Originally posted in বণিকবার্তা on 17 September 2026

বর্তমান ঋণ চাপের পেছনে একাধিক সংকট একসঙ্গে কাজ করেছে। মহামারীর সময় অনেক দেশের ঋণ আগে থেকেই বেশি ছিল। এরপর স্বাস্থ্যসেবা, মানুষের আয় সহায়তা এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে তাদের আরো ঋণ নিতে হয়।
২০০৮-০৯ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর এক দশকেরও বেশি সময় ধরে উন্নত দেশগুলো সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করে বাজারে প্রচুর অর্থের জোগান দিয়েছিল। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সুদের হার ছিল খুবই কম এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোও কম খরচে ঋণ নিতে পেরেছিল। এ ঋণ তারা অবকাঠামো নির্মাণ, সামাজিক কর্মসূচি এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় ব্যবহার করেছে।
কিন্তু করোনা মহামারী ও ইউক্রেন যুদ্ধের পর সস্তা ঋণের সেই সময় শেষ হয়ে যায়। বিশ্ববাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে মূল্যস্ফীতি তীব্র হয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ২০২১-২২ সালের দিকে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্রুত সুদের হার বাড়ায়। ২০২৩-২৫ সময়ে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও অনেক দেশে তা লক্ষ্যমাত্রার ওপরে ছিল। ২০২৬ সালে জ্বালানির উচ্চ মূল্য ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা আবারো মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াচ্ছে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোয় বড় বাজেট ঘাটতি, ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ এবং ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে এ দেশগুলোর ঋণের খরচও এখন বেশি। ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে পুরনো ঋণ পরিশোধের জন্য নতুন ঋণ নেয়া এবং ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধ—দুই ক্ষেত্রেই বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে উন্নত দেশের তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ থেকে বেশি মুনাফা পাওয়া যাচ্ছে বলে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ বাজার থেকে সরে যাচ্ছেন। ফলে দরিদ্র দেশগুলোকে অর্থ আকর্ষণ করতে আরো বেশি সুদ দিতে হচ্ছে।
বর্তমান ঋণ চাপের পেছনে একাধিক সংকট একসঙ্গে কাজ করেছে। মহামারীর সময় অনেক দেশের ঋণ আগে থেকেই বেশি ছিল। এরপর স্বাস্থ্যসেবা, মানুষের আয় সহায়তা এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে তাদের আরো ঋণ নিতে হয়। আর্থিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আগেই খাদ্য ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং জলবায়ুজনিত দুর্যোগ নতুন চাপ সৃষ্টি করে। কিছু দেশের নিরাপত্তা ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে তাদের ঋণের বোঝা বেড়েছে এবং সরকারের ব্যয় করার সুযোগ কমেছে।
আগের তুলনায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণের উৎস এখন অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়। আগে প্যারিস ক্লাবভুক্ত উন্নত দেশের সরকার এবং বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের মতো বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান ছিল প্রধান ঋণদাতা। এখন চীনের মতো নন-প্যারিস ক্লাব ঋণদাতা, বাণিজ্যিক ব্যাংক, আন্তর্জাতিক বন্ডধারী, পণ্য ব্যবসায়ী এবং দেশীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানও গুরুত্বপূর্ণ ঋণদাতা হয়ে উঠেছে। এতে অর্থায়নের সুযোগ বেড়েছে, কিন্তু কোনো দেশ ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে পুনর্গঠন অনেক জটিল হয়ে পড়ে। কারণ বিভিন্ন ঋণদাতার চুক্তি, আইনগত কাঠামো ও স্বার্থ এক নয়।
অনেক দেশে ঋণ এমন গতিতে বেড়েছে, যে গতিতে তা পরিশোধের সক্ষমতা বাড়েনি। কিছু ঋণ কম লাভজনক প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে অথবা যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই নেয়া হয়েছে। একই সময়ে রফতানি আয় ও সরকারের রাজস্ব প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি। বৈদেশিক অর্থায়ন কমে যাওয়ায় সরকারগুলো এখন ক্রমেই দেশীয় উৎস থেকে বেশি ঋণ নিচ্ছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি কিছুটা কমে। তবে দেশীয় ঋণে সাধারণত সুদের হার বেশি এবং ঋণের মেয়াদ তুলনামূলক কম হয়। সরকার ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের অর্থও কমে যেতে পারে। এতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
স্বল্পোন্নত দেশগুলো ঋণখেলাপি না হয়েও গুরুতর ঋণ সংকটে পড়তে পারে। অনেক সরকার সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অবকাঠামো, খাদ্যনিরাপত্তা ও জলবায়ু অভিযোজনের মতো জরুরি খাতে ব্যয় কমিয়ে দেয়। একে এক ধরনের ‘নীরব ঋণ সংকট’ বলা যায়। কারণ বাইরে থেকে সরকার ঋণ পরিশোধ করতে পারছে বলে মনে হলেও এর মূল্য দিতে হচ্ছে জনগণকে এবং দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতিকে।
২০২৪ সালে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মোট বৈদেশিক ঋণ ১১ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। যেসব দেশের রাজস্ব ও রফতানি আয় কম, তাদের জন্য এ ঋণের বোঝা বিশেষভাবে বড়। তাই শুধু ঋণ-জিডিপি অনুপাত দেখে কোনো দেশের ঋণ পরিস্থিতি নিরাপদ কিনা, তা বিচার করা যথেষ্ট নয়। সরকারের রাজস্ব, রফতানি আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের তুলনায় ঋণ পরিশোধে কত অর্থ যাচ্ছে, সেটিও দেখা জরুরি।
স্বল্পোন্নত দেশগুলো অনেক সময় কম প্রবৃদ্ধি ও বেশি ঋণের একটি দুষ্টচক্রে আটকে যায়। সরকারি বিনিয়োগ কম থাকে, অথচ ঋণের প্রয়োজন বেশি হয়। অনেক দেশের সার্বভৌম ঋণমানও দুর্বল। এতে নতুন ঋণের সুদ আরো বেড়ে যায়। ফলস্বরূপ উচ্চ সুদ ব্যয়, কম বিনিয়োগ, ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বাড়তি ঋণঝুঁকি—এগুলো একে অন্যকে আরো শক্তিশালী করে।
জলবায়ু পরিবর্তন এ সমস্যাকে আরো জটিল করছে। জলবায়ুজনিত দুর্যোগে সরকারের রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আবার দুর্যোগ মোকাবেলায় ব্যয় বাড়াতে হয়। অথচ বৈশ্বিক গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণে এসব দরিদ্র দেশের অবদান খুবই সামান্য। ঋণ ও বাজেটের চাপের কারণে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ভর্তুকি এবং নিম্ন আয়ের মানুষের সহায়তাও সংকুচিত হতে পারে।
ক্রমবর্ধমান ঋণ সংকট মোকাবেলায় শুধু ভালো ঋণ ব্যবস্থাপনা যথেষ্ট নয়, আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থারও সংস্কার প্রয়োজন। উচ্চ সুদ, অস্থির পুঁজি প্রবাহ এবং বিভিন্ন বৈশ্বিক ধাক্কা দরিদ্র দেশগুলোকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই তাদের এমন পরিস্থিতিতে ফেলা উচিত নয়, যেখানে ঋণ পরিশোধ এবং জনগণের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিতে হয়। উন্নত দেশগুলোর উচিত স্বল্পোন্নত ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য অনুদান এবং কম সুদের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো। বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংকগুলোরও এসব দেশের জন্য সাশ্রয়ী অর্থের সুযোগ বাড়াতে হবে এবং জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে।
দরিদ্র দেশগুলোর জন্য ঋণ মুক্তি বা ঋণের বোঝা কমানোর বিষয়টিও অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। আইএমএফের ‘অত্যধিক ঋণগ্রস্ত দরিদ্র দেশসমূহ’ উদ্যোগের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বড় আকারে ঋণ কমানোর ফলে দেশগুলোর ঋণ পরিশোধের চাপ কমেছিল এবং সামাজিক খাতে ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছিল। বর্তমান বাস্তবতায় এ ধরনের নতুন একটি ব্যবস্থা প্রয়োজন, যা এখনকার জটিল ঋণদাতা কাঠামো বিবেচনায় নেবে এবং প্রয়োজন হলে বড় আকারে ঋণ কমানো বা বাতিল করার সুযোগ রাখবে।
তাই ঋণ টেকসই কিনা, তার বিচার শুধু সরকার ঋণদাতাদের পাওনা পরিশোধ করতে পারছে কিনা—এর ভিত্তিতে করা উচিত নয়। ঋণ পরিশোধের পর উন্নয়ন, জলবায়ু সহনশীলতা এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ থাকছে কিনা, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। জি২০-এর ‘কমন ফ্রেমওয়ার্ক’-এর মতো উদ্যোগকে আরো কার্যকর করতে হবে। ঋণ পুনর্গঠন দ্রুত করা, প্রয়োজন হলে সাময়িকভাবে ঋণ পরিশোধ স্থগিত রাখা এবং বেসরকারি ঋণদাতাদের অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি। বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর ঋণ সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে ২০২০ সালের নভেম্বরে জি২০ এ কমন ফ্রেমওয়ার্ক চালু করে।
একই সঙ্গে ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতা—উভয়েরই জবাবদিহি থাকতে হবে। ঋণগ্রহীতা সরকারকে ঋণের তথ্য প্রকাশ, ভালো প্রকল্প নির্বাচন এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। তবে সব ক্ষেত্রে দায় সমান নাও হতে পারে। দায়িত্বশীল ঋণ গ্রহণের পাশাপাশি দায়িত্বশীল ঋণ প্রদান, সাশ্রয়ী উন্নয়ন অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সংস্কার এবং প্রয়োজন হলে সময়মতো ঋণ মওকুফও গুরুত্বপূর্ণ।
উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সরকারি ঋণ, সরকারি গ্যারান্টি এবং ভবিষ্যতে সরকারের ওপর দায় তৈরি করতে পারে—এমন সব আর্থিক অঙ্গীকারের তথ্য আরো স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করতে হবে। জাতীয় সংসদের মাধ্যমে এসব তথ্যের তদারকি হওয়া প্রয়োজন। ঋণ ব্যবস্থাপনাকে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে এবং এমন প্রকল্পে ঋণ নিতে হবে, যেগুলো উৎপাদন ও আয় বাড়াতে সক্ষম। একই সঙ্গে কম সুদে, নির্দিষ্ট সুদের হারে এবং দীর্ঘমেয়াদে ঋণ পাওয়ার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
দেশীয় রাজস্ব বাড়াতে করের আওতা সম্প্রসারণ, অযৌক্তিক করছাড় কমানো, সম্পদ ও উচ্চ আয়ের ওপর কর ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং কর প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন। রফতানি বহুমুখীকরণ এবং উৎপাদনশীলতা, জ্বালানি, দক্ষতা, প্রযুক্তি ও জলবায়ু সহনশীলতায় বিনিয়োগ বাড়ালে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও বাড়বে। ঋণ পরিস্থিতি অসহনীয় হওয়ার আগেই পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে বাজেট সমন্বয়ের সময় গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক কর্মসূচি ও টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ সুরক্ষিত রাখতে হবে।
সাশ্রয়ী উন্নয়ন অর্থায়ন এবং বৈশ্বিক ঋণ ব্যবস্থা সংস্কার নিয়ে চলমান আন্তর্জাতিক আলোচনা বাংলাদেশের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশও ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক ঋণ চাপের প্রভাবের বাইরে নয়। আইএমএফের ২০২৬ সালের ঋণ টেকসই বিষয়ক বিশ্লেষণে বাংলাদেশকে বৈদেশিক ও সামগ্রিক ঋণ সংকট—উভয় ক্ষেত্রেই ‘মধ্যম ঝুঁকিতে’ রাখা হয়েছে। কয়েক বছর আগেও ঝুঁকির মাত্রা ছিল কম। দুর্বল রাজস্ব আহরণ, দেশীয় উৎস থেকে ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ, বাড়তে থাকা সুদ ব্যয়, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং বিনিময় হার ও জলবায়ুজনিত ধাক্কার ঝুঁকি ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের ওপর আরো চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে হবে, রাজস্ব সংগ্রহ শক্তিশালী করতে হবে এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় আরো দক্ষতা ও স্বচ্ছতা আনতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ঋণ এমন খাতে ব্যবহার করা, যা উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ আয় বাড়াবে। তাহলেই ঋণ দেশের উন্নয়নের সহায়ক হবে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বোঝা হয়ে উঠবে না।
ড. ফাহমিদা খাতুন: অর্থনীতিবিদ ও সম্মাননীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)


