং নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যাচ্ছে। ছোট ও মাঝারি শিল্পের ওপর এই চাপ তুলনামূলকভাবে বেশি।

তিনি বলেন, আমার বিবেচনায় এই মুহূর্তে শিল্প উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো অনিশ্চয়তা। একজন উদ্যোক্তা একটি নির্দিষ্ট উচ্চ মূল্যকে ব্যবসায়িক পরিকল্পনার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন। কিন্তু আগামী মাসে গ্যাস কতটা পাওয়া যাবে, বিদ্যুৎ সরবরাহ কেমন থাকবে, ঋণের খরচ কোথায় যাবে কিংবা কাঁচামাল আমদানির পরিস্থিতি কী হবে-এসব যদি অনুমান করা না যায়, তাহলে নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাই শিল্পের জন্য নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ এবং একটি পূর্বানুমানযোগ্য নীতিপরিবেশ অত্যন্ত জরুরি।

নাজনীন আহমেদ বলেন, ব্যাংকিং খাতের সমস্যা এখন আর শুধু ব্যাংকিং খাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি সামষ্টিক অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও উন্নয়নের সমস্যায় পরিণত হয়েছে। একটি দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভালো উদ্যোক্তাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। ব্যাংকের সম্পদের বড় অংশ খেলাপি ঋণে আটকে থাকলে উৎপাদনশীল নতুন উদ্যোক্তারা পর্যাপ্ত ঋণ পান না অথবা বেশি ব্যয়ে ঋণ নিতে বাধ্য হন। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ওপর। সংস্কারের প্রথম ধাপ হওয়া উচিত সমস্যার প্রকৃত আকার স্বীকার করা এবং বিশ্বাসযোগ্য অ্যাসেট কোয়ালিটি অ্যাসেসমেন্ট করা। এরপর ব্যাংকভেদে পৃথক সমাধানকৌশল নিতে হবে। কোথাও পুনর্মূলধনীকরণ, কোথাও পুনর্গঠন বা একীভূতকরণের প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে ঋণ প্রদানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষকে অনিয়মতান্ত্রিক ঋণ প্রদান বন্ধ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের সবচেয়ে বড় শক্তি নিঃসন্দেহে তৈরি পোশাক শিল্প। গত কয়েক দশকে এই খাত রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান-বিশেষ করে নারীর কর্মসংস্থান এবং শিল্পায়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে একটি মাত্র খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা আমাদের রপ্তানি কাঠামোর বড় দুর্বলতাও। আগামী দিনে শুধু কম উৎপাদন ব্যয় বা সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করে এই খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা সম্ভব হবে না। উচ্চমূল্য সংযোজনকারী ও আরও উন্নত পণ্যের দিকে যেতে হবে। বিশেষ করে ম্যান-মেড ফাইবার ও নন-কটন অ্যাপারেল, ফাংশনাল ও টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, ডিজাইন এবং পণ্য উন্নয়নে সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে অটোমেশন ও প্রযুক্তি গ্রহণ, শ্রমিকের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, জ্বালানি দক্ষতা, লিড টাইম হ্রাস এবং লজিস্টিকস সক্ষমতার উন্নয়ন জরুরি।

কর্মসংস্থানের বিষয়টি এখন শুধু বেকারত্বের প্রশ্ন নয়। কী ধরনের কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে, তার উৎপাদনশীলতা ও আয় কতটা এবং তরুণদের শিক্ষা ও দক্ষতার সঙ্গে অর্থনীতির চাহিদার কতটা সামঞ্জস্য রয়েছে-এসবও দেখতে হবে। অনেক তরুণ দীর্ঘ সময় শিক্ষা গ্রহণের পরও উপযুক্ত কাজ পাচ্ছেন না, আবার অনেক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী পাচ্ছে না। এই দক্ষতার অমিল দূর করা জরুরি। শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারীও তৈরি করতে হবে। তরুণদের স্টার্টআপ ও উদ্ভাবনী ব্যবসা গড়ে তোলার জন্য সহজ অর্থায়ন, মেন্টরিং, ইনকিউবেশন, প্রযুক্তি সহায়তা এবং সহজ নিয়ন্ত্রক পরিবেশ প্রয়োজন। আগামী দিনের শ্রমবাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বড় পরিবর্তন আনবে। বড় অভ্যন্তরীণ বাজার, প্রতিযোগিতামূলক শ্রমশক্তি এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থান থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ সম্ভাবনার তুলনায় এখনো অনেক কম বিদেশি আকর্ষণ করছে। দুর্বল অবকাঠামো, উচ্চ লজিস্টিকস ব্যয়, অনির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ এবং উচ্চ ব্যবসা ব্যয় নিয়ে টিকে থাকা কঠিন। তাই বন্দর ও লজিস্টিকস দক্ষতা, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, কাস্টমস আধুনিকায়ন, ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন, চুক্তি বাস্তবায়ন, করব্যবস্থা এবং নিয়ন্ত্রক পূর্বানুমানযোগ্যতা উন্নত করতে হবে। আগামী দুই থেকে তিন বছর বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একদিকে রয়েছে বড় অভ্যন্তরীণ বাজার, তরুণ জনগোষ্ঠী, শক্তিশালী রপ্তানি ও রেমিট্যান্স ভিত্তি, উদ্যোক্তা সক্ষমতা এবং দ্রুত প্রযুক্তি গ্রহণের সম্ভাবনা। অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ঘাটতি, রাজস্ব আহরণের দুর্বলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক ভূ-অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বড় ঝুঁকি হিসেবে রয়েছে। তাই আগামী দিনের অর্থনৈতিক নীতিতে শুধু প্রবৃদ্ধির হার নয়, প্রবৃদ্ধির গুণগত মান, স্থায়িত্ব এবং ন্যায্যতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের উন্নয়নের লক্ষ্য শুধু জিডিপি বৃদ্ধি নয়। এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে প্রবৃদ্ধি উৎপাদনশীল ও কর্মসংস্থানমুখী, প্রযুক্তির ব্যবহার কৌশলগত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং উন্নয়নের সুযোগ ও সুফল সমাজের বৃহত্তর অংশের কাছে ন্যায্যভাবে পৌঁছায়।

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.