Saturday, June 13, 2026
spot_img
Home Op-eds and Interviews Debapriya Bhattacharya

বাজেটজুড়ে বাস্তববাদ ও আশাবাদের দ্বন্দ্ব – দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

Originally posted in প্রথম আলো on 13 June 2026

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

আমার কাছে এবারের প্রস্তাবিত বাজেট মূলত দুটি দৃষ্টিভঙ্গির দ্বন্দ্ব হিসেবে মনে হয়েছে—একদিকে বাস্তববাদ (রিয়েলিজম), অন্যদিকে আশাবাদ (অপটিমিজম)।নীতিকাঠামো নিয়ে খুব বড় মতভেদ নেই। পার্থক্যটা তৈরি হয়েছে সময়, সক্ষমতা ও প্রত্যাশার জায়গায়।

একটি পক্ষ বলছে, অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সংকট ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতা বিবেচনায় প্রথম বছরের প্রধান কাজ হওয়া উচিত অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা। সরকারের ঘোষিত তিন ধাপের কর্মপরিকল্পনার প্রথম ধাপ পুনরুদ্ধার—এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অর্থাৎ আগে ভিত্তিটা শক্ত করতে হবে, তারপর উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জনের দিকে এগোতে হবে।

অন্যদিকে আরেকটি পক্ষ, যাঁদের মধ্যে রাজনীতিবিদ ও প্রশাসনের একটি অংশ রয়েছেন, মনে করেন, এই এক বছরের স্থিতিশীলতার মধ্যেও নতুন সরকারের কিছু রাজনৈতিক অঙ্গীকার আছে। ফলে প্রথম বছরেই জনগণের সামনে কিছু অর্জনের বার্তা তুলে ধরা প্রয়োজন। এখানেই আশাবাদী অবস্থানের জন্ম। এখানে রাজনৈতিক বিবেচনাটাই বড়।

অন্যদিকে পেশাগত অর্থনীতিবিদেরা ভিত্তিভূমিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। আর যাঁরা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করছেন, তাঁরা লক্ষ্যমাত্রা ও দৃশ্যমান অর্জন সামনে আনতে চান। নীতিকাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সময় নিয়ে পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। একদলের চোখ সময়ের দিকে, আরেক দলের চোখ লক্ষ্যের দিকে। একদল পরিস্থিতি সংহতকরণে জোর দিচ্ছে, আরেক দল সংহতকরণের সঙ্গে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে। আশাবাদী ও বাস্তবাবাদীদের মধ্যে এটা বড় পার্থক্যের জায়গা।

সমস্যা হলো, যে ধরনের আশাবাদী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন। এটি শুধু ব্যাংকিং বা আর্থিক খাতের প্রশ্ন নয়; জ্বালানি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসনিক দক্ষতা—সবকিছুর সঙ্গে জড়িত। এর জন্য সময় প্রয়োজন। এক বছরের মধ্যে এটা সম্ভব কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে। ফলে যে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর আশা করা হচ্ছে, তা হয়তো এত দ্রুত হবে না।

এখানে আরেকটি বিষয়ও লক্ষণীয়। বাজেটে সংস্কারের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য সমন্বিত ও বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা খুব স্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়নি।

আশাবাদী অবস্থান সাধারণত ব্যয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়। হাতে সম্পদ থাকলে সেই সম্পদ কত ভালোভাবে ব্যয় করা হবে, সেটিই তখন আলোচনার কেন্দ্র হয়। কিন্তু বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রথমেই প্রশ্ন তোলে—সম্পদ কোথা থেকে আসবে।

বাংলাদেশের মতো দেশে সম্পদ সংগ্রহ করাই বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে এনবিআরের শুল্ক-কর আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৪ লাখ ৩১ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। এ সময়ে এনবিআর আদায় করতে পেরেছে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি টাকা, ঘাটতি ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

বাজেট বাস্তবায়নের জন্য বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক সহায়তা ও বাজেট সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয়। দেশের ভেতর থেকে সংগ্রহ করতে পারলে এক কথা। কিন্তু বিদেশ থেকে ৯৫০ কোটি ডলার ঋণ সংগ্রহ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা-ও আবার বাজেট সহায়তা হিসেবে, প্রকল্প সহায়তা হিসেবে নয়। বাজেট সহায়তা নিতে গেলে সংস্কারের প্রসঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অংশীদারেরা অর্থায়নের আগে সংস্কারের অগ্রগতি দেখতে চান। ফলে বাস্তবায়ন সক্ষমতা ও সংস্কারের বিশ্বাসযোগ্যতা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এটাও পার্থক্যের আরেকটি জায়গা। সে কারণেই আমি একে আশাবাদ বনাম বাস্তবতার পার্থক্য হিসেবে দেখি।

চাহিদা ও সরবরাহের দ্বন্দ্ব

আরেকটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। রাজনীতিবিদেরা সাধারণত চাহিদার দিকটিতে গুরুত্ব দেন। জনগণের কী প্রয়োজন, কোন খাতে বরাদ্দ দিলে তা দৃশ্যমান হবে—সেই প্রশ্ন তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। পেশাগত অর্থনীতিবিদেরা তুলনামূলকভাবে সরবরাহের দিকটিতে বেশি গুরুত্ব দেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে মনে হয়, আশাবাদের রাজনীতি বিজয়ী হয়েছে।

জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনার সময় আমি উপস্থিত ছিলাম। সেখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে লক্ষ করেছি। অর্থমন্ত্রী যখন নীতিকাঠামোর কথা বলছিলেন, তখন তুলনামূলকভাবে কম সাড়া মিলেছে। কিন্তু বিভিন্ন খাতে বরাদ্দের ঘোষণা দেওয়ার সময় দলমত-নির্বিশেষে সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়াচ্ছিলেন। এতে বোঝা যায়, ব্যয় ও বরাদ্দের প্রশ্নে রাজনৈতিক পরিসরে একধরনের ঐকমত্য রয়েছে। এর বিপরীতে আমাদের প্রধান উদ্বেগ হলো অর্থনীতির মানদণ্ড নিয়ে।

আশাবাদ বিজয়ী হওয়ার কারণে দেখা যায়, নিজেদের যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে তারা অনেক ক্ষেত্রে সৃজনশীলভাবে তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করেছে। অনেক ক্ষেত্রে সংশোধিত বাজেটকে ভিত্তি করে প্রাক্কলন করা হয়েছে। অথচ গত কয়েক মাসে অর্থনীতির কিছু সূচকের অবনতি ঘটেছে, যেমন রপ্তানি, রাজস্ব আহরণ, বেসরকারি বিনিয়োগ, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ। দেখা যাচ্ছে, তথ্য হালানাগাদ না করে গত বিদায়ী বছরের মাঝামাঝি সময়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোতেও ব্যবহৃত তথ্যের সময় নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পাদটীকায় বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধবিগ্রহের প্রভাব বিবেচনা করা হয়নি। আমার মনে হয়েছে, বাজেট প্রণয়নকারী দল এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো প্রণয়নকারী দলের মধ্যে কিছুটা সমন্বয়হীনতা আছে। অর্থাৎ আশাবাদীদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠী নিজেদের আশাবাদ সামনে এনেছে। একদল করেছে রাজস্ব কাঠামোতে, আরেক দল প্রবৃদ্ধি কাঠামোতে। প্রবৃদ্ধি কাঠামোতে বলা হয়েছে, বেসরকারি বিনিয়োগের চেয়ে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে। অথচ সরকারি বিনিয়োগ নিয়ে কত সমস্যা।

সেই দিক থেকে দেখতে গেলে, বাস্তববাদীরা অনেক বেশি সংহত ও এককাট্টা। সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশনের মধ্যে যেমন পার্থক্য আছে, তেমনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের যাঁরা বাজেট করেন এবং যাঁরা সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো করেন, তাঁদের মধ্যে পার্থক্য।

সরকার সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়িয়েছে। এটি প্রয়োজনীয় ছিল। কিন্তু একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগ—এই দুই বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার তুলনামূলকভাবে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আশাবাদে ফাটল ধরেছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অতিরিক্ত রাজস্ব আহরণের বড় অংশ আসবে ভ্যাট থেকে। অর্থাৎ পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ফলে যে জনগোষ্ঠীকে সামাজিক সুরক্ষার মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে তাদের ওপরই আবার কিছু চাপ ফিরে আসতে পারে।

মোদ্দা কথা হলো, আমাদের একধরনের বাস্তবমুখী আশাবাদের মধ্যে থাকতে হবে; এ দুটোর মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। বাজেট হয়ে গেছে। এখন মূল প্রশ্ন বাস্তবায়ন।

তথ্য-উপাত্তের স্বচ্ছতা

এই বাস্তবমুখী আশাবাদ বাস্তবায়ন করতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রথমত, তথ্য-উপাত্তের স্বচ্ছতা। দ্বিতীয়ত, বাস্তবায়নের জবাবদিহি। এর সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো, সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে যেসব দক্ষতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে (প্রকল্প প্রণয়ন থেকে সমাপন), সেগুলো দ্রুততার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা। এটা পরিকল্পনা কমিশনের বিষয়। এরপর আইএমইডিকে সুযোগ দেওয়া, ভ্যালু ফর মানি বা অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করায় জোর দেওয়া। সে জন্য আইবাসসহ সরকারি ডেটাবেজ নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে।

২০০৯ সালের আর্থিক আইনের আলোকে সরকারকে যে প্রতি তিন মাস অন্তর অর্থনৈতিক অগ্রগতির বিবরণ দিতে হয়, সেটা শুরু করতে হবে। তাহলে অর্থ ব্যয়ের ওপর সংসদীয় নজরদারি হবে। এর মধ্যে তা করা হয়নি, সরকার চাইলে সেপ্টেম্বর মাস থেকে তা শুরু করতে পারে।

আগামী কয়েক বছরে তিনটি বিষয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা উচিত। সেগুলো হলো, মূল্যস্ফীতি, বাজেট ঘাটতি ও বৈদেশিক ঋণ। এই তিনটি সূচক পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ধ্রুবতারার মতো এই তিনটি বিষয়ের ওপর নজর রাখতে হবে। এগুলোর যেকোনো একটিতে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হলে অন্য দুটিও চাপে পড়বে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকারকে দ্রুত সমন্বিত সংস্কার কর্মসূচি ঘোষণা করতে হবে; এ বিষয়ে খুঁটিনাটি বিস্তারিত কর্মসূচি ঘোষণা করতে হবে। তাঁরা বাজেট প্রণয়নে যতটা গুরুত্ব দিয়েছেন, বাজেট বাস্তবায়নে যেসব সংস্কার দরকার, তার পথরেখা সেভাবে নেই। যদিও তাঁরা এটা হয়তো অনুধাবন করেন।

পুরোনো নীতি পুনরাবৃত্তির শঙ্কা

যদি তথ্যের স্বচ্ছতা না থাকে, যদি নিয়মিত জবাবদিহি না হয়, যদি বাস্তবায়ন অগ্রগতি প্রকাশ না করা হয়, তাহলে এই সরকারও অবধারিতভাবে শেখ হাসিনা সরকারের পথে হাঁটবে। সেই পথটি আমরা দেখেছি—বড় বড় ঘোষণা, উচ্চ প্রবৃদ্ধির দাবি, মূল্যস্ফীতি কমিয়ে দেখানো, বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন, বড় প্রকল্প দিয়ে মানুষের দৃষ্টি ঘোরানো ও এমন প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি, যার সুফল মানুষের কাছে স্পষ্ট নয়। আমরা দেখেছি, বিনিয়োগের সঙ্গে প্রবৃদ্ধির হিসাব মিলত না; বিনিয়োগের সঙ্গে পুঁজি পণ্যের আমদানির পরিসংখ্যান মিলবে না; এমন আরও অনেক অসংলগ্নতা। সেই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে তা শোধ করতে গিয়ে বিপদে পড়া।

সরকার তো পঞ্চম বছর পুনর্গঠনের কথা বলেছে। কিন্তু এখন সুবিধা লাভ করতে গিয়ে এমন কিছু করা তাদের ঠিক হবে না, যেন নির্বাচনের আগে গিয়ে মূল্যস্ফীতি, ঋণ পরিশোধ ও বাজেট ঘাটতি নিয়ে বিপদে না পড়ে।

বর্তমান সরকারের সামনে একটি সুযোগ ছিল, পরিষ্কার ভিত্তি থেকে যাত্রা শুরু করার। বাস্তব অবস্থা অকপটে তুলে ধরে সমন্বিত সংস্কারের পথ ঘোষণা করার। সেই রাজনৈতিক সাহসিকতার পূর্ণ প্রকাশ আমরা এখনো দেখিনি।

সরকারের রাজনৈতিক সাহসিকতা দেখানোর সুযোগ ছিল। সবকিছু নতুন করে শুরু করার সুযোগ ছিল। কিন্তু অর্থনীতি এগিয়ে নিতে যে রাজনৈতিক বয়ান প্রয়োজন ছিল, সেই বয়ানের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। আশাবাদ আছে, কিন্তু অর্জনের বয়ান নেই। এক বছর পর কী হবে বা সরকার কোথায় যেতে চায়, তার বয়ান নেই। রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দিতে হবে, দলের ভেতরে জবাবদিহি জোরদার করতে হবে।

লেখক: সম্মাননীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.