Originally posted in বণিকবার্তা on 7 September 2026
ভারতের সঙ্গে বিনিয়োগও আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। বিভিন্ন সময়ে দেশটি থেকে আমরা তিনবার লাইন অব ক্রেডিট পেয়েছিলাম। একই সঙ্গে ভারতীয় বিনিয়োগ বাড়াতে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হলেই সাধারণত রাজনীতি, সীমান্ত, পানি বণ্টন কিংবা ভূরাজনীতির প্রসঙ্গ সামনে আসে। কিন্তু এ সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো অর্থনীতি। দুই দেশের ভৌগোলিক নৈকট্য, বিশাল বাজার, দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক যোগাযোগ এবং পারস্পরিক অর্থনৈতিক নির্ভরতা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ-ভারত অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আলাদা গুরুত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার ক্ষেত্রেও এ সম্পর্কের গুরুত্ব কম নয়। কারণ ভারত শুধু বাংলাদেশের প্রতিবেশী নয়, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও দ্রুত সম্প্রসারণশীল বাজার। চীনের পর ভারত আমাদের গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য অংশীদার। ফলে স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন তৈরি হয়, ভারতের এ বৃহৎ বাজার থেকে বাংলাদেশ কতটা সুবিধা আদায় করতে পারছে আর ভবিষ্যতেও তা কতটা সম্প্রসারিত করবে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের হিসাবে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ২৩৬ কোটি ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশের আমদানি প্রায় ১ হাজার ৫৮ কোটি ডলার আর রফতানি প্রায় ১৭৮ কোটি ডলার। অর্থাৎ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমাদের ৮৮০ কোটি ডলারের একটা ঘাটতি রয়েছে। বাণিজ্য ঘাটতির এ পরিমাণ দেখে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। তবে বাণিজ্য ঘাটতির হিসাব একমাত্রিক আঙ্গিকে দেখলে পুরো বাস্তবতা বোঝা যাবে না। ভারত থেকে বাংলাদেশ যেসব পণ্য আমদানি করে, তার বড় অংশ দেশের উৎপাদন ও শিল্পায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত।
বাংলাদেশের রফতানির প্রধান খাত তৈরি পোশাক। মোট রফতানির ৮২ শতাংশ এ খাত থেকে আসে। আর এ শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল অর্থাৎ তুলা, সুতা, কাপড় এবং বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ভারত থেকে আসে। বাংলাদেশ এসব কাঁচামাল ব্যবহার করে তৈরি পোশাক উৎপাদন করে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি করে। অর্থাৎ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতির একটি অংশ আসলে বাংলাদেশের রফতানি অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত। ভারত থেকে কাঁচামাল আমদানি করে বাংলাদেশ তা মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করছে। সেই অর্থে আমদানির একটি অংশ বাংলাদেশের উৎপাদন ও রফতানি সক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। আবার ভারত থেকে শুধু রফতানিমুখী শিল্পের কাঁচামালই আসে না। বিভিন্ন মধ্যবর্তী পণ্য, যন্ত্রপাতি ও শিল্পের প্রয়োজনীয় উপকরণও আসে। এসব পণ্য দেশের শিল্পায়ন এবং আমদানি বিকল্প শিল্প গড়ে তুলতে সহায়তা করে। অন্যদিকে চূড়ান্ত ভোগ্যপণ্য আমদানি দেশের ভোক্তাদের চাহিদা পূরণেও ভূমিকা রাখে। এর পরও ভারতের বৈচিত্র্যময় পণ্যবাজারে আমরা কতটা প্রবেশ করতে পেরেছি এ প্রশ্নটি থেকে যায়।
ভারতের আমদানি বাজার বিশাল। দেশটির মোট আমদানি বাজার ৯০ হাজার কোটি ডলারের। এর মধ্যে পণ্য আমদানির বাজার ৬৯ হাজার কোটি ডলারের। সেখানে আমরা মাত্র ১৭৮ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করে থাকি। এ ব্যবধান আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, আবার একই সঙ্গে বড় সম্ভাবনা। কারণ ভারতীয় বাজারে রফতানি না বাড়ার যুক্তিযুক্ত কারণ নেই। বরং অভিজ্ঞতার নিরিখে বলা যায়, সম্ভাবনা ব্যাপক। ভারতের বাজারে ১০০ কোটি ডলারের রফতানি আয় অতিক্রম করতে আমাদের অনেকদিন সময় লেগেছিল। সঠিক নীতি, বাজার সংযোগ, প্রতিযোগিতা ও উৎপাদন সক্ষমতা থাকলে ভারতের বাজারে রফতানি বাড়ানো কঠিন নয়।
কিন্তু রফতানি আয় যদি বাড়াতেই হয়, তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে রফতানি পণ্য বৈচিত্র্যকরণের দিকে এগোতে হবে। বাংলাদেশ এমন অনেক পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি করে যেগুলো ভারত অন্য বাজার থেকে আমদানি করে। এখানেই আমাদের বড় সুযোগ। অর্থাৎ ভৌগোলিক অবস্থানের বিচারে ভারত আমাদের জন্য এমন একটি বাজার যেখানে বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা আছে, আবার ভারতেরও চাহিদা আছে। কিন্তু সমস্যা হলো দুই দেশের মধ্যে কার্যকর বাণিজ্য সংযোগ তৈরি হয়নি। ভারতের বাজারে চাহিদা রয়েছে এমন পণ্য চিহ্নিত করে তা সরবরাহ সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতা শক্তি বাড়াতে পারলে রফতানি আয় বাড়ার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে শুধু পণ্য উৎপাদন করলে হবে না, ভারতের মতো বড় বাজারে প্রবেশ করতে হলে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে পণ্য সরবরাহ করতে হবে। আর এখানেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ বর্তমান ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি সংকট, উচ্চ উৎপাদন ব্যয় এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলছে। তাই একজন উদ্যোক্তা কম খরচে উৎপাদন করতে না পারলে শুধু বাজার থাকলেও সুযোগ কাজে লাগানো সম্ভব হবে না। বাংলাদেশের এক্ষেত্রে মূল কাজ হলো তুলনামূলক সুবিধাকে প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় রূপ দেয়া।
ভারতের সঙ্গে বিনিয়োগও আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। বিভিন্ন সময়ে দেশটি থেকে আমরা তিনবার লাইন অব ক্রেডিট পেয়েছিলাম। একই সঙ্গে ভারতীয় বিনিয়োগ বাড়াতে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তাছাড়া অতীতে মিরসরাইসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলে ভারতীয় বিনিয়োগ আকর্ষণের পরিকল্পনা ছিল। এ ধারণা তখন বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ভারতীয় বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে উৎপাদন করবেন এবং সেই পণ্য ভারতের বাজারসহ অন্যান্য দেশে রফতানি করবেন। এভাবে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও বাণিজ্যের মধ্যে একটি কার্যকর সংযোগ তৈরি হতে পারত। কিন্তু প্রকৃতভাবে এ সম্ভাবনাকে আমরা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারিনি। কাজে লাগাতে পারিনি বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশের কারণে। ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়, ব্যবসা সহজীকরণ, প্রশাসনিক ও কাঠামোগত বিভিন্ন জটিলতার কারণে ভারত তো বটেই, অন্য অনেক দেশ থেকেও প্রত্যাশিত পরিমাণে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করা যায়নি।
ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ২০১১ সাল থেকে ভারত অধিকাংশ পণ্যের জন্য শূন্য শুল্ক সুবিধা দিচ্ছে। এভাবে ভারতের বাজারে প্রবেশে বড় সুযোগ আমাদের তৈরি হয়ে আছে। এ সুবিধা থেকে কিছুটা লাভও আমাদের হয়েছে। কিন্তু ভারতীয় বাজারের আকার বিবেচনায়, এ সম্ভাবনার তুলনায় অর্জন এখনো সীমিত। বাংলাদেশকে উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার কার্যকর কৌশল নেয়া গেলে ভবিষ্যতে ভারতীয় বিনিয়োগ আকর্ষণ হতে পারে। ভারতীয় বিনিয়োগকারীরা এখানে কারখানা গড়ে তাদের দেশের বাজারে ওই পণ্য রফতানি করতে পারবেন। এজন্য বাংলাদেশে ব্যবসার পরিবেশ আরো উন্নত করা জরুরি।
বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জটিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বিভিন্ন বাজারে বিদ্যমান বাণিজ্য সুবিধার পরিবর্তন ঘটতে পারে। ফলে ভারতের শূন্য শুল্ক সুবিধা ভবিষ্যতে কতটা এবং কতদিন অব্যাহত থাকবে, তা নিয়ে আগেভাগেই আলোচনা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের উচিত ভারতের সঙ্গে এ বিষয়ে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক আলোচনা শুরু করা। কারণ বাজার সুবিধা ধরে রাখা বাংলাদেশের রফতানি সক্ষমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু শুল্ক সুবিধা থাকলেই বাণিজ্য বাড়বে না। বাজারে পণ্য পৌঁছার পথও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে কিছু বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। এর পেছনে নানা কারণ রয়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বাংলাদেশের পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে স্থলবন্দর ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে। এজন্য পণ্য পাঠাতে অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে। পরিবহন ব্যয় বাড়ছে, পণ্য সরবরাহে বিলম্ব পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও কমিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশও ভারত থেকে কিছু পণ্য স্থলপথে আমদানির ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। অর্থাৎ দুই পক্ষই কিছু ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। এমনটি দীর্ঘমেয়াদে কোনো পক্ষের জন্যই ভালো কিছু দেবে না।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ভৌগোলিক নৈকট্য একটি বড় সুবিধা। অথচ সীমান্তে দীর্ঘ সময়, পরিবহন ব্যয় ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনেক সময় এ সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায় না। এ কারণেই ‘বিবিআইএন মোটর ভেহিকল এগ্রিমেন্ট’ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালকে নিয়ে করা এ চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল আঞ্চলিক যোগাযোগ সহজ করা এবং সীমান্ত পারাপারের সময় ও ব্যয় কমানো। চুক্তিটি পুরোপুরি কার্যকর করা গেলে দক্ষিণ এশিয়ায় বাণিজ্যে বড় পরিবর্তন আসতে পারত। সীমান্তে সময়ক্ষেপণে আমদানি ব্যয় বাড়ে। এতে উৎপাদক ও ভোক্তা উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার রফতানি ব্যয় বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যায়। অর্থাৎ যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বাণিজ্য সুবিধা অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক শুধু দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতারও বড় সম্ভাবনা রয়েছে। নেপাল থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আমদানির বিষয়টি এর একটি ভালো উদাহরণ। ভারতের বিদ্যুৎ গ্রিড ব্যবহার করে নেপাল থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আনা হচ্ছে। এটি দেখায় যে আঞ্চলিক সহযোগিতা কার্যকর হলে একাধিক দেশ একই সঙ্গে লাভবান হতে পারে। ভবিষ্যতে নেপালের জলবিদ্যুৎ খাতে বাংলাদেশ বিনিয়োগ করতে পারে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ বাংলাদেশে আনতে ভারতের গ্রিড ব্যবহার করা যেতে পারে। এ ধরনের উদ্যোগ দ্বিপক্ষীয়, ত্রিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার নতুন দিগন্ত খুলতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতার সম্ভাবনা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনেক উদ্যোগ কার্যকর হয়নি। সার্ক বর্তমানে কার্যত নিষ্ক্রিয়। তবে দ্বিপক্ষীয় ও উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো সম্ভব। বিবিআইএন তার একটি উদাহরণ হতে পারে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও ভারত আরো বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের দিকেও যেতে পারে। কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (সেপা) নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আগে আলোচনা হয়েছে। এ ধরনের চুক্তি শুধু পণ্য বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিনিয়োগ, সেবা, যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্রও এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
বাংলাদেশ এরই মধ্যে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্বমূলক চুক্তির দিকে এগিয়েছে। ভারতের সঙ্গেও একটি বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের সম্ভাবনা ভবিষ্যতে বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে যেকোনো বড় অর্থনৈতিক চুক্তির আগে বাংলাদেশের নিজের প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে। জ্বালানি নিরাপত্তা, শক্তিশালী অর্থনৈতিক করিডোর, দক্ষ বন্দর এবং কম ব্যবসা পরিচালনা ব্যয়—এসব বিষয় উন্নত না হলে শুধু চুক্তি করলেই প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশ যদি উৎপাদনের ব্যয় কমাতে পারে এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে পারে, তাহলে ভারতসহ বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে উৎপাদনে আগ্রহী হতে পারেন। বাংলাদেশের অবস্থান তখন শুধু একটি বাজার হিসেবে নয়, একটি উৎপাদন ও রফতানি কেন্দ্র হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশ-ভারত অর্থনৈতিক সম্পর্কের সম্ভাবনা অনেক বড়। এ সম্পর্ককে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রফতানি বাড়ানো সম্ভব, নতুন বাজার তৈরি করা সম্ভব, পণ্যের বৈচিত্র্য আনা সম্ভব এবং শিল্পায়নের গতি বাড়ানো সম্ভব। অবশ্যই দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন জটিল বিষয় রয়েছে। পানি বণ্টন, ভূরাজনীতি এবং অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় ইস্যু রয়েছে। এসব প্রশ্নকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রেও এসব সমস্যাকে অমীমাংসিত অবস্থায় স্থায়ী বাধা হিসেবে রেখে দেয়া উচিত নয়।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে এমন অনেক ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে উভয় দেশই লাভবান হতে পারে। এ ‘উইন-উইন’ ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করে এগিয়ে যাওয়াই হতে পারে ভবিষ্যতের সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। ভারতের বিশাল বাজার বাংলাদেশের সামনে রয়েছে। কিন্তু বাজারের আকার বড় হলেই সুযোগ কাজে লাগানো যায় না। সেই সুযোগ নিতে হলে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হয়, প্রতিযোগিতা শক্তি তৈরি করতে হয়, বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হয় এবং বাণিজ্যের প্রতিবন্ধকতা কমাতে হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাংলাদেশের নিজের প্রস্তুতি। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ তাই শুধু কূটনীতির প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের রফতানি, উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের প্রশ্নও।
সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবসম্মত প্রস্তুতির মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরো গভীর করা গেলে তা উভয় দেশের জন্যই লাভজনক হতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য ভারতের ক্রমবর্ধমান বাজার নতুন রফতানি, নতুন বিনিয়োগ এবং নতুন শিল্পায়নের সুযোগ তৈরি করতে পারে। সেই সুযোগ আছে। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—বাংলাদেশ কি সেই সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত?


