Originally posted in নিউজ২৪ on 3 October 2026
সম্প্রতি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) তাদের কোয়ার্টারলি ইকোনমিক আউটলুকে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন কমিয়েছে। সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত পূর্বাভাসে তারা অর্থবছর ২০২৭-এর জন্য বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৪ দশমিক ০ শতাংশ প্রাক্কলন করেছে। এর আগে তাদের প্রাক্কলন ছিল ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। একই সময়ে সরকারের জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ আগে থেকেই এডিবির প্রাক্কলনের সঙ্গে সরকারের প্রাক্কলনের যে ব্যবধান ছিল, নতুন পূর্বাভাসে তা আরও বেড়েছে। এডিবি কেন প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন কমিয়েছে, সেটি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাদের চিহ্নিত কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য ও অস্থিরতা, দেশে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ না বাড়া এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি। এই বিষয়গুলো বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাধা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আমার মনে হয়, এডিবির পূর্বাভাস কমানোর চেয়ে তাদের পূর্বাভাসের পেছনের কারণগুলো নিয়ে বেশি ভাবা প্রয়োজন। সরকার যদি এসব বিষয়ে যথাযথ মনোযোগ না দেয়, তাহলে সরকারের নির্ধারিত প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হতে পারে।
বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে জ্বালানি একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক। তেল, গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ যেমন প্রয়োজন, তেমনি তা ব্যবসা ও শিল্পের জন্য ব্যয়-সাশ্রয়ী হওয়াও জরুরি। দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনের উপকরণের ব্যয় যদি বেড়ে যায়, তাহলে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ তৈরি করা কঠিন হবে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে পরিবহন ব্যয় বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর প্রভাব আমদানি ব্যয়েও পড়তে পারে। একইভাবে রপ্তানির ক্ষেত্রেও পরিবহন ও অন্যান্য ব্যয় বাড়তে পারে। বেসরকারি খাতে যখন এ ধরনের ব্যয়ের চাপ থাকে, তখন নতুন ব্যবসায় মানুষকে কীভাবে আকৃষ্ট করা যাবে-এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এর সঙ্গে ব্যাংকঋণসহ অন্যান্য বাস্তবতাও যুক্ত রয়েছে।
এ কারণে আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক বিভিন্ন সংস্থা যখন বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে কোনো পূর্বাভাস দেয়, তখন শুধু তাদের প্রাক্কলিত প্রবৃদ্ধির হারটি দেখলে হবে না। তারা কেন প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে, সেই কারণগুলোও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। এসব কারণের ভিত্তিতে সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
আমার মতে, এই মুহূর্তে মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো এবং বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ পরিস্থিতি উন্নত করতে স্বল্পমেয়াদি ও মধ্যমেয়াদি-দুই ধরনের পদক্ষেপের ওপরই গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা গেলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমবে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা গেলে প্রবৃদ্ধির হার ধরে রাখার সম্ভাবনাও বাড়বে।
তবে আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে, প্রবৃদ্ধির হারই সবকিছু নয়। জিডিপি বাড়ছে-এটি গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছে কি না, সেটিই আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মানুষের জীবনযাত্রায় যদি প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক প্রভাব না পড়ে এবং মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের কষ্ট বাড়তে থাকে, তাহলে শুধু উচ্চ প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে অর্থনীতির সাফল্য পরিমাপ করা যথেষ্ট নয়।
তাই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ কমানোর প্রক্রিয়ায় সরকারকে মনোযোগী হতে হবে। এডিবির পূর্বাভাসের পেছনে যেসব ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে, সেগুলোকে সতর্কবার্তা হিসেবে নিয়ে এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
লেখক: সিপিডির নির্বাহী পরিচালক


