Originally posted in সারাক্ষণ on 7 October 2026
বিনিয়োগ খরায় প্রবৃদ্ধির চাকা মন্থর: ব্যাংকে অলস টাকা, তবুও বিমুখ উদ্যোক্তারা
নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর প্রায় আট মাস অতিবাহিত হতে চলল। রাজনীতি ও অর্থনীতিতে এক ধরনের সংস্কারের আবহ তৈরি হলেও দেশের উৎপাদনশীল খাত তথা সামষ্টিক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ‘বেসরকারি বিনিয়োগে’ এর কোনো ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। দেশজুড়ে এখন চলছে এক অভূতপূর্ব বিনিয়োগ খরা। একদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কড়া মুদ্রানীতি ও তদারকির কারণে ব্যাংকগুলোতে উদ্বৃত্ত বা অলস তারল্যের পাহাড় জমছে, অন্যদিকে দেশের বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী ও নতুন উদ্যোক্তারা ঋণ নেওয়া থেকে সম্পূর্ণ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এমনকি অতীতে যেখানে দেশীয় উচ্চ সুদের বিকল্প হিসেবে ব্যবসায়ীদের প্রথম পছন্দ ছিল সস্তা বিদেশি ঋণ, এখন ডলারের বিনিময় হারের ঝুঁকি এবং ভবিষ্যৎ বাজার নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে সেই বিদেশি ঋণের প্রতিও তারা চরম অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন। এই দীর্ঘস্থায়ী বিনিয়োগ স্থবিরতার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির ওপর। পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে গত ৬ অক্টোবর বিশ্বব্যাংক তাদের সর্বশেষ পূর্বাভাসে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আরও কমিয়ে ৩.৪ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে দেশের নীতিনির্ধারকদের করণীয় কী, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ী মহলে চলছে জোর আলোচনা।
টানা ৫ মাস ৫ শতাংশের নিচে ঋণ প্রবৃদ্ধি
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দেশের বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি টানা পাঁচ মাস ধরে ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে। অথচ স্বাভাবিক সময়ে এই প্রবৃদ্ধি ১১ থেকে ১২ শতাংশের ঘরে থাকাই দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য স্বাভাবিক ছিল। ব্যবসায়ীরা নতুন কোনো শিল্পকারখানা স্থাপন করছেন না, এমনকি চলমান কলকারখানার উৎপাদন ক্ষমতা সম্প্রসারণের কাজও স্থগিত রেখেছেন। ফলে ব্যাংকগুলোতে আমানতের প্রবাহ ঠিক থাকলেও তা ঋণ হিসেবে বাজারে যাচ্ছে না। এর ফলে ব্যাংকিং খাতে বাড়ছে অলস টাকার পরিমাণ, যা ব্যাংকগুলোর জন্য এক ধরনের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনীতিবিদ এবং খোদ ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, বিনিয়োগ খরা রাতারাতি তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে সুনির্দিষ্ট কিছু কাঠামোগত ও নীতিগত কারণ: উচ্চ সুদের হারের চাপ, জ্বালানি ও অবকাঠামো সংকট, ডলারের অস্থিরতা ও বিদেশি ঋণের ভয়, আস্থার সংকট এবং নীতিগত ধীরগতি।
• উচ্চ সুদের হারের চাপ: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার দফায় দফায় বাড়িয়েছে। এর ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ঋণের সুদের হার প্রায় ১৪ থেকে ১৫ শতাংশে ঠেকেছে। এত উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে প্রকল্প চালানো লাভজনক হবে না ভেবে ব্যবসায়ীরা পিছু হটছেন।
• জ্বালানি ও অবকাঠামো সংকট: গ্যাস এবং বিদ্যুতের তীব্র সংকট দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি না পাওয়ায় উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে, যা নতুন বিনিয়োগের প্রধান অন্তরায়।
• ডলারের অস্থিরতা ও বিদেশি ঋণের ভয়: অতীতে বিদেশি বায়ার্স ক্রেডিট বা স্বল্পমেয়াদি ঋণ ব্যবসায়ীদের স্বস্তি দিলেও ডলারের দামের লাগামহীন ওঠানামায় এখন তা ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতীতে নেওয়া কম সুদের বিদেশি ঋণ শোধ করতে গিয়ে এখন টাকার বাড়তি অবমূল্যায়নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যার কারণে নতুন করে কেউ বিদেশি ঋণের ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না।
• আস্থার সংকট ও নীতিগত ধীরগতি: সরকার পরিবর্তনের পর ব্যবসায়িক পরিবেশের আমূল সংস্কারের ঘোষণা এলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়ন ধীর। বিনিয়োগকারীদের বড় অংশই এখন ‘ধীরে চলো’ নীতি অবলম্বন করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
সংকট উত্তরণে নীতিনির্ধারকদের জরুরি করণীয়
বর্তমান অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং বিশ্বব্যাংকের এই আশঙ্কাজনক পূর্বাভাস থেকে দেশকে রক্ষা করতে দেশের নীতিনির্ধারকেরা (অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিডা) দ্রুত কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে পারেন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে—ব্যবসায়িক আস্থার পুনরুদ্ধার, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির সমন্বয় এবং ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের কার্যকর বাস্তবায়ন।
১. ব্যবসায়িক আস্থার পুনরুদ্ধার: প্রথম কাজ হলো উদ্যোক্তাদের আশ্বস্ত করা। বিনিয়োগের জন্য একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল রাজনৈতিক ও আইনি পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো রাজনৈতিক কারণে বা ঢালাওভাবে যেন কোনো সচল ব্যবসা বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ না হয়, সেই বিষয়ে সরকারকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে।
২. জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: শিল্প খাতের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। উৎপাদন সচল না থাকলে ঋণের চাহিদা তৈরি হবে না।
৩. মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির সমন্বয়: শুধু সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে গিয়ে বিনিয়োগ যাতে পুরোপুরি মারা না যায়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। উৎপাদনশীল ও কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে—এমন খাতের (যেমন এসএমই ও রপ্তানি খাত) জন্য বিশেষায়িত কম সুদের ঋণের ব্যবস্থা বা পুনঃঅর্থায়ন স্কিম চালু রাখা প্রয়োজন।
৪. ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের কার্যকর বাস্তবায়ন: বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত করে নতুন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাবের অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত ও সহজ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত
অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৩ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়ার অর্থ হলো দেশের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় ধাক্কা লাগা। ব্যাংকিং খাতের সুশাসন ফেরানোর পাশাপাশি এখনই যদি করপোরেট ও বেসরকারি খাতে আস্থার সংকট দূর করা না যায়, তবে এই বিনিয়োগ খরা আগামীতে কর্মসংস্থানহীন এক দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মন্দার রূপ নিতে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি বেশি থাকায় নীতি সুদের হার আগের চেয়ে বেশি রয়েছে। তাই এখন ঋণ প্রবৃদ্ধি হঠাৎ করে বাড়ানোও তুলনামূলকভাবে কঠিন। মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনতে হবে; তা না হলে নীতি সুদের হার কমানো সম্ভব হবে না। কারণ সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করা যাবে না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে পণ্যের সরবরাহ ঠিক রাখতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘নির্বাচিত সরকার আসার পরও নতুন ব্যবসা করার জন্য ব্যবসায়ীরা আস্থা পাচ্ছেন না। তা ছাড়া দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সমস্যা এখন আবার প্রকট হয়ে উঠেছে। অবকাঠামোগত সমস্যা বলতে শুধু রাস্তাঘাট, বন্দর কিংবা সেতু নয়; জ্বালানির দামও অনেক বেড়েছে। আবার অনেক কারখানা বেশি দাম দিয়েও জ্বালানি পাচ্ছে না। ফলে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও বাড়ছে।’
ব্যাংকারদের মতে, ব্যাংকগুলোর কাছে পর্যাপ্ত তহবিল আছে, কিন্তু ঋণ নেওয়ার মতো যোগ্য ও আগ্রহী উদ্যোক্তার অভাব দেখা দিয়েছে। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি পুনর্গঠনে সরকারের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে যৌথভাবে একটি বিশেষ ‘বিনিয়োগ চাঙ্গা করার টাস্কফোর্স’ গঠন করা এখন সময়ের দাবি।
ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হুসেইন মনে করেন, আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য গতি আসার সম্ভাবনা কম। তিনি বলেন, ‘চাহিদা অনেক কমে গেছে। চাহিদা কম থাকার কারণে কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতার ব্যবহারও কমেছে। যেহেতু বিভিন্ন খাতে বাজারে এখনও যথেষ্ট অব্যবহৃত সক্ষমতা রয়েছে, তাই চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়লে নতুন সক্ষমতা তৈরির জন্য বড় বিনিয়োগের প্রয়োজনও এখনই তৈরি হবে না। এ ধরনের বিনিয়োগ বাড়তে হয়তো আরও এক বছর সময় লাগতে পারে।’
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান মনে করেন, বর্তমানে দেশের বড় শিল্পগ্রুপগুলোর অনেকেই চাপের মধ্যে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন কমিয়েছে। ফলে তাদের ব্যাংকঋণের প্রয়োজনও কমেছে। তিনি বলেন, দেশে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের সংকট চলছে। পাশাপাশি আগের সরকারের আমলে নানা অনিয়মের কারণে বর্তমানে ১৫টির কিছু বেশি ব্যাংকের অবস্থা ভালো থাকলেও বাকি ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা দুর্বল। ফলে ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতাও আগের তুলনায় কমেছে। ঋণের চাহিদা বাড়লেও অনেক ব্যাংক আগের মতো ঋণ দিতে পারবে না। তার মতে, ‘মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনতে হবে; তা না হলে নতুন বিনিয়োগ বাড়বে না।’


