নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কমায় পিছিয়েছে বাংলাদেশ: ফাহমিদা খাতুন

Originally posted in The Business Standard on 17 September 2026

বৈশ্বিক নারী-পুরুষ সমতা সূচকে ৫৫ ধাপ পেছাল বাংলাদেশ, দক্ষিণ এশিয়ায় সমতায় শীর্ষে ১২ বছর

মূল্যায়নকৃত ১৪৫টি দেশের মধ্যে এবার বাংলাদেশেই সবচেয়ে বড় পতন দেখা গেছে। তবে এত বড় পতনের পরও টানা ১২ বছরের মতো দক্ষিণ এশিয়ায় নারী-পুরুষ সমতায় শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ।

ইনফোগ্রাফিক/টিবিএস

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ‘গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট-২০২৬’-এ ৫৫ ধাপ পিছিয়ে বাংলাদেশ, অবস্থান ৭৯তম। মূল্যায়নকৃত ১৪৫টি দেশের মধ্যে এবার বাংলাদেশেই সবচেয়ে বড় পতন দেখা গেছে। তবে এত বড় পতনের পরও টানা ১২ বছরের মতো দক্ষিণ এশিয়ায় নারী-পুরুষ সমতায় শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ।

এক বছর আগে, ২০২৫ সালের সূচকে এক বছরের ব্যবধানে সবচেয়ে বড় উত্থান দেখিয়েছিল বাংলাদেশ। ৯৯তম অবস্থান থেকে ৭৫ ধাপ এগিয়ে ২৪তম স্থানে উঠে এসেছিল।

গতকাল বুধবার প্রকাশিত সূচকটির ২০তম সংস্করণ অনুযায়ী, বাংলাদেশে সার্বিক লিঙ্গ বৈষম্য কমে দাঁড়িয়েছে ৭১.২ শতাংশে, যা গত বছর ছিল ৭৭.৫ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে দেশে লিঙ্গসমতার সূচক কমেছে ৬.২ শতাংশ পয়েন্ট।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মূলত রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন খাতে ২১.২ শতাংশ পয়েন্ট বিশাল পতনের কারণেই সামগ্রিক সূচকে পিছিয়েছে বাংলাদেশ।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন টিবিএসকে বলেন, ‘বহু বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীদের শক্তিশালী ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ভূমিকা ছিল—যেখানে প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার কিংবা সরাসরি নির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে নারীদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি আমরা দেখেছি।’

তিনি বলেন, ‘তবে ২০২৬ সালের সূচকে যে উপাত্ত ব্যবহার করা হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে আগের বছরগুলোর তুলনায় রাজনীতিতে নারীদের সক্রিয় অংশ নেওয়ার হার কমেছে। সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্যের হার যেমন কমেছে, তেমনি মন্ত্রিসভায় নারী নেতৃত্বের প্রতিনিধিত্বও হ্রাস পেয়েছে। মূলত এ কারণেই রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হয়েছে।’

তবে বড় ধরনের পতন সত্ত্বেও দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। ২০১৪ সালে শ্রীলঙ্কাকে পেছনে ফেলার পর থেকে টানা ১২ বছর ধরে এই অঞ্চলে এক নম্বর স্থান ধরে রেখেছে ঢাকা।

ড. ফাহমিদা জানান, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা খাতে লিঙ্গসমতা অর্জন এবং মাতৃত্ব ও শিশুমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারার ইতিবাচক প্রভাব অন্যান্য দেশের চেয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে রেখেছে।

ডব্লিউইএফের এই সূচকে চারটি প্রধান ক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্য পরিমাপ করা হয়—অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগ, শিক্ষাগত অর্জন, স্বাস্থ্য ও আয়ু এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন। ক্ষেত্রগুলোর অধীনে ১৪টি ১৪টি উপ-সূচকের ওপর ভিত্তি করে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।

অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ এখনও সবচেয়ে দুর্বল ক্ষেত্র

প্রতিবেদন অনুযায়ী, অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগ ক্ষেত্রটিই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে দুর্বল জায়গা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এ খাতে বৈষম্য দূর হয়েছে ৪১.৯ শতাংশ, যা আগের বছরে ছিল ৪৫.৭ শতাংশ।

কাজের ক্ষেত্রে অর্জিত আনুমানিক আয়, শ্রমশক্তিতে নারীদের মোট অংশগ্রহণ এবং উচ্চপদস্থ নেতৃত্বে নারী কর্মী কমে যাওয়ার কারণে এই পতন হয়েছে। এই তিনটি ক্ষেত্রে যথাক্রমে ১৫, ৫.৭ এবং ১.৩ শতাংশ পয়েন্ট সমতা কমেছে।

অন্যদিকে, রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন খাতে গত বছর বিশ্বের ৩ নম্বরে থাকলেও এবার বাংলাদেশ নেমে গেছে ১২তম স্থানে। এই খাতে অর্জিত সমতার হার ৫০.৯ শতাংশ। বিশেষ করে সংসদে প্রতিনিধিত্বের সমতার হার পরিমাপের পুরো মেয়াদের মধ্যে সর্বনিম্নে (২.৪ শতাংশ) নেমে এসেছে।

তবে ২০১৯ সাল থেকে রাষ্ট্রপ্রধানের সূচকে পূর্ণ শতভাগ সমতা ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিশ্বজুড়ে ৬৪টি দেশে এই সময়ে কোনো নারী রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন না, যেখানে বাংলাদেশ ও আইসল্যান্ড শতভাগ সমতা অর্জন করেছে।

এছাড়াও স্বাস্থ্য ও বেঁচে থাকা খাতে বাংলাদেশের সমতার হার অপরিবর্তিতভাবে ৯৬ শতাংশ রয়েছে।

শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনের ক্ষেত্রে রেকর্ড ৯৬.১ শতাংশ সমতা অর্জিত হয়েছে, যা বিগত ২০ বছরের ধারাবাহিক অগ্রগতির চিত্র ধরে রেখেছে। এর নেপথ্যে রয়েছে বয়স্ক সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি এবং উচ্চশিক্ষায় নারীদের ভর্তি বৃদ্ধি। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে সমতা বজায় থাকলেও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এখনো নারীদের পিছিয়ে থাকার হার ৭৭.১ শতাংশ।

টানা ১২ বছর দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে বাংলাদেশ

দক্ষিণ এশীয় অঞ্চল হিসেবে ২০২৬ সালে সামগ্রিক লিঙ্গ বৈষম্যের ৬৪.৫ শতাংশ নিরসন করা সম্ভব হয়েছে, যা বিশ্বের ৮টি অঞ্চলের মধ্যে ৭ম। সামগ্রিকভাবে এ অঞ্চলের স্কোর গত বছরের চেয়ে ০.১ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে। সূচক চালুর পর থেকে অঞ্চলটি ৪.৮ শতাংশ পয়েন্ট বৈষম্য দূর করতে পেরেছে। বর্তমান গতি বজায় থাকলে এই অঞ্চলে পুরোপুরি লিঙ্গসমতা আসতে সময় লাগবে প্রায় ১৪৯ বছর।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নেপাল, মালদ্বীপ, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা তাদের র‍্যাংকিংয়ে উন্নতি করেছে। অন্যদিকে ভুটানের অবস্থান অবনমিত হয়েছে এবং ভারতের স্থান অপরিবর্তিত রয়েছে।

বাংলাদেশ টানা ১২ বছরের মতো দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে। অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে মালদ্বীপ ৬৬.৯ শতাংশ সমতা নিয়ে ১১৯তম, নেপাল ৬৬.৯ শতাংশ নিয়ে ১২০তম, ভুটান ৬৬.৩ শতাংশ নিয়ে ১২১তম, শ্রীলঙ্কা ৬৪.৬ শতাংশ নিয়ে ১২৯তম এবং ভারত ৬৪.৫ শতাংশ সমতা নিয়ে ১৩১তম স্থানে রয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে কম লিঙ্গসমতা থাকা দেশ পাকিস্তান। বিশ্বেও দেশটির অবস্থান তৃতীয় সর্বনিম্ন। দেশটি তার লিঙ্গবৈষম্যের ৫৯.৫ শতাংশ কমাতে পেরেছে। তবে ২০২৫ সালের তুলনায় পাঁচ ধাপ এগিয়েছে পাকিস্তান।

এদিকে, বৈশ্বিক লিঙ্গসমতা সূচকে টানা ১৭তম বছরের মতো শীর্ষে রয়েছে আইসল্যান্ড। দেশটি তার লিঙ্গবৈষম্যের ৯৩ শতাংশ কমিয়েছে এবং ৯০ শতাংশের বেশি লিঙ্গসমতা অর্জন করা একমাত্র দেশ হিসেবে রয়েছে।

ফিনল্যান্ড ৮৭.২ শতাংশ এবং নরওয়ে ৮৫.৭ শতাংশ সমতা নিয়ে যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে এবং টানা তৃতীয় বছর ধরে দেশ দুটি একই অবস্থান ধরে রেখেছে।

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.